হঠাৎ সে সিদ্ধান্তের ভিতও অপ্রত্যাশিতভাবে নাড়া খেয়েছে।
বেশি দিনের কথা নয়। উনিশশো বাহান্ন খ্রিস্টাব্দ। পেরুর এক অখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দানিয়েল রুথে এক আজগুবি কিংবদন্তি অনুসরণ করেই আণ্ডিজের মার্কাহাউসি প্লেটো নামে এক দুর্গম মালভূমিতে যাবার চড়াই ভাঙছেন। যে কিংবদন্তি তাঁকে নাচিয়েছে তা হল এই যে পেরু অভিযাত্রী স্প্যানিশ বাহিনী নাকি কোনও এক দুর্গম গোপন অধিত্যকায় নানা মানুষ ও পশুর বিরাট মূর্তি তাদের যাত্রাপথে দেখেছিল।
একটিমাত্র অত্যন্ত দুরারোহ গিরিবর্ত্ত দিয়ে মার্কাহাউসি প্লেটোতে পৌঁছোনো যায়। সে গিরিপথ দেখেই দানিয়েল রুথে বুঝলেন যে তা মানুষের হাতে তৈরি। প্লেটোতে যাবার রাস্তা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যারা কেটে তৈরি করেছিল তারা রাস্তার ধারে ধারে পাহাড়ের দেয়ালে সব বড় বড় খোপও রেখেছে শত্রু কেউ আক্রমণ করলে পাথর ছুড়ে রোখবার জন্যে।
এই মালভূমিতে যাদের প্রাচীন বসতির চিহ্ন রুথো আবিষ্কার করেন তারা ইংকাদের বহু আগেকার মানুষ। গোপন এই প্লেটোতে তারা বারোটি কৃত্রিম হ্রদ বানিয়েছিল জল জমিয়ে রাখার জন্যে, সেচের জন্যে প্রকাশ্য ও সুড়ঙ্গ নালা কেটেছিল আর যা করেছিল সেইটেই সবচেয়ে অবিশ্বাস্য।
তারা পাহাড়ের গায়ে অদ্ভুত রহস্যময় এমন সব মূর্তি গড়েছিল যা নতুন মহাদেশের পক্ষে সত্যিই কল্পনাতীত।
মূর্তিগুলির একটি হল বিরাট এক কাফ্রির মুখ। নতুন মহাদেশে কাফ্রি জাতির প্রথম পদার্পণ ঘটেছে কলম্বাসের আবিষ্কারের বেশ কিছু পরে ক্রীতদাস হিসাবে। সে আমদানিও হয়েছে কিউবা হিসপানিওলার মতো দ্বীপে। প্রাচীন মহাদেশের প্রায় অগম্য দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে আণ্ডিজ পাহাড়ের গুপ্ত মালভূমিতে কাফ্রি কোথা থেকে আসবে? তাও কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের কমপক্ষে পাঁচ-ছ শতাব্দী আগে!
কাফ্রির মাথার সঙ্গে মূর্তিটির সাদৃশ্য যদি কিছুটা কাল্পনিক বলে ধরা হয় তাহলেও অন্য ভাস্কর্যগুলি সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নেই। সেগুলি হাতি-ঘোড়া-গোরু ও উটের।
কলম্বাসের আবিষ্কারের আগে এসব প্রাণীর সঙ্গে আমেরিকার কোনও পরিচয় ছিল না।
এসব প্রাণীর মূর্তি কারা তাহলে গড়েছে? চাক্ষুষ পরিচয় না থাকলে এ ধরনের মূর্তি গড়া তো সম্ভব নয়। সে পরিচয় যাদের ছিল এমন এক জাতি ওই দুর্গম কৃত্রিম গিরিপথ দিয়ে আগলানো গোপন মালভূমিতে কোথা থেকে এসে বসতি করেছিল?
না, পেরুর হেঁয়ালি শুধু একটু ভৌগোলিক বিবরণ দিয়ে ঘুচিয়ে দেবার নয়।
সূর্য কাঁদলে সোনা-র এই হেঁয়ালির দেশে পনেরোশো একত্রিশ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে পিজারো তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে পানামা উপসাগর থেকে তৃতীয়বারের
অভিযানে পাড়ি দিলেন।
দু-দুবারের মতো এ অভিযানও কি ব্যর্থ হবে?
১৫. তৃতীয় অভিযানেও পিজারো
তৃতীয় অভিযানেও পিজারো তিনটি জাহাজ নিয়ে রওনা হন। তবে এবারের জাহাজগুলি আগেকার চেয়ে মজবুত ও বড়। মাঝিমাল্লা লোক-লশকর কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ-এর চাহিদামাফিক না হলেও খুব অল্প নয়। সবসুদ্ধ তিনটি জাহাজে একশো আশিজন তোক আর সাতাশটি সওয়ার সেপাই বাহিনীর ঘোড়া। অস্ত্রশস্ত্র গুলিবারুদের পরিমাণও এবার একটু বেশি।
কিন্তু বেশি হলেও সবসুদ্ধ জড়িয়ে তিনটে জাহাজে ওই তো মাত্র একশো আশিজন মানুষ আর সাতাশটা ঘোড়া। তাই দিয়ে যে রাজ্য জয় করতে যাচ্ছেন উত্তর-দক্ষিণে তা লম্বাই তো দু-হাজার মাইলের বেশি। তখনকার পেরু সাম্রাজ্য উত্তরে এখনকার ইকোয়েডরের কুইটো থেকে বলিভিয়ার উঁচু পাহাড়ি ডাঙা আর আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিম অংশ নিয়ে চিলির মাউলে নদী পর্যন্ত ছড়িয়ে সত্যিই দু-হাজার মাইলের অনেক বেশি লম্বা ছিল।
ওই ক-টা সেপাই আর ঘোড়া নিয়ে সেই পেরুর মতো বিশাল সাম্রাজ্য জয় করার কথা ভাবা মোচার খোলায় সাগর পার হওয়ার কথা ভাবার মতোই হাস্যকর আজগুবি দিবাস্বপ্ন।
কিন্তু পিজারোর আত্মবিশ্বাস প্রায় উন্মত্ততারই শামিল। দু-দুবার ব্যর্থতার পর প্রৌঢ় বয়সে অদম্য উৎসাহে তিনি আবার সেই অসাধ্য সাধনের আশায় পাড়ি দিয়েছেন।
পিজারোর ইচ্ছা ছিল প্রথমেই আর কোথাও জাহাজ না ধরে একেবারে টম্বেজ , বন্দরে গিয়ে জাহাজ ভেড়ানো। কিন্তু প্রতিকূল হাওয়ায় আর স্রোতে তা সম্ভব হয় না। তেরো দিন সমুদ্রযাত্রার পর পিজারোকে নৌবাহিনী নিয়ে টমবেজ-এর অনেক আগেই জাহাজ ভেড়াতে হয়। সেখান থেকে তিনি সৈন্য-সামন্ত নিয়ে হাঁটাপথে যাত্রা শুরু করেন আর জাহাজ তিনটিকে বলা হয় সমুদ্রপথে তাঁদের সঙ্গী হতে।
অজানা দুর্গম দেশ। আণ্ডিজ পাহাড়ের নদীতে শীতের দিনেই ঢল নামে। সেই ঢল নেমে নদীগুলি ফুলে ফেঁপে দুস্তর হয়ে উঠেছে। লোক-লশকরের হয়রানি আর দুর্দশার সীমা নেই। সোনার লোভ আর পিজারোর আশ্চর্য দৃষ্টান্ত চোখের সামনে না থাকলে ক-জন এই অভিযানে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকত বলা কঠিন।
পিজারো সত্যিই যেন দানোয় পাওয়া মানুষ। পিজারোর জন্মতারিখ নিয়ে অনেক গোলমাল আছে সত্যি, কিন্তু তৃতীয় অভিযানের সময় তাঁর বয়স যে পঞ্চাশ ছাড়িয়ে প্রায় ষাটের কাছে পৌঁছেছে এবিষয়ে মতভেদ নেই। প্রায় ষাট বছরের এই বুড়ো সেদিন শক্ত-সমর্থ জোয়ানদের লজ্জা দিয়েছেন। তাঁর শ্রান্তি ক্লান্তি হতাশা বলে কিছু নেই। দরকার হলে খিদে-তেষ্টা সব তিনি জয় করতে পারেন। শত্রুরা যেমন, অসুখ-বিসুখও তেমনই তাঁকে এড়িয়ে চলে।
