তাঁর সিদ্ধান্ত প্রমাণ করতে পারুন বা না পারুন, মাত্র কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ইপ-পেরেক ছাড়া শুধু দড়িতে বাঁধা কাঠের ভেলায় হেডেরডাল সত্যিই প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পলিনেশিয়ার এক দ্বীপে গিয়ে পৌঁছেছিলেন।
ইংকা বা তাঁদের পূর্বগামীদের রহস্য কিন্তু আজও সম্পূর্ণ ভেদ করা যায়নি।
যাবে কী করে? পেরু পৃথিবীর এক অদ্ভুত দেশ। বহু বিষয়ে অসামান্য হলেও পেরুর মানুষ লেখবার কৌশলটাই আবিষ্কার করেনি। লেখা পুঁথিপত্রের বদলে তাদের যা ছিল তার নাম হল কিপু-গিট দেওয়া কিছু রঙিন সুতুলি। এই গিট দেওয়া সুতুলি দিয়ে কেমন করে তারা কাজ চালাত তাই বুঝে ওঠা যায় না।
যা কিছু স্মৃতি-পুরাণ সব তাদের মুখে মুখে চলে এসেছে। ইংকাদের সম্বন্ধে একটি শুধু লিখিত পুরাণকথা আছে। এ পুরাণকথা লিখে গেছেন গার্সিলার্সে দে ভেগা। তিনিও এক অদ্ভুত মানুষ। বাপ এসপানিওল আর মা ইংকা রাজপরিবারের মেয়ে। ইংকা সাম্রাজ্যের মুখে মুখে ফেরা সমস্ত স্মৃতি-পুরাণ স্পেনের কর্ডোভা শহরে বসে তিনিই তাঁর মহাগ্রন্থ কমেন্তারিয়োস রিয়ালেস-এ স্প্যানিশ-এ লিখে গেছেন।
ইংকাদের আবির্ভাব সম্বন্ধে যে পুরাণকথা তিনি লিখে গেছেন তা পৃথিবীর অন্য বহু জাতির আদি কথার মতোই আজগুবি কল্পনায় বোনা।
পৃথিবীর এক চরম দুর্দিনে সূর্যদেব মানুষের ওপর দয়া করে তাঁর দুটি সন্তান পাঠিয়েছিলেন।
নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি খাওয়াখাওয়ি করে, যেখানে যা দেখে নির্বিচারে তাই পুজো করে মানুষজাতটা তখন ধ্বংস হতে যাচ্ছে।
সূর্যের দুই ছেলে মেয়ে এসে মানুষকে ধ্বংস থেকে বাঁচালেন। এই দুই ভাই বোনের নাম হল মানকো কাপাক আর মামা ওয়েলো হুয়াকো। এই দুই স্বর্গের ভাই বোন প্রথমে মানুষকে সমাজ গড়তে শেখানোর সঙ্গে সভ্যতার আর সব দীক্ষাও দিলেন। তারপর তাঁরা এক সোনার খুঁটি নিয়ে চললেন উত্তর দিকে। সেখানে টিটিকাকা হ্রদের ধারে এক জায়গায় তাঁদের সোনার খুঁটি আপনা থেকে মাটিতে পুঁতে গেল। সেইখানেই দুজনে তখন ডেরা বাঁধলেন। এই ডেরা থেকেই গড়ে উঠল কুজকো শহর।
সেখানে মানকো কাপাক পেরুর পুরুষদের চাষবাস শেখালেন আর মামা ওয়েলো হুয়াকো মেয়েদের শেখালেন সুতোকাটা আর কাপড় বোনা।
ইংকাদের আবির্ভাব সম্বন্ধে আর একটি পুরাণ কাহিনীও আছে। তাতে বলা হয় যে, টিটিকাকা হ্রদের তীর থেকে গৌরবর্ণ শ্মশ্রুমণ্ডিত কিছু মানুষ এসে পেরুর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। পেরুর লোকেদের সভ্যতার দীক্ষা তারাই দিয়েছে।
ইংকাদের সম্বন্ধে বিভিন্ন পুরাণ কাহিনীর মধ্যে অন্য যা তফাতই থাক, একটি বিষয়ে মিল দেখা যায়।
ইংকারা যে দক্ষিণ থেকে এসে প্রথমে টিটিকাকা হ্রদের ধারে এবং তারপর কুজকো শহরে তাদের ঘাঁটি গাড়েন এ বিষয়ে সব পুরাণই একমত। তার বিপরীত। কথা কোনও পুরাণ কাহিনীতে নেই।
কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু হ্রদের ধারে উদয় হওয়ার আগে দক্ষিণে কোথায় ছিলেন ইংকারা? ওদেশের সাধারণ আদিবাসীদের চেয়ে সভ্যতার ওপরের ধাপে তাঁরা উঠলেন কোথা থেকে? একেশ্বর সূর্যকে পূজা করবার আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যও তাঁদের মধ্যে দেখা দিল কেমন করে, কবে?
এ সব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর আজও মেলেনি। সমস্ত আমেরিকার নৃতত্ত্বের ওপর নতুন আলো পড়েছে ইদানীং। বহু ভ্রান্ত ধোঁয়াটে ধারণা দূর হয়ে গেছে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মহাদেশে খ্রিস্টজন্মের হাজারখানেক বছর আগে মানুষ প্রথম এশিয়া ও আমেরিকার উত্তরের বেরিং যোজক দিয়ে পদার্পণ করে, এরকম একটা ধারণা বহুকাল বৈজ্ঞানিক পণ্ডিতরাও আঁকড়ে ধরেছিলেন। সে মতবাদ এখন অচল। তারও বহু পূর্বে, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় বারো হাজার বছর আগে প্রস্তর যুগের মানুষ যে উত্তরের আলাস্কা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার টেরা ডেল ফুয়েগো পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল তার সুস্পষ্ট প্রমাণ এখন পাওয়া গেছে। কিন্তু মেক্সিকো য়ুকাটান আর পেরুর উন্নত সভ্যতার জন্মরহস্যের তাতে মীমাংসা হয়নি।
আশ্চর্যের কথা এই যে, য়ুকাটান ও মেক্সিকোর মায়া, টোলটেক কি আজটেক সভ্যতার সঙ্গে পেরুর ইংকা সভ্যতা ও সাম্রাজ্যের কোনও যোগাযোগই ছিল না। একই যুক্ত মহাদেশের মধ্যে কয়েক হাজার মাইল ব্যবধানে দুটি বিভিন্ন সভ্যতা পরস্পরের সম্পূর্ণ অচেনা থেকে স্বাধীনভাবে গড়ে উঠেছে।
এ দুই সভ্যতার বীজ কি ওই মহাদেশের মাটিতে আপনা থেকে জন্ম নিয়ে সঞ্জাত ও অঙ্কুরিত হয়েছে? না, বাইরের কোথাও থেকে তা বিক্ষিপ্ত হয়ে এসে পড়েছে এই। কুমারী মহাদেশের গর্ভে?
অনেক অনুমান, অনেক জল্পনা কল্পনা মতবাদ সিদ্ধান্তের তোলাপাড়া চলেছে আজও এই নিয়ে।
এশিয়ার প্রাচ্য ভূখণ্ড থেকেই এ সব সভ্যতার বীজ সাগর-স্রোতে ভেসে এসেছে এ মতবাদটাও ফেলনা নয়।
আরও আশ্চর্য অবিশ্বাস্য এমন তথ্যও আছে যা সমস্ত তর্ক একেবারে গুলিয়ে দেয়।
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা নিয়ে নতুন অজানা মহাদেশ কলম্বাসই প্রথম আবিষ্কার করেন আমরা জানি। তার আগে এশিয়া ইউরোপে নতুন মহাদেশ সম্বন্ধে কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রামাণিক উল্লেখ কোথাও নেই। এশিয়া ইউরোপ আফ্রিকা নিয়ে যে সংযুক্ত মহাভূবিস্তার, গৌরাঙ্গ অসামান্য কয়েকটি মানুষের আকস্মিক আবির্ভাব সম্বন্ধে কিছু অস্পষ্ট কিংবদন্তি ছাড়া তার সঙ্গে নতুন মহাদেশের যোগাযোগের কোনও চিহ্ন স্বভাবতই কোথাও দেখা যায়নি। প্রথম বীজ প্রাচীন মহাদেশ থেকে পেলেও নতুন মহাদেশ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন আর স্বতন্ত্র হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী কাটিয়েছে এই সিদ্ধান্তই ছিল সন্দেহাতীত।
