থাকলেও ঘনশ্যাম দাসের সামনে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করা নিরাপদ নয়। কোথা থেকে কী অশ্রুতপূর্ব উল্লেখ ও উদ্ভট উদ্ধৃতি দিয়ে বসবেন সেই ভয়ে সকলেই অল্পবিস্তর সন্ত্রস্ত।
সেদিন নিতান্ত নির্দোষভাবেই আলোচনাটার সুত্রপাত হয়েছিল।
মাথার কেশ যাঁর কাশের মতো শুভ্র সেই হরিসাধনবাবু কিছুদিন ধরে এ সমাবেশে অনুপস্থিত ছিলেন।
তাঁর অনুপস্থিতির কারণ সম্বন্ধে ঔৎসুক্য প্রকাশ করে একটু পরিহাসের সূরে বলেছিলেন মর্মর-মসৃণ যাঁর মস্তক সেই শিবপদবাবু, কী মশাই! আমাদের যে ভুলেই গেছলেন! ড়ুব মেরেছিলেন কোথায়?
না, এই এখানেই ছিলাম! হরিসাধনবাবুকে কেমন যেন অস্বাভাবিক রকম কুণ্ঠিত মনে হয়েছিল।
এখানেই ছিলেন! অসুখবিসুখ করেনি নিশ্চয়? কুম্ভের মতো উদরদেশ যাঁর স্ফীত সেই রামশরণবাবুর জিজ্ঞাসা।
না, অসুখবিসুখ নয়-হরিসাধনবাবু যেন আরও লজ্জিত।
এবার সভার সকলেই কিঞ্চিৎ বিস্মিত। অসুখবিসুখ নয়, তবু পঞ্চরত্নের একজন স্বেচ্ছায় এই সান্ধ্য-সমাবেশে অনুপস্থিত! এ তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার!
তাহলে সত্যিই ড়ুব মেরেছিলেন বলুন? শুধোলেন মেদভারে হস্তীর মতো যিনি বিপুল সেই ভবতারণবাবু, কীসে?
নিরীহ নির্বিবাদী ভবতারণবাবুকেই যেন ভরসা করে হরিসাধনবাবু তাঁর অন্তর্ধান রহস্যটা জানাতে পারলেন।
এই মানে, একটু পড়ালেখা করছি কিছুদিন থেকে। সলজ্জভাবে স্বীকার করলেন হরিসাধনবাবু।
লেখাপড়া নয়, হরিসাধনবাবু শব্দটা পড়ালেখা বলে যে উচ্চারণ করেছেন তা লক্ষ করেছিলেন বোধহয় সকলেই।
প্রথমত সে কারণে এবং দ্বিতীয়ত হরিসাধনবাবু এই বয়সে হঠাৎ পড়ালেখায়। মেতে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মজলিশে আসাও বন্ধ করতে দ্বিধা করেননি উপলব্ধি করে সকলেই অতঃপর অত্যন্ত কৌতূহলী।
কী লেখাপড়া করছেন, মশাই!
আপনিও তো রামশরণবাবুর মতো ভোজনরসিক!
রান্নার কোনও বই-টই লিখছেন নাকি?
নানাদিকের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হরিসাধনবাবু যেন নিরুপায় হয়ে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন—হ্যাঁ, বই-ই লিখছি, তবে রান্নার নয়।
রান্নার নয়? সকলে বিস্মিত—তবে কীসের?
আর রান্নার বই লেখা তো খুব সোজা। জনৈকের মন্তব্য—দেশি বিলাতি নানা বই থেকে টুকে মেরে দাও।
তবে রান্নার বই-এর তেমন কাটতি নেই। আর-একজনের আশঙ্কা!
আমি যা লিখছি তার কিন্তু খুব কাটতি! হরিসাধনবাবু একটু উৎসাহভরেই এবার জানিয়েছিলেন।
কী লিখছেন কী তাই শুনি না! স্বয়ং ঘনশ্যামবাবুর প্রশ্ন।
ঐতিহাসিক উপন্যাস।
সকলেই স্তম্ভিত ও নীরব।
হরিসাধনবাবু সকলের বিস্মিত বিমূঢ় দৃষ্টির সামনে অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে কৈফিয়ত দেবার চেষ্টা করেছিলেন।
সেই সেদিন ঐতিহাসিক উপন্যাসের কথা হচ্ছিল না? ভবতারণের ঘুম-ছাড়ানো দাওয়াইটা একবার তাই থেকে পরখ করে দেখবার সাধ হয়। সেই দেখতে গিয়েই নেশা চেপে গেল!
বলতে বলতে নিজের বক্তৃতাই হরিসাধনবাবুকে উদ্দীপিত করে তুলেছিল।
ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেছিলেন, হলফ করে বলছি আপনাদের, ঐতিহাসিক উপন্যাসের মতো অত সুখ কিছুতে নেই। যেমন পড়ে সুখ, তেমনই লিখে। লিখতে লিখতে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায় টেরই পাই না। যা লিখি তা তো হাজার পাতার এধারে থামতেই চায় না!
হাজার পাতার ঐতিহাসিক উপন্যাস আপনি লিখে ফেলেছেন! কপালে চোখ তুলে ধরা-গলায় বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন শিবপদবাবু।
হ্যাঁ, তবে একটা নয়! এবার গর্বভরেই বলেছিলেন হরিসাধনবাবু, তিনটে হয়ে গেছে, আর তার পরেরটা মাঝামাঝি এসে একটু আটকেছে।
কেন? নালা বুজে গেছে বুঝি!
ঘনশ্যাম দাসের ঈষৎ অকরুণ মন্তব্যটা হরিসাধনবাবু তাঁর আত্মপ্রকাশের উৎসাহে গায়েই মাখেননি এখন। সরলভাবে বলেছিলেন, আটকেছে মানে ক-টা নাম তারিখ গোছের খুঁটিনাটি জোগাড় করার জন্যে লেখাটা বন্ধ রেখেছি ক-দিন!
কিন্তু তিনটে তো লেখা শেষ হয়ে গেছে! বলেছিলেন শিবপদবাবু, সেগুলো কোথাও আটকায়নি বুঝি!
না, আটকাবে কেন? হরিসাধনবাবু তাঁর লিখনকৌশলের গুপ্তরহস্য ব্যক্ত করে দিয়েছিলেন, সব যে আগে থাকতে হাতের কাছে গুছিয়ে রেখেছিলাম। এই ধরুন প্রথম উপন্যাসটা বর্গির হাঙ্গামার সময়কার। তাতে প্রত্যেক পাতায় একবার করে ছিটোবার জন্যে রঘুজি ভোঁসলে আর ভাস্কররাম কোলহাটকর, আর দুকদম না যেতে যেতেই জপের মন্ত্রের মতো আউড়ে ড়ুকরে ওঠবার জন্যে মুবারক মঞ্জিল নাম ক-টা বাগানো ছিল, তারপর ঠিক ঝোপ বুঝে কখনও সলিমুল্লার তারিখ-ই-বাংলা, কখনও বাণেশ্বরের চিত্ৰচম্পু, কখনও পিরলেনকার-এর পোর্তুগিজ-ই-মারাটার-এর উল্লেখ ছড়িয়ে দিয়েছি। বারো আনা লেখা তো এই করেই সারা হয়ে গেছে।
উৎসাহে উত্তেজনায় হরিসাধনবাবু বোধহয় আরও অনেক কিছু বলে ফেলতেন, কিন্তু ঘনশ্যাম দাসই তাঁকে থামিয়ে বলেছিলেন, তিনটে উপন্যাসই লিখে ফেলে চারটের বেলা আটকালো তাহলে কোথায়?
ওই একটু আগ্রা শহরে। হরিসাধনবাবু একটু যেন অধৈর্যের সঙ্গে জানিয়েছিলেন—নাম-টাম অনেক জোগাড় করেছি। দিওয়ান-ই-তান, দিওয়ান-ই-আলা, খান-ই-সামান, তসদিক্ সাজাওল, মুশরিফ, বাহারিস্তান-ই-ঘৈরি, হেদায়েৎ-উল-কোয়াই গোছের চমকে দেওয়া সব আরবি ফারসি শব্দ আর সেই সঙ্গে সোজা বাংলায় একটু রসুন ফোড়ন দেবার মতো উর্দু বুকনি, যেমন— তাড়াতাড়ির জায়গায় তুরন্ত লেখা, ভাগ্যের বদলে কিসম, সুগন্ধের বদলে খোসবু, একটুর জায়গায় জেরাসে, বই-এর জায়গায় কিতাব গোছের একরাশ কথা বসিয়ে ফেলেছি। এখন আগ্রা শহরের একটু বিবরণ আর কয়েকটা তারিখ ঠিকমতো জানবার জন্যেই থামতে হয়েছে। বই কাগজ সেজন্য ঘাঁটছি। ওইগুলো পেলেই উপন্যাস আর থামবে না।
