তারপর বক্তা থামলেন।
বক্তা কিন্তু শ্রীঘনশ্যাম দাস নন, মর্মরের মতো মস্তক যাঁর মসৃণ সেই ইতিহাসের ভূতপূর্ব অধ্যাপক শিবপদবাবু।
সেদিন অন্য সবাই যথাসময়ের আগেই উপস্থিত হলেও দাসমশাই তখনও এসে পৌছোননি। আসর ফাঁকা পেয়ে শিবপদবাবু তাঁর বিদ্যা একটু জাহির করছিলেন।
তারপর-টুকু বলেই তাঁকে থামতে হয়েছে অবশ্য তাঁর শ্রোতাদের মুখেই কীরকম একটা অস্বস্তি লক্ষ করে।
শ্রোতাদের দৃষ্টি অনুসরণ করেই এবার পেছন ফিরে শ্রীঘনশ্যাম দাসকে তিনি দেখতে পেয়েছেন। দাসমশাই কখন তাঁর পেছনে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছেন, শিবপদবাবু টের পাননি।
শিবপদবাবু মুখ ফিরিয়ে একটু অপ্রস্তুতই হলেন। দাসমশাই কিন্তু তাঁকে উৎসাহ দিয়েই বললেন, থামলেন কেন? বলুন, তারপর কী?
অপ্রস্তুত ভাবটা কাটিয়ে উঠতে শিবপদবাবুর দেরি হল না। দাসমশাই-এর কথাগুলো উৎসাহের হলেও মুখের হাসিটা কেমন বাঁকা মনে হওয়ায় তিনি একটু গরম গলাতেই বললেন, তারপর কী আবার? তারপর চিলি আর বলিভিয়া। এ বৃত্তান্ত বলবারই বা দরকার কী? ভূগোলের ম্যাপ দেখলেই জানা যায়। আপনি সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ বলে অত প্যাঁচালো হেঁয়ালি করছিলেন বলে সেটা একটু ভেঙে দিলাম।
খুব ভাল করেছেন। দাসমশাই তাঁর নির্দিষ্ট আসনটিতে অধিষ্ঠিত হয়ে বললেন, কিন্তু পেরুর হেঁয়ালি কি শুধু তার ভৌগোলিক বিবরণ একটু দিয়েই ঘুচিয়ে দেওয়া যায়? পেরুর বিবরণ যা দিলেন তাও তো ঠিক নয়।
ঠিক নয় মানে! শিবপদবাবু প্রায় খাপ্পা—পেরু দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তের সরু একটু লম্বা বাঁকানো ফালির মতো রাজ্য নয়? মরুভূমি থেকে তুষার ঢাকা চুডোর পাহাড় আর অজগর জঙ্গল ও রাজ্যে পাশাপাশি নেই?
ও সবই ঠিকই! দাসমশাই-এর মুখে সহিষ্ণুতার মৃদু হাসি, শুধু আয়তনটা ভুল বলেছেন। আজকের পেরু আর সেই পিজারোর যুগের পেরু এক নয়। সেকালে পেরুর শেষ দক্ষিণের শহর পুনো ছিল না। উত্তর-দক্ষিণে তখনকার পেরু আরও অনেক দূর ছড়ানো। এখনকার ইকোয়েডর বলিভিয়া চিলির বেশ কিছুটা নিয়ে সেকালের সে পেরু রাজ্য আয়তনে ইউরোপের প্রায় তিনভাগের এক ভাগ ছিল। এই বিশাল দেশের রাজ্যেশ্বরকে বলা হত ইংকা। জাপানের সম্রাটবংশের মতো ইংকারা নিজেদের সূর্যের সন্তান বলতেন। ইংকাদের সাম্রাজ্যে লেখার পাট ছিল না। লেখার বিদ্যাই ছিল অজানা। ধাতু হিসেবে তখনও লোহা পেরুতে আবিষ্কৃত হয়নি। তবু সভ্য সচ্ছল সুখী রাজ্য গড়ে তোলার এক আশ্চর্য দৃষ্টান্ত তাঁরা রেখে গেছেন বহুদিক দিয়ে। তাঁদের স্থাপত্য ছিল অদ্ভুত। চুন সুরকি সিমেন্ট কিছু ব্যবহার না করে আর লোহার ব্যবহার না জেনেও তাঁরা বড় বড় পাথরের চাঁই দিয়ে যে সব দুর্গ দেবস্থান প্রাসাদ তৈরি করে গেছেন শুধু মাপসই ভাবে খাঁজে খাঁজে বসাবার কৌশলে, আজও তা অটল। সে যুগে এই দুর্গম মরু পাহাড় অরণ্যের দেশে তাঁরা দিগ্বিদিকে যোগাযোগের হাজার হাজার মাইল রাস্তা তৈরি করিয়েছেন। তাক তাক করে পাহাড় কেটে চাষের ব্যবস্থা করেছেন। যেখানে যেমন দরকার খাল কেটে আর সুড়ঙ্গ নালা বসিয়ে মরুভূমিকেও উর্বর করবার ব্যবস্থা করেছেন দুরন্ত পাহাড়ি নদীর সেচের জল দিয়ে। সমস্ত পৃথিবীর আজ যা একটা প্রধান খাদ্য, সেই আলুর চাষ পেরু থেকেই আমাদের পাওয়া। ইংকাদের পেরু রাজ্যে দারিদ্র ছিল না বললেই হয়। সমস্ত দেশের যা শস্য তার একভাগ দেবতার নামে উৎসর্গ করা হত। এক ভাগ বরাদ্দ হত রাজসরকারের জন্যে আর তিন ভাগের বাকি এক ভাগ পেত প্রজারা। শস্যের মধ্যে প্রধান হল ভুট্টা যা আলুর মতো আমেরিকা থেকেই সমস্ত পৃথিবী পেয়েছে। সেচের সুব্যবস্থায়, চাষের নৈপুণ্যে আর অধ্যবসায়ে ফসল প্রচুর হত। কাউকে উপবাসী থাকতে হত না। তবু দুর্বৎসরের জন্যে রাজভাণ্ডারে ফসল জমা করে রাখার ব্যবস্থাও ছিল। ইংকারা। ছিলেন সুর্যোপাসক। দেবতাকে কেন্দ্র করে রাজ্যশাসন করলেও রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের নীতির আভাস তাঁদের পরিচালনায় পাওয়া যেত।
পেরু রাজ্যের অধীশ্বর এই ইংকারাই কিন্তু সে দেশের সবচেয়ে বড় হেঁয়ালি। নিজেদের সূর্যের সন্তান বলে সূর্যকেই যাঁরা উপাসনা করতেন কোথা থেকে কেমন করে পেরুতে তাঁদের আবির্ভাব ঘটেছে?
প্রমাণ যতদূর পাওয়া যায় তাতে খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতেই পেরুতে তাঁদের আধিপত্য শুরু হয়েছে মনে হয়।
তাঁরাই কি এসে পেরুকে সভ্যতার দীক্ষা দিয়েছেন?
না, তা নয়। পেরুর সভ্যতা আরও অনেক প্রাচীন। টিটিকাকা হ্রদের কাছে এমন সব ধ্বংসস্তুপ আছে যা ইংকাদের আবির্ভাবের অনেক আগে নির্মিত হয়েছিল। ইংকাদের আগে পেরুতে যারা রাজত্ব করে গেছে এসব তাদের কীর্তি। তারাই বা কোন জাতি, কোথা থেকে এসেছে, পেরুর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়ে গেছেই বা কোথায়?
প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহাসিকরা এখনও উত্তর খুঁজছেন। সুদূর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এক তরুণ পণ্ডিত গবেষক এই সেদিন ইংকাদের পূর্বগামীদের রহস্য ভেদ করতে মাত্র একটি কাঠের ভেলায় অকূল প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়েই অক্ষয় কীর্তি রেখেছেন। অজানা দেশের উপকূলের সাগরজলে পালতোলা যে বিচিত্র ভেলা দেখে পিজারোর নৌ-প্রধান রুইজ বিস্মিত বিমূঢ় হয়েছিলেন এ সেই বালসা ভেলা। নরওয়ের তরুণ দুঃসাহসী পণ্ডিত থর হেডেরডাল এই বালসা ভেলায় প্রশান্ত মহাসাগরের পারের যে-কোনও পলিনেশীয় দ্বীপবিন্দুতে পৌঁছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, ইংকাদের আগে পেরুতে যাদের প্রতাপ ছিল তারাই ভেলায় ভেসে এসে পলিনেশিয়ার সমস্ত ছড়ানো দ্বীপে ডেরা পেতে তাদের সভ্যতা ছড়িয়েছে।
