ফিরে যাওয়া!ঘনরামের সমস্ত কথার মধ্যে শুধু এইটুকুই বিশেষ করে লক্ষ করে কাপিন সানসেদো সবিস্ময়ে বলতে গেছেন, তা হলে তুমি–
হ্যাঁ, কাপিন। সানসেদোকে তাঁর বিস্মিত মন্তব্যটা শেষ করতে না দিয়ে ঘনরাম বলেছেন, আমি সেই সুদূর উদয়সাগরের দেশেরই লোক, সেখানেই ফিরে যাব সময় আর সুযোগ হলে। কিন্তু নিয়তির সমস্ত দাবি চুকিয়ে শাপমুক্ত না হলে সে সময় আর সুযোগও আমার হবে না। তাই বলছি আপনার গুরুদেব সত্যদ্রষ্টা হলে অজানা নিরুদ্দেশে পাড়ি দিয়ে তিনটির পর চতুর্থ এক মহাসাগর আমায় দেখতে হবে, রক্তের নদী বইবে আমার সামনে, আর পৃথিবীর কেউ আজও যা জানে না, এমন এক অচিন রহস্যের দেশে সোনায় বাঁধানো পথেঘাটে আমি এক রাজকুমারীর বরমাল্য পাব।
কাপিন সানসেদোর মুখে একটু স্নেহের হাসি দেখা দিয়েছে এবার। বলেছেন, কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে মনে রেখেছ দেখছি! কিন্তু এসব তো আমার গুরুদেবের কথা নয়। আমি আমার অসম্পূর্ণ বিদ্যার সামান্য ক্ষমতায় তোমার ওই নিয়তি দেখেছিলাম। তখনই তো বলেছিলাম আমার ও গণনা অভ্রান্ত বলে মনে কোরো না। গুরুদেবের কাছে কতটুকু আর আমি শেখার সুযোগ পেয়েছি!
কিন্তু যেটুকু শিখেছেন তাতেই আপনার গণনায় আপনার গুরুদেবের হাতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।যথার্থ শ্রদ্ধার সঙ্গে বলেছেন ঘনরাম, আমায় যা বলেছিলেন, তার শুরুটা যখন এমন নিদারুণভাবে ফলেছে, শেষটাও তখন আশ্চর্যভাবে ফলবার আশা আমি রাখি। তাই বলছি, পিজারোর অভিযান বন্ধ হতে পারে না, আর গুরুদেবের কাছে আপনার সত্যরক্ষার জন্যে পিজারোর জাহাজ সেভিল থেকে লুকিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আপনাকে উপলক্ষ হতে হবেই।
সানসেদোর আপত্তির কারণ তখনও হয়তো ছিল কিন্তু তিনি নীরবে এবার নিয়তির নির্দেশ হিসেবেই যেন ঘনরামের কথা মেনে নিয়েছেন।
এত সব বোঝাপড়া সত্ত্বেও ঘনরাম আর কাপিন সানসেদোর সব ফন্দিফিকিরই বোধহয় ভেস্তে যেত। পিজারোর জাহাজ সেভিল-এর বন্দরেই আটক হয়ে থাকত কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ-এর হুকুমে। কারণ, মনতরো শহর থেকে যে জেলে নৌকো ভাড়া করে ঘনরাম আর সানসেদো গুয়াদালকুইভির নদী দিয়ে দক্ষিণে পালিয়েছিলেন, একটু দেরিতে হলেও শেষপর্যন্ত সোরাবিয়া তার মালিকের কাছে সমস্ত খবর তখন পেয়ে গেছে। খবর পেয়েই জেলে নৌকোর পেছনে ধাওয়া করতে সে দেরি করেনি। আজকালকার দিনে গুয়াদালকুইভির নদী প্রশস্ত জলপথ হিসেবে সেভিল-এ এসেই শেষ। কিন্তু মুরদের আমলে তো বটেই, ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে পর্যন্ত সে-নদী দিয়ে কর্দোভা পর্যন্ত বড় বড় জাহাজের যাতায়াত ছিল। সোরাবিয়া মনতরো থেকে একটি জেলে নৌকোতেই কর্দোভায় এসে নেমেছিল নদীপথে তাড়াতাড়ি যাবার জন্যে একটা দ্রুতগামী পানসি ভাড়া করবার জন্যে। সে পানসি নিয়ে কর্ডোভা থেকে রওনা হতে পারলে পিজারোর জাহাজ অন্ধকার কুয়াশার মধ্যে গোপনে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার সুযোগ ঘনরাম আর সানসেদো পেতেন না। তার আগেই সেভিল-এ এসে পৌঁছে তাঁদের ধরতে পারুক বা না-পারুক, সোরাবিয়া সব ফন্দি ভণ্ডুল করে দিত।
কিন্তু কর্দোভা থেকে পানসি নিয়ে শিকারের পেছনে ধাওয়া করা সোরাবিয়ার হয়ে ওঠেনি। তাকে নিজেকেই সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে হয়েছে আচমকা।
পানসি ভাড়া করবার ঘাটে এমন একটি লোকের সঙ্গে তার অকস্মাৎ দেখা, যাঁকে এড়াবার জন্যে টোলেডোর রাজদরবারে ইনামের লোভও সে ছেড়ে এসেছে।
হ্যাঁ, হার্নারেমন্ডো কর্টেজই সেই ঘাটে সেদিন উপস্থিত। তিনিও সেভিল যাবার পানসি ভাড়া করতে এসেছেন। সোরাবিয়াকে দেখে তিনি থমকে দাঁড়িয়েছেন। সোরাবিয়াও তখন তাঁকে দেখেছে। দেখেও না দেখার ভান করে সরে পড়বার সুযোগ কিন্তু তার মেলেনি।
কর্টেজ তার পথ আগলে বলেছেন, দাঁড়ান। আপনি কি মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস?
হ্যাঁ, কেন বলুন তো? সোরাবিয়া বেপরোয়া ঔদ্ধত্যের ভান করবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু গলা তার তখন শুকনো।
কী করে, কবে মার্কুইস হলেন সেইটুকু জানবার জন্যে। কঠিন কণ্ঠে বলেছেন কর্টেজ, আমি যেন অন্য একটা নাম জানতাম।
সে অন্য কারও হবে। সোরাবিয়া ছাই মেড়ে-দেওয়া মুখে পাশ কাটিয়ে ব্যস্ত হয়ে চলে গেছে। এবার কর্টেজ বাধা দেননি। কিন্তু সেভিল যাওয়া বাতিল করে তিনি আবার রওনা হয়েছেন টোলেডোতে সেইদিনই।
সারাবিয়া তার ভাড়া করা পানসির দখল নিতেও আর কর্দোভা ঘাটে আসেনি।
১৪. সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ
সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ শুনতে শুনতে তো কান পচে যাবার জোগাড়! কিন্তু দেশটা কী কেউ বোধহয় বোবাঝেননি। দেশটা আসলে হল পেরু। হ্যাঁ, দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তের পেরু রাজ্য, প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে একটু সরু বাঁকানো পটির মতো যা লাগানো আছে।
দেশটা অবশ্য সত্যিই অদ্ভুত। সাহারার মতো মরুভূমি, তার পরেই হিমালয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো নগরাধিরাজ, আর তারই লাগাও কঙ্গোর মতো অজগর গহন জঙ্গল—একই রাজ্যে এমন পাশাপাশি পৃথিবীর আর কোথাও পাবার নয়। পেরুর প্রশান্ত সমুদ্রের নীল জল থেকে শুরু করে ধূ ধূ মরু হিমেল তুষারঢাকা পাহাড় আর গহন অরণ্য আজকালকার জেট বিমানে অন্তত দু-ঘণ্টার মধ্যেই বোধহয় পার হওয়া যায়।
পশ্চিমে সমুদ্র উপকূলের মরুভূমি চওড়ায় কোথাও ষাট মাইলের বেশি নয়, কিন্তু লম্বায় প্রায় চোদ্দোশো মাইল। এই মরুভূমির পরই আন্ডিজ পাহাড়ের সিয়েরা আর তার পর মনটানা অর্থাৎ গহন জঙ্গল। আন্ডিজ পর্বতমালা ছোটখাটো পাহাড় নয়, মর্যাদায় তা হিমালয়ের পরেই। পেরুর মধ্যেই তার ইয়াসকারান চুড়োর উচ্চতা প্রায় বাইশ হাজার ফিট। মরুভূমির সমতল থেকে এ পাহাড়শ্রেণী প্রায় খাড়াভাবেই উঠে গেছে। সমুদ্রের লেভেল ছাড়িয়ে ষোলো হাজার ফুট উঠতে পঁচাশি মাইলের বেশি যেতে হয় না। আন্ডিজ পাহাড়ের মাথায় এই পেরুতেই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মালভূমির হ্রদ টিটিকাকা। তার উচ্চতা সাড়ে বারো হাজার ফুটেরও বেশি। টিটিকাকা হ্রদের পশ্চিম তীরের পুনো-ই হল পেরুর দক্ষিণের শেষ বড় শহর। তারপর—
