সোরাবিয়া আর একমুহূর্ত দেরি করেনি। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে বেশ কিছু সওয়ার সেপাই ভাড়া করে পাঠিয়েছে সিয়েরা দে মোরেনার দিকে। সেপাইদের বেশি দূর যেতে হয়নি। ফেরারিদের তারা পায়নি। পেয়েছে ঘোড়া দুটোকে শুধু। যারাই সে দুটোকে নিয়ে গিয়ে থাক, কিছু দূর গিয়েই ছেড়ে দিয়ে গেছে।
ঘোড়া ছেড়ে দুই ফেরারি কীভাবে কোথায় পালিয়েছে, প্রায় টানা জাল দেবার মতো করে সিয়েরা অঞ্চল খুঁজেও সোরাবিয়া কোনও হদিস পায়নি।
হদিস পাবে কী করে? সবকিছুই সে ভেবেছে, শুধু মনতরো শহরের গা বেয়ে বওয়া সরু নদীটার দিকে তার চোখ পড়েনি। এই নদীই যে কর্দোভা ছাড়িয়ে দুই উপনদীর প্রণামী পেয়ে বিরাট গুয়াদালকুইভির হয়ে উঠেছে, সে খেয়ালই তার ছিল না বোধহয়। চুরি-যাওয়া ঘোড়াদুটোকে উত্তর দিকের রাস্তায় পেয়েই তার হিসেব গিয়েছে গুলিয়ে।
ঘনরামের প্যাঁচটাই অবশ্য ছিল তাই।
ঘোড়াদুটোকে চুরি করে তাঁরা সিয়েরা দে মোরেনার দিকে রওনা হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু কিছুদূর গিয়ে ধোঁকা দেবার জন্যে সেগুলো ছাড়বার পর আর উত্তরে পা বাড়াননি। গুয়াদালকুইভির সেখানে সবে শুরু-হওয়া দুঃখিনী একটি সরু খালের শামিল। সেই খালের মতো নদীতেই একটা জেলে ডিঙি জোগাড় করে তাঁরা দক্ষিণদিকে পাড়ি দিয়েছেন। উত্তরের পাহাড়ে যখন তাঁদের তল্লাশ চলেছে তখন
তাঁরা সেই জেলে ডিঙি নিয়েই পৌঁছেছেন সেভিল-এর বন্দর পর্যন্ত।
সেখানে গিয়ে পিজারোর জাহাজ খুঁজে বার করতে কোনও অসুবিধাই হয়নি। কিন্তু জাহাজ পেয়ে লাভ কী? ওই বন্দরেই পিজারোর শিরে সংক্রান্তির যে-খবর পেয়েছেন, তাতে হতাশ হয়ে বুঝেছেন যে, নেহাত অঘটন ঘটাবার মন্ত্র ছাড়া সে জাহাজ সমুদ্রে আর পাড়ি দেবে না।
মন্ত্র না হোক, সেই অঘটন ঘটাবার মন্ত্রণাই ঘনরাম শুনিয়েছেন সানসেদোকে।
ঘনরামের কাছে দিনের পর দিন নানা বিবরণ শুনে কাপিন সানসেদো আগে পিজারোর অভিযানের বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেভিল-এ এসে ব্যাপার-স্যাপার দেখে সমস্যার জট তাঁর অচ্ছেদ্যই মনে হয়েছে। হতাশ হয়ে ঘনরামের কাছে তিনি বিদায় চেয়েছেন। তাঁর সোব্রিনা আনাকে তিনি খুঁজে বার করবার চেষ্টা করবেন। তার বাড়ির দরজা থেকে সেবার ঘনরামের সঙ্গে বাধ্য হয়ে চলে আসার পর থেকে কোনও খবরাখবর তার পাননি। সে সেবারে ব্যাকুল হয়ে তাঁকে খুঁজেছিল কিছু যেন একটা বলবার বা কোনও সাহায্য চাইবার জন্যে। কী সে চেয়েছিল জানতে না পেরে মনটায় তাঁর একটা কাঁটা বিঁধে আছে। পিজারোর অভিযান যখন আর সম্ভব হবার নয় তখন সব বিপদ সত্ত্বেও আনাকে তিনি খুঁজতে চান।
ঘনরাম ধৈর্য ধরে সানসেদোর সব কথা শুনেছেন। তারপর হেসে ফেলে বলেছেন, মাপ করবেন, কাপিন। আপনার আদরের সোব্রিনা আনার বিরুদ্ধে কিছু বলছি না, কিন্তু আপনার সাহায্য না পেলে সরলা অবলা হিসেবে সে অকূল পাথারে পড়বে বলে তো মনে হয় না। তা ছাড়া স্পেনে তাকে খোঁজার জন্যে এখন থাকতে চাইলে একূল-ওকূল দুকূলই তো আপনার যাবে। নিজে গারদঘরে গেলে তাঁকে খুঁজবেন কখন?
কিন্তু স্পেন ছেড়ে যাচ্ছিই বা কোথায়! সানসেদো দুঃখের সঙ্গে বলেছেন, অন্য কোনও জাহাজে আমাদের মতো দাগি ফেরারিদের লুকিয়ে-চুরিয়ে জায়গা পাওয়াও শক্ত। পিজারোর জাহাজে যদি বা যাবার আশা ছিল, সে-জাহাজই তো আজ বাদে কাল ক্রোক করবে কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ।
কেমন করে করবে? ঘনরামের মুখ গম্ভীর হলেও চোখে যেন একটু হাসির ঝিলিক দেখা গেছে।
কেমন করে করবে, জানো না! সানসেদো একটু অধৈর্যের সঙ্গে বলেছেন, পরোয়ানা এনে জাহাজে কোতয়ালি পাহারা বসিয়ে দেবে। মেয়াদ ফুরোবার পরও লোকলশকরের বরাদ্দ পুরো যে হয়নি, তা গুণে বার করতে তো তাদের দেরি হবে না। তখন এ-জাহাজ ক্রোক না করে ছাড়বে!
কিন্তু জাহাজ না পেলে ক্রোক করবে কী? এবার ঘনরামের মুখে হাসির ঝিলিক। আরও স্পষ্ট!
তার মানে! অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন সানসেদো। মানেটা ঘনরাম বুঝিয়ে দিয়েছেন বিশদভাবে। কী যে বুঝিয়েছেন তা আমরা জানি। সানসেদোর কিন্তু মনের সংশয় তাতে কাটেনি।
দুঃসাহসিক ফন্দিটায় বুদ্ধির পরিচয় আছে বলে স্বীকার করলেও তা সফল হওয়া অসম্ভব বলেই তাঁর মনে হয়েছে।
কিন্তু তা যে হতেই হবে, কাপিন, এবার গম্ভীর হয়েছেন ঘনরাম, নইলে যাঁর কাছে আপনি পরম দীক্ষা নিয়েছেন, আপনার সেই গুরুদেবের কথাই মিথ্যে হয়ে যাবে!
আমার গুরুদেবের কথা মিথ্যে? সানসেদো বিমূঢ় যেমন হয়েছেন, অবান্তর কথাটায় তেমনই বেশ একটু ক্ষুব্ধও তাঁর গুরুদেবের অসম্মানে।
হ্যাঁ! অবিচলিতভাবে বলেছেন ঘনরাম, পিজারো যদি জাহাজ নিয়ে এ অভিযানে যেতে না পারেন, তা হলে আমার নিয়তি যে পূর্ণ হবে না। আর আমার নিয়তি পূর্ণ না হলে আপনার গুরুদেবের শেষ ইচ্ছা আমাকে দিয়ে পূরণ হবে কী করে?
সানসেদো এবার অবাক হয়ে ঘনরামের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলেছেন, তার মানে তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণের ভার নিতে যার আসবার কথা বলে গেছেন তুমি সে-ই!
আমার তো তাই মনে হয়। মৃদু একটু হেসে বলেছেন ঘনরাম, নইলে আপনার সঙ্গে এমন আশাতীতভাবে আমার আবার সেভিল-এর রাস্তায় দেখা হবে কেন? আপনার গুরুদেবের শেষ লিপি উদ্ধার হবেই বা কেন আমার হাত দিয়ে! আর উদয়সাগরের তীরের যে আশ্চর্য দেশ থেকে আপনার গুরুদেব এসেছিলেন, সেই দেশে ফিরে যাওয়ার চেয়ে বড় কামনা আমার কিছু থাকবে না কেন?
