দু-দুজন প্রহরীকে কাবু করে ঘনরাম আর সানসেদো যদি পালাতেন, তা হলে জ্যান্ত কি মরা যে-কোনও অবস্থায় তাদের পাত্তা অবশ্য পাওয়া যেত। কোনও চিহ্ন পর্যন্ত না রেখে গারখানা থেকে তারা অমন বেমালুম লোপাট নিশ্চয় হতেন না।
প্রহরীরা তা হলে কয়েদিদের সঙ্গেই পালিয়েছে। শুধু তাই নয়, কয়েদিদের পালাবার সমস্ত সুযোগ নিজেরাই করে দিয়ে একরকম জোরজবরদস্তি করে তাড়িয়ে বার করেছে তারাই।
ঘনরাম সেই ফন্দিই এঁটেছিলেন। যে-প্যাঁচ তিনি করেছিলেন তা পুরোপুরি সফল হয়েছে।
যে প্রহরী রাত্রের টহলে কয়েদি দু-জনের গোপন ফিসফিস থেকে গলাবাজির ঝগড়া শুনেছিল এক রাত্রের বেশি নিজেকে সে সামলে রাখতে পারেনি। স্বপ্নেও যা ভাবতে পারেনি এমন গুপ্তধন বাগাবার এ সুযোগ কি ছাড়া যায়?
সমস্ত কিছু একলা হাতাতে পারলেই অবশ্য সে খুশি হত। কিন্তু তার তো উপায় নেই।
বাধ্য হয়েই দিনের পাহারাদারকে গোপনে সব কথা জানিয়ে ভাগীদার করতে হয়েছে।
সেই রাত্রেই পাহারাদারদের শেষ রোঁদের কিছুক্ষণ বাদে কুঠুরির দু-কোণে মুখ খুঁজড়ে শুয়ে থাকা অবস্থায় ঘনরাম আর সানসেদো অতি সন্তর্পণে কুঠুরির দরজার তালা খোলার আওয়াজ পেয়েছেন। তারপর পা টিপে টিপে কুঠুরির ভেতর ঢাকার শব্দ।
কানের কাছে তারপর ফিসফিস শোনা গেছে গায়ে মৃদু ঠেলার সঙ্গে।
এই ওঠো ওঠো, পালাতে চাও তো উঠে পড়ো জলদি!
ঘনরাম আর সানসেদো দু-জনেই যেন ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে বসেছেন। কুঠুরির মধ্যে আচমকা দুই প্রহরীকে দেখে আঁতকে চিৎকারই বুঝি করে ওঠেন তাঁরা।
তাঁদের মুখে প্রায় হাত চাপা দিয়ে প্রহরীকে সে বিপদ ঠেকাতে হয়েছে। ঘনরাম আর সানসেদোকে নিয়ে তারপরও কম বেগ পেতে হয়নি। প্রহরীদের ধারণা ছিল ছাড়া পাবার নামে দুই কয়েদিই ধেই ধেই নৃত্য করে গারদঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। তার বদলে দু-জনের কারওই যেন ছাড়া পাবার তেমন আগ্রহ নেই।
ছাড়া পেয়ে যাব কোথায়? বলেছেন ঘনরাম, আবার তো ধরে এনে গারদে পুরবে!
না, না, সে রকম কোনও ভয় নেই, বলে আশ্বাস দিতে হয়েছে পাহারাদারদের। কিন্তু তাতেও যেন চিড়ে ভেজেনি। ঘনরাম যদি বা রাজি হয়েছেন, সানসেদো আপত্তি তুলেছেন। ছাড়া পেয়ে তাঁর লাভ কী! যে গুপ্তধন উদ্ধার করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন, তা যখন আর উদ্ধার করা যাবে না তখন বাইরে থাকাও যা, এই গারদঘরেও থাকা তা-ই।
তা কেন হবে! একটু বেশি উৎসাহই দেখিয়ে ফেলেছে প্রহরীরা। গুপ্তধন উদ্ধার করা আটকাচ্ছে কে? দরকার হলে আমরাই সাহায্য করতে প্রস্তুত।
তোমরাও সাহায্য করতে প্রস্তুত!ঘনরাম আর সানসেদো দু-জনেই যেন খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠেছেন।
তারপরই একটু ফ্যাকড়া তুলেছেন সানসেদো, কিন্তু উদ্ধার হলে গুপ্তধনের ভাগটা হবে কীরকম? ঘনরামের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছেন, ওই ঠগটাই সিংহভাগ নেবে তা হতে দেব না।
তা আমি চাইও না। উদার হয়ে উঠেছেন ঘনরাম, চারজন আছি, চারজনের ভাগ হবে সমান সমান। কিন্তু তার জন্যে আমার একটা শর্ত মানতে হবে।
কী শর্ত? শর্ত হল গারদঘর থেকে বেরিয়ে আমি যেমনটি যখনটি বলব, তাই মানতে হবে। আমার ওপর কারও কথা চলবে না। হদিস যার, হুকুম তার।
সানসেদো একটু যেন মৃদু আপত্তি করতে গেছেন। কিন্তু প্রহরীরা তাঁকে থামিয়ে দিয়েছে। হদিস যার হুকুম তার-এ-ব্যবস্থা মানতে তাদের কোনও আপত্তি নেই।
ফিসফিসিয়ে এসব তর্ক মীমাংসার মধ্যে পাহারাদারদের নিয়ে আসা পোশাক বদল হয়ে গেছে ঘনরাম আর সানসেদোর। নতুন পোশাক আর কিছুর নয়, পাহারাদারদেরই। সেই পোশাক পরে রাতের অন্ধকারে গারখানা থেকে যখন তারা বেরিয়েছে তখন সন্দেহ কেউ করেনি, বাধা তাদের দেয়নি কেউ।
সে রাত্রে কেউ কিছু না জানলেও পরের দিন হুলুস্থুল পড়ে গেছে গারখানায়। খবর পেয়ে খাপ্পা হয়ে প্রথমেই ছুটে এসেছে সোরাবিয়া। আলগুয়াসিল মানে শহরকোটাল তার হাতের লোক। খোঁজ করবার সে আর কিছু বাকি রাখেনি। মেদেলিন শহর তো তোলপাড় করে তুলেছেই, ত্রিয়ানায় বেদেদের ঘাঁটিতে পর্যন্ত। পরোয়ানা দিয়ে লোক পাঠিয়েছে জায়গাটা চষে ফেলে খোঁজবার জন্যে।
কিন্তু কোথাও তাদের পাত্তা পাওয়া যায়নি।
পাওয়া যাবে কী করে? ঘনরাম আর সানসেদো এবার বুঝেসুঝেই ত্রিয়ানার ত্রিসীমানায় যাননি, মেদেলিন শহরেরও ধারে কাছে নয়।
সোরাবিয়ার লাগানো চর যতদূর পর্যন্ত তাঁদের খোঁজ পায়, তা সে ছোট্ট একটি শহর মনতরো। সেই শহরেই তাঁদের সঙ্গী পাহারাদার দু-জন ধরা পড়ে। তারাও তখন অস্থির হয়ে ঘনরাম আর সানসেদোকে খুঁজে ফিরছে। ঘনরাম আর সানসেদো তাদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছেন। কী করে কোথায় যে পালিয়েছেন সেইটেই গভীর রহস্য।
পাহারাদারদের কথায় জানা যায় যে, গুপ্তধনের খোঁজে তাদের মাতব্বর হিসেবে ঘনরাম সকলকে নিয়ে কর্দোভায় আসছিলেন। পথে এই মনতরো শহরে রাতটা শুধু কাটাবার কথা। কর্দোভাও তাদের লক্ষ্য নয়। সেখান থেকে আর একটু থেমে পাসাদাস শহরে গিয়ে গুয়াদালকুইভির-এর উপনদী গুয়াদিয়ানা মেনর ধরে আবার উত্তরে যাওয়াই নাকি তাদের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এই শহরে প্রায় যেন তাদের চোখের ওপর দিয়ে ঘনরাম আর সানসেদো গায়েব হয়ে গেছেন।
পাহারাদারেরা তো নয়ই, সোরাবিয়া নিজেও চরেদের কাছে খবর পেয়ে মনতরোতে এসে তার দুই শিকারের অন্তর্ধান রহস্যের কোনও কিনারা করতে পারেনি। চেষ্টার ত্রুটি অবশ্য তার ছিল না। কাপিন সানসেদো দুই ফেরারির একজন বলে প্রথমে তাঁদের ধরাটা সহজই মনে হয়েছে। কাপিন সানসেদো মেদেলিন শহরে বেদে সেজে নিজের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করতে যাওয়ার দিন সেই যে খোঁড়া হয়ে ধরা পড়েছিলেন, তারপর তাঁর পা আর পুরোপুরি সারেনি। জখম হয়েই আছে। ঘনরাম অনায়াসে পারলেও কাপিন সানসেদোর পক্ষে হাঁটা পায়ে তাড়াতাড়ি বেশিদূর যাওয়া অসম্ভব। বিশেষ করে উত্তরের দিকে সিয়েরা দে মোরেনার পাহাড়ি অঞ্চলে খোঁড়া পা নিয়ে তিনি যাবার সাহস নিশ্চয় করবেন না। আর ঘনরামও সানসেদোকে ফেলে একলা যে যাবেন না—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এইসব বিচার করে সোরাবিয়ার দৃঢ় ধারণা হয়েছে যে, পায়ে হেঁটে নয়, কোনওরকমে সওয়ার হবার মতো ঘোড়া জোগাড় করেই তার শিকার পালিয়েছে। মনতরো শহরে খোঁজখবর করার পর অকাট্য প্রমাণও পাওয়া গেছে তার। আজকালকার দিনে স্পেনের যে ঘোড়ার দারুণ নামডাক, সেই কাস্পিনার ঘোড়ার বনেদি বংশের তখনই পত্তন হয়েছে। মনতরো শহরের সেইরকম ঘোড়ার পালের এক মালিকের কাছে জানা গেছে যে তার দুটি ঘোড়াও ঘনরাম আর সানসেদোর সঙ্গে একই দিনে নিরুদ্দেশ।
