ঘনরাম নিজেকে নেপথ্যে রাখবার সুযোগ নিয়ে পিজারোর অভিযানে যে ভূমিকা নিয়েছেন তার বিবরণ দেবার আগে আর একটি রহস্য বোধহয় না পরিষ্কার করলে নয়।
ঘনরাম আর কাপিন সানসেদোকে যমপুরীর মতো এক গারখানার কুঠুরিতে বদ্ধ অবস্থায় আমরা শেষ দেখে ছিলাম।
নিজেদের মধ্যে হিংস্র মারামারি করার জন্যে প্রহরীরা তখন তাঁদের হাত-পা বেঁধেই কুঠুরির দু-ধারে ফেলে রেখেছে। সেখান থেকে মুক্তি পাওয়াই তো অলৌকিক ব্যাপার। কেমন করে তা সম্ভব হল?
সে অলৌকিক ব্যাপার সম্ভব হয়েছে এক হিসাবে বলতে গেলে অতি সহজ একটি কৌশলে। কৌশল আর কিছু নয়, মানুষের মনের একটি বিশেষ রিপুকে উসকানি দেওয়া।
গারখানার এক প্রহরী এক রাত্রে ঘনরাম আর সানসেদোর কুঠুরির পাশ দিয়ে শেষ টহল দিয়ে যাবার সময় ফিসফিস কী আলাপ শুনে থমকে থেমে গিয়েছিল।
কী শুনে অমন চমকিত, বিস্মিত হয়েছিল সে পাহারাদার?
যা শুনেছিল তা সামান্য একজন প্রহরী কেন, নেহাত সত্যকার সাধুসন্ন্যাসী ছাড়া যে কোনও সাধারণ মানুষের মাথা ঘুরিয়ে চক্ষু বিস্ফারিত করবার পক্ষে যথেষ্ট।
প্রহরী কাপিন সানসেদো আর ঘনরামকে চুপি চুপি আলাপ করতে শুনেছে গুপ্তধন নিয়ে। স্বয়ং স্পেনের সম্রাটকে লুব্ধ চঞ্চল করে তুলতে পারে এমন গুপ্তধনের কাঁড়ি! এ গুপ্তধন আসলে সম্রাট পঞ্চম চার্লস-এরই, আর জাহাজে মেক্সিকো থেকে আসবার সময় তা চুরি করে কাপিন সানসেদো এমন গোপন জায়গায় লুকিয়ে পুঁতে রেখেছেন যে তাঁর কাছে হদিস না পেলে হাজার বছরেও কেউ খুঁজে বার করতে পারবে না।
এই সব বিবরণের সঙ্গে ফিসফিস আলাপে প্রহরী কাপিন সানসেদোর তীব্র আফশোশও শুনেছে। এত বড় কুবেরের ভাণ্ডার চিরকালের মতো মাটির নীচেই পোঁতা থাকবে, দুনিয়ার কাউকে তার হদিস না দিতে পেরে এই গারখানাতেই তাঁরা শেষ হয়ে যাবেন, সানসেদো আর ঘনরাম দু-জনে এই দুঃখই করেছেন।
নিজেদের ভোগে যখন নেই তখন কাউকে অন্তত হদিসটা দিয়ে গেলে ক্ষতি কী! বলেছেন এবার সানসেদো।
কিন্তু কাকে এ অনুগ্রহ করা যেতে পারে সে মীমাংসা কিছুতেই আর হয়নি। তা ছাড়া আর এক সমস্যার কথাও উঠেছে। হদিস তো শুধু মুখে বলে দিলেই হবে না, গুপ্তস্থানের মাপ-জোকের এমন শক্ত অঙ্ক আছে যা সেখানে গিয়ে না কষতে পারলে নয়। হদিস দিতে হলে আঁক-জোকে ভুল করবে না এমন কাউকে দিতে হয়। তা না হলে সব গুপ্ত সংকেতই বৃথা।
হদিস যদি দিতেই হয় তা হলে কাকে দেওয়া যায় সে আলোচনা এবার প্রহরী রুদ্ধ নিঃশ্বাসে শুনেছে। প্রহরীদের কাউকেই এ সৌভাগ্য যে দেওয়া উচিত এ বিষয়ে একমত হতে শোনা গেছে দুজনকেই। মতভেদ হয়েছে শুধু কোন প্রহরী এ হদিস পাবার যোগ্য তারই বিচার নিয়ে।
উৎকর্ণ হয়ে যে প্রহরী তাঁদের কথা শুনছে ঘনরাম তার নামই করেছেন প্রথমে। সানসেদো তাতে সায় দেননি। সকাল থেকে দিনের বেলা যে তাঁদের পাহারায় থাকে সে-ই তাঁর মতে গুপ্তধন পাবার যোগ্য।
দু-জনে এবার নিজের নিজের বাছাই নিয়ে ওকালতি শুরু করেছেন।
ঘনরাম রাত্রের পাহারাদারের হয়ে লড়েছেন। লোকটা খুব খারাপ নয়। তার ওপর সারা জীবন এই গারখানার কয়েদিদের সঙ্গে একরকম বন্দি হয়েই কাটিয়ে বুড়ো। হতে চলেছে। সাত রাজার ধন পেয়ে জীবনের বাকি কটা দিন তারই সুখভোগ করার সুবিধে পাওয়া উচিত।
সানসেদো তীব্র প্রতিবাদ করেছন নিজের প্রৌঢ়ত্ব যেন ভুলে গিয়ে। বুড়োর আবার সুখভোগ কী! তার তো জীবন ফুরিয়েই এসেছে। দিনে যে পাহারায় থাকে সে জোয়ান। রাজার ঐশ্বর্য তারই পাওয়া উচিত। পেলে সে তার মান রাখতে পারবে।
মান রাখবে, না যত রকম বদখেয়ালে উড়িয়ে-পুড়িয়ে দেবে! ঘনরাম গলার স্বর খুব চাপা না রেখে বলেছেন, জোয়ানদের হাতে টাকা মানেই পাপের প্রশ্রয়।
তাতে হয়েছে কী! সানসেদোও জ্বলে উঠেছেন, মিঠে গির্জায় দেবার জন্যে তো এ গুপ্তধন নয়, এ ফুর্তি করবার টাকা জোয়ানকেই আমি দেব। আসলে গুপ্তধন তো আমার। আমার যাকে খুশি আমি হদিস দিয়ে যাব।
তাই দিন। বিদ্রূপের স্বরে বলেছেন ঘনরাম, দেখুন কেমন হদিস দিতে পারেন। হদিস লেখা কাগজ আছে আপনার কাছে?
নেই মানে!—সানসেদো অস্থির হয়ে উঠেছেন—আমার জামার হাতায় তা সেলাই করে রাখা আছে।
আছে নয়, ছিল। আপনি ঘুমোবার সময় জামার সেলাই খুলে তা আমি বার করে নিয়েছি। ঘনরাম হিংস্রভাবে হেসেছেন—আর এমন জায়গায় রেখেছি, সারা কুঠুরি ভেঙে খুঁড়েও তার খোঁজ পাবেন না।
তুই বার করে নিয়েছিস? মিথ্যে কথা। সানসেদোর ব্যাকুল হয়ে গায়ের জামা খুলে পরীক্ষা করার শব্দ শোনা গেছে।
তারপর চিৎকার করে গালাগাল দিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ঘনরামের ওপর।
অন্ধকারে ঘনরামেরও পালটা গালাগাল আর দু-জনের ধ্বস্তাধ্বস্তি শোনা গেছে।
সে গোলমালে অন্য প্রহরীরাও আলো নিয়ে ছুটে এসে দু-জনকে আলাদা করে যখন দু-দিকে বেঁধে রেখেছে তখনও মুখের আস্ফালনে তাঁদের কামাই নেই।
সে মুখের লড়াই অবশ্য বেশিক্ষণ চলেনি। ক্লান্ত হয়েই দু-জনকে বুঝি থামতে হয়েছে।
তাদের কুঠুরি সেই থেকে একেবারে নিস্তব্ধ।
দিন দুই বাদে সে কুঠুরি শুধু নিস্তব্ধ নয়, সকাল হবার পর একেবারে ফাঁকাই দেখা গেছে। কুঠুরির দরজার তালা খোলা। ভেতরে দুজনের কেউ নেই। সঙ্গে সঙ্গে গারখানার দু-জন প্রহরীও উধাও!
সানসেদো আর ঘনরামের সঙ্গে দু-জন প্রহরীও উধাও হওয়া থেকে রহস্যটার কিছুটা হদিস পাওয়া উচিত।
