আদেলানতাদো বলছ কাকে? ভ্রুকুটি করে জিজ্ঞাসা করেন পিজারো।
আপনি ছাড়া ও সম্বোধনের যোগ্য আর কে আছে এখানে? সসম্রমে মাথা নুইয়ে বলে লোকটি, শুধু আদেলানতাদো কিংবা আলগুয়ালির মেয়র নয়, কাপিন জেনেরালও আপনাকে বলা উচিত—
থামো! বেশ একটু অস্বস্তি ও অধৈর্যের সঙ্গে লোকটিকে থামিয়ে দিয়ে পিজারো। বলেন, এসব আবোল-তাবোল কথার মানে কী! কোথায় শুনেছ যে আমি কাপিন। জেনেরাল?
কোথাও শুনিনি, আদেলানদো। লোকটা অবিচলিতভাবে বলে, ভর হওয়ার সময় জানতে পেরেছি, যেমন আপনার সেভিল ছেড়ে পালাবার উপায়ও জানতে পেরেছি সেই অবস্থায়।
সেই অবস্থায় জানতে পেরেছ। হতভম্ব হলেও গলাটা কড়া রেখে জিজ্ঞাসা করেন পিজারো, সে ভর হওয়াটা আবার কী!
কী, তা বোঝাতে পারব না, আদেলানদো। তবে মাঝে মাঝে আমাতে আর আমি থাকি না। চাপা গলায় যেন ভয়ে-ভয়ে বলে লোকটি, তখন আশ্চর্য অনেক কিছু আমি জানতে পারি। আমাদের বেদেদের মধ্যে একেই ভর-হওয়া বলে। দেবতা কি অপদেবতা কেউ তখন আমার মধ্যে এসে ঢোকে।
দেবতা নয়, অপদেবতাই হবে।মুখে তাচ্ছিল্যের ভান করলেও পিজারোর অন্ধ কুসংস্কারে জড়ানো মনে লোকটা সম্বন্ধে বেশ একটু ভয়-ভক্তিই জাগে। নিজে থেকেই তাই আবার জিজ্ঞাসা করেন, কী নাম তোমার? কোথা থেকে এখানে এসে জুটলে?
আজ্ঞে নাম আমার গানাদো। লোকটি সবিনয়ে জানায়, আসছি ত্রিয়ানা থেকে। ত্রিয়ানা থেকে আসছ? গানাদো অর্থাৎ গোরু-ঘোড়া নামটা বেদের পক্ষে তেমন বেয়াড়া না লাগলেও, আর ত্রিয়ানাই যে স্পেনের বেদেদের বড় ঘাঁটি তা জানলেও, পিজারো একটু সন্দিগ্ধভাবে জিজ্ঞাসা করেন, সেখানেই ভর হয়ে আমার আর আমার জাহাজের কথা জানতে পেরে চলে এসেছ আমায় সাহায্য করবার জন্যে?
আজ্ঞে! ভর-হওয়া অবস্থার হুকুম তো অমান্য করবার জো নেই। লোকটি অর্থাৎ গানাদোর গলায় আতঙ্ক মেশানো সন্ত্রম ফুটে ওঠে।
ভয়ে বিস্ময়ে পিজারোর সন্দেহ করবার মতো মনের অবস্থা তখন আর নেই। একটু দ্বিধাভরেই তিনি শুধু জিজ্ঞাসা করেন, কিন্তু কাপিন সানসেদোকে জোটালে কী করে? তাঁকে পেলে কোথায়?
ওই ত্রিয়ানাতেই পেলাম, আদেলানতাদো। তাঁকেও আমার ভর-হওয়া দশার হুকুম মেনে এখানে আসতে হয়েছে।
যত আজগুবিই মনে হোক, দেবতা-অপদেবতার নামে জড়ানো কথাগুলোকে অবিশ্বাস করবার সাহস পিজারোর আর হয় না। বেশ একটু আগ্রহের সঙ্গেই তিনি এবার জিজ্ঞাসা করেন, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের গোমেরায় গিয়ে অপেক্ষা করবার হুকুমও। কি তুমি ভর-হওয়া অবস্থায় পেয়েছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ আদেলানতাদো! বেদেরূপী গানাদো গলায় সরল বিস্ময় ফুটিয়ে বলে, নইলে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ কি গোমেরার নাম আমি জানব কোথা থেকে!
এসব নামও তুমি জানতে না! পিজারো সবিস্ময়ে অদ্ভুত বেদেটাকে ভাল করে লক্ষ করবার চেষ্টা করেন। লোকটা তাঁর সম্পূর্ণ অচেনা! গাঢ় কুয়াশার মধ্যে অন্ধকারে তার মুখটা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট হলেও দেহের গড়নটা কিন্তু পিজারোকে যেন কার কথা মনে করিয়ে দেয়।
কাকে যে মনে করিয়ে দেয় সে রাত্রে তো নয়ই, তার পরে অনেক কালের সংস্রবেও পিজারো ধরতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন নানা খণ্ডরহস্য যখন এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় তখন সূর্য কাঁদলে সোনার দেশকে রক্তে ভাসিয়ে তিনি তাঁর ভয়ংকর নিয়তির শেষ ধাপে গিয়ে পৌঁছেছেন।
সে অবশ্য অনেক পরের কথা।
আপাতত অদ্ভুত অচেনা বেদেটার কথা আজগুবি মনে হলেও কুসংস্কার জড়ানো ভয়-ভক্তিতে সব সন্দেহ চাপা দিয়ে তার নির্দেশ মেনে পিজারোর সত্যি-সত্যিই যথেষ্ট লাভ বই লোকসান হয় না।
কাপিন সানসেদো ওই কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার রাতেই সান লকার-এর বিপজ্জনক চড়ার পাশ কাটিয়ে বারদরিয়ায় জাহাজ এনে ফেলে তাঁর নৌবিদ্যার বাহাদুরি দেখান।
পিজারো তাঁর জাহাজ নিয়ে নির্বিঘ্নেই তারপর ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের গোমেরাতে গিয়ে ওঠেন। সেখানেই কাপিন সানসেদোর আদেশ মতো পিজারোর ভাই হার্নারেমন্ডো বাকি জাহাজ দুটি নিয়ে গিয়ে যোগ দেন কয়েক দিন বাদে। সেভিল-এর বন্দরে পরের দিনই কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ থেকে যাঁরা তদন্ত করতে এসেছিলেন
তাঁদের ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে আসা হার্নারেমন্ডোর পক্ষে শক্ত হয়নি!
ছোট বড় অনেক বাধা এর পর দেখা দিলেও সূর্য কাঁদলে সোনার রহস্য-রাজ্যের অভিযান অনিবার্যভাবেই এগিয়ে গেছে।
সেই কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রে সেভিল-এর বন্দর থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে জাহাজ ভেসে যাওয়ার সময় উত্তেজনা আর আশঙ্কার মধ্যে কাপিন সানসেদো ছাড়া আর যে-লোকটির পরিচয় পেয়েছিলেন তার বিষয়ে পিজারোর কৌতূহল বেশিদিন খুব সজাগ কিন্তু থাকেনি। পরের পর আরও উত্তেজনা-জোগানো ঘটনায় আর মাথা-ঘোরানো সমস্যায় সে কৌতূহল আপনা থেকে কিছু পরে ফিকে হয়ে গেছে। ব্যাপারটায় অলৌকিকত্বের আভাস থাকলেও বেদেদের সে রকম ক্ষমতা থাকা। অসম্ভব নয়, এই বিশ্বাসে মানুষটা সম্বন্ধে বিশেষ মনোযোগ দেবার কোনও তাগিদ আর তিনি অনুভব করেননি যে গানাদো নামে একজন বেদে আর-সব মাঝিমাল্লার মধ্যে তারপর বেমালুম মিশে গেছে। অভিযান অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে কাপিন সানসেদো এবং সেই এক অজানা বেদের কাছে এ অভিযান সম্ভব করার জন্যে কৃতজ্ঞ থাকার কথা পিজারোর নিশ্চয় মনে থাকেনি। থাকলে বেদের ছদ্মবেশে ঘনরাম দাসই বোধহয় সবচেয়ে অসুবিধায় পড়তেন, কারণ বিশেষ প্রয়োজনে সামনে আসতে বাধ্য হলেও এ অভিযানে তাঁর যা কাজ তা নেপথ্যে থেকেই সারবার।
