পেসোটা-আসটা ঘুষ দিয়ে ঘনরাম খবর যা বাইরের জগতের পেয়েছেন তা প্রথমে খুশি হবার মতোই মনে হয়েছে। একটু অস্পষ্ট গোলমেলেভাবে হলেও জানা গেছে যে পিজারো বলে কে একজন নাকি সমুদ্র পারের নতুন এক সোনার দেশ দখল করবার হুকুম পেয়েছে সম্রাটের কাছে। সে নাকি জাহাজ সাজিয়ে তৈরি হচ্ছে পাড়ি দেবার জন্যে।
সানসেদো আর ঘনরাম যেমন খুশি তেমনই একটু অস্থির হয়ে উঠেছেন এ খবরে। গারখানায় বন্দি অবস্থায় ঘনরাম সানসেদোকে যতখানি দরকার, পিজারোর অভিযান আর তার লক্ষ্য সম্বন্ধে জানিয়েছেন। পিজারোর অভিযানের বিষয়ে সানসেদো তখন আর নির্লিপ্ত উদাসীন নন।
খুশি হওয়ার সঙ্গে তাঁদের অস্থিরতা শুধু নিজেদের মুক্তির কোনও আশা না দেখে।
যে গারদে তাঁদের রাখা হয়েছে তার অন্য বিষয়ে শাসন তেমন কড়া না হলেও সেখান থেকে বার হবার কথা ভাবাও বুঝি বাতুলতা। সমুদ্রের তলায় পাতালে বন্দি থাকলে বাইরের জগতের মুখ আবার দেখবার যতটুকু আশা থাকে এ গারখানাতেও তার বেশি কিছু নেই।
দেখতে দেখতে দুই-তিন-চার-পাঁচ মাস কেটে গেছে। এবার যা খবর পাওয়া গেছে তা বেশ একটু ভাবিয়ে তোলবার মতো।
এ খবর রক্ষীদের কাছে নয়, পাওয়া গেছে নতুন এক কয়েদির কাছ থেকে। পিজারোর নাকি দারুণ মুশকিল হচ্ছে লোক-লশকর জোগাড় করতে। আর কিছুদিনের মধ্যে তা জোগাড় করতে না পারলে তাঁকে কথার খেলাপের জন্যে কাঠগড়ায় উঠতে হবে।
এ খবর যে এনেছে সে নিজেও একজন বার দরিয়ার মাল্লা। হিসপানিওলা ফার্নানদিনা পর্যন্ত এর আগে ঘুরে এসেছে জাহাজে। পিজারোর অভিযানের রংদার গুজব শুনে কাজ নিতে সেভিল-এ গেছল। সেখানে কিন্তু উলটো খবর শুনেছে। ওসব খোলামকুচির মতো সোনা সস্তার গালগল্প নাকি শুধু বোকাদের ঠকিয়ে জাহাজে তোলবার ফিকিরে বানানো। পিজারোর জাহাজে নাম লেখাবার চেষ্টা না করেই সে তাই ফিরে এসেছে। তারপর মেদেলিন শহরে এক গুঁড়িখানায় হল্লা মারামারি করে চালান হয়েছে এই গারদে।
পিজারোর দুরবস্থার এ খবর শোনবার পর সানসেদো হতাশ হয়েছেন, আর ঘনরাম গুম হয়ে থেকেছেন কয়েকদিন।
তারপর এক রাত্রে পারাহাদার এক রক্ষী ঘনরাম আর সানসেদোর গারদ কুঠুরির পাশ দিয়ে শেষ টহল দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ চমকে থেমে গেছে। ভাল করে নজরবন্দি রাখবার জন্যে সোরাবিয়ার পরামর্শ মতোই এ দুজনকে এক কুঠুরিতে রাত্রে বন্ধ রাখা হয়।
কুঠুরির ভেতর থেকে চুপি চুপি কী আলাপ শোনা যাচ্ছে। চাপা গলায় হলেও কথাগুলো না বোঝবার মতো অস্পষ্ট নয়।
সে আলাপের যেটুকু মর্ম রক্ষী বুঝেছে তাইতেই তার চোখ তখন ছানাবড়া। চুপি চুপি আলাপটা তারপর হঠাৎ একেবারে তুমুল ঝগড়া হয়ে উঠে তাকেও চমকে দিয়েছে।
দু-জনে রাগে খেপে গিয়ে পরস্পরকে যা নয় তাই বলতে বলতে বুঝি খুনই করে ফেলে।
অন্য রক্ষীরাও ছুটে এসেছে দারুণ গোলমালে। দরজা খুলে দু-জনকে ছাড়িয়ে দিয়ে কুঠুরির দু-পাশে বেঁধে ফেলে রাখবার ব্যবস্থা হয়েছে তারপর।
এমনিভাবে দু-দিন কেটেছে ঘনরাম আর সানসেদোর।
দু-দিন বাদেই কিন্তু আর তাদের দেখা যায়নি। গারখানার পাথরের দেওয়াল যেন হাওয়ার চেয়েও সূক্ষ্মদেহে তাঁরা ভেদ করে চলে গেছেন।
তারপর শেষ পর্যন্ত যেখানে গিয়ে তাঁরা উঠেছেন পিজারোর সেই খাস জাহাজ আচমকা সেভিল-এর বন্দর ছেড়ে কেমন করে লুকিয়ে পালায় সে বিবরণ আমরা আগেই জেনেছি।
পনেরোশো ত্রিশ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসের এক গাঢ় কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রে সেভিল-এর বন্দরে বাঁধা তাঁর জাহাজ বিনা হুকুমেই হঠাৎ যেন ভৌতিক নির্দেশে গুয়াদালকুইভির নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়ায় বিমূঢ় ব্যাকুলভাবে তার কারণ সন্ধান করতে গিয়ে পিজারো হাল চালাবার টঙে কাপিন সানসেদোকে সবিস্ময়ে আবিষ্কার করে তাঁর কাছে জাহাজ এভাবে নিঃশব্দে গোপনে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ায় অদ্ভুত কৈফিয়তের সঙ্গে আর একটি এমন কথা শোনেন যা সত্যিই কৌতূহল জাগাবার মতো।
কাপিন সানসেদো গোপনে জাহাজ ছাড়ার ব্যাপারে অবিশ্বাস্য যে-সব কাণ্ড-কারখানা করেছেন তাতে তিনি পরামর্শ ও সাহায্য পেয়েছেন নাকি আর-একজনের কাছে। তাঁর সে সঙ্গী সহায় নাকি সেই জাহাজেই বর্তমান।
কে সে লোকটা? একটু রূঢ়ভাবেই জানতে চান পিজারো। কাপিন সানসেদোর কৈফিয়তটা যতই মনে ধরুক, তাঁর ওপর খোদকারি করে জাহাজ নিয়ে পালাবার ফন্দির স্পর্ধাটা তখনও পিজারো পুরোপুরি বরদাস্ত করতে পারছেন না।
সে লোকটার পরিচয় আর কী দেব! দেবার মতো কিছু নেই, হেসে বলেন সানসেদো, এই জাহাজেই সে আছে, সময় মতো আপনার সামনে হাজির হবে।
সময় মতো মানে? বেশ গরম হয়ে ওঠে পিজারোর গলা, এখুনি তাকে ডাকান। নইলে সমস্ত জাহাজ আমি তালাশ করাব। তার দরকার হবে না, আদেলানতাদো!
পিজারোকে চমকে পেছন ফিরে তাকাতে হয় এবার। শুধু যে পেছনে অপ্রত্যাশিত কণ্ঠ শুনেই তিনি চমকান তা নয়, আদেলানদো বলে সম্বোধনও তাঁকে বিস্মিত করে। যে সোনার রাজ্য তিনি আবিষ্কার ও জয় করতে যাচ্ছেন তার পুরস্কারস্বরূপ টোলেডোর রাজদরবার থেকে তাঁকে অন্যান্য সুবিধা ও সম্মানের সঙ্গে এই পদবির প্রতিশ্রুতিও যে দেওয়া হয়েছে তা তো যার-তার জানবার কথা নয়।
লোকটাকে দেখবার পর তার মুখে এ সম্বোধন তো আরও অবিশ্বাস্য লাগে।
চেহারা পোশাক দেখে লোকটা যে জাতে বেদে এ বিষয়ে পিজারোর কোনও সন্দেহ থাকে না। চুরি, হাত-সাফাই ছাড়া বেদেদের অদ্ভুত কিছু কিছু ক্ষমতা থাকার গুজব তিনি বহুকাল আগে স্পেনে থাকতে শুনেছিলেন। কিন্তু টোলেডোর রাজদরবারের গোপন ব্যাপার জানবার মতো বিদ্যে তাদের থাকতে পারে বলে তো বিশ্বাস হয় না।
