মার্কুইসরূপী সোরাবিয়া টোলেডো থেকে একটু ঘুরপথে মেদেলিন শহরেই গিয়ে উঠেছে তারপর। সেখানে গিয়ে কোয়ালি থেকে খবর নিয়ে সানসেদোর বাড়ি তখনও নিলেমে ওঠেনি জেনে খুশি হয়েছে অত্যন্ত। যেখানে যেমন দরকার টাকা খাইয়ে এ বাড়ি সুবিধামতো কিনে নিতে পোরাবিয়াকে খুব বেগ পেতে হয়নি।
তার সব মতলবই এ পর্যন্ত প্রায় নির্বিঘ্নে হাসিল হবার পর আরও এমন একটি ব্যাপার ঘটেছে যা যেমন সুখের তেমনই তার আশাতীত।
মেদেলিন শহরে সানসেদোর বাড়িতে সোরাবিয়া তখন সবে সাজিয়ে গুছিয়ে বসবার আয়োজন করছে। নিজে সে তখনও সে বাড়িতে এসে ওঠেনি। শহরের এক সরাই-এ থেকে ঠিকাদারকে দিয়ে বাড়িটার যেখানে যা দরকার অদল-বদল মেরামত করাচ্ছে।
সেই সময়ে একদিন একদল বেদেকে সেখানে ঘোরাঘুরি করতে দেখে ঠিকাদারই তাদের ভেতরে ডাকে।
স্পেনে বেদেদের আমদানি তখনও খুব বেশিদিন হয়নি। চুরি-চামারি করার দুর্নাম সত্ত্বেও রকমারি নাচ-গান আর ভূত-ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতার জন্যে সাধারণের কাছে তাদের আদর-খাতির যথেষ্ট।
ঠিকাদার প্রথমে অবশ্য বেদেদের ধমক দিয়েই সেখানে ঘুর ঘুর করার কারণ জিজ্ঞাসা করে। ধমক-ধামক দিয়ে তাদের কাছে একটু গানবাজনা শোনাই তার। মতলব ছিল বোধহয়। কিন্তু বেদেদের সর্দার গোছের একজন তার ধমকের জবাবে যা বলে তা শুনে ঠিকাদারের চক্ষুস্থির।
বেদেরা মিছিমিছি এ বাড়ির কাছে ঘোরাফেরা করছে না। এ বাড়িতে কেউ যা ভাবতে পারে না এমন গুপ্তধনের ইশারা নাকি তারা গুণে পেয়েছে।
অন্য কোথাও হলে যদি বা সন্দেহ হত, কাপিন সানসেদোর বাড়িতে গুপ্তধন থাকা এমন কিছু আজগুবি বলে ঠিকাদারের মনে হয় না। কাপিন সানসেদো যে সম্রাটের জন্যে মেক্সিকো থেকে পাঠানো সোনাদানা গাপ করে ফেরারি, মেদেলিন শহরের কে না তা জানে। সে চোরাই মাল সানসেদোর এই বাড়িতেই কোথাও লুকিয়ে পুঁতে রাখা অসম্ভব কিছু নয়।
ঠিকাদার লুব্ধ উৎসাহিত হয়ে বেদেদের গুপ্তধন খোঁজবার অনুমতি দেয়। খুঁজে পেলে তাদের মোটা বকশিশ। মালিক সোরাবিয়া তখনও এসে পৌছোয়নি। তার হয়ে এ আশ্বাস দিতে তবু ঠিকাদারের বাধে না।
বেদেরা গুপ্তধন খোঁজার ক্রিয়া-প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। গুপ্তধন তারা যে বার করবেই এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, শুধু জায়গাটা নির্ভুলভাবে খোঁজবার জন্যে তাদের একটা জিনিস দরকার।
কী জিনিস?
এ বাড়ির যে আসল মালিক তার নিজের নাড়াচাড়া জিনিস কিছু।
এ বাড়ির আসল মালিক তো ছিল সানসেদো। কিন্তু তার জিনিস এখন পাওয়া যাবে কোথায়? নাড়াচাড়া যা যায় সব তো এতদিনে মীরমিদনরাই লুঠপাট করে নিয়ে গেছে।
কিছুই তা হলে নেই?
হ্যাঁ, আছে বটে, পুড়িয়ে দেবার মতো কিছু কাগজপত্রের বাণ্ডিল? হবে তাতে কাজ?
দেখাই যাকবলে বেদেরা।
কাজ কিন্তু হয় না। বেদেরা সে কাগজ-পত্র ফিরিয়ে দিয়ে আবার খড়ি পেতে গুনতে বসে।
আর ঠিক সেই সময়ে এসে হাজির হয় নতুন মালিক মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস।
এ সব কী ব্যাপার? জ্বলে উঠে জিজ্ঞাসা করে সোরাবিয়া।
ঠিকাদার উত্তেজিতভাবে বেদেদের গুপ্তধন খোঁজার কথা তাকে জানায়।
কিন্তু নতুন মালিককে দেখে বেদেরাই কেমন যেন গুপ্তধন খোঁজার উৎসাহ হারিয়ে সরে পড়বার জন্যে ব্যাকুল। দু-জন বাদে সবাই তারা সরে পড়বার সুযোগও পায়।
ধরা যে দু-জন পড়ে প্রথমে তাদের দেখেই হিংস্র উল্লাসে চিৎকার করে লোকজনের ভিড় জমিয়ে ফেলেছে সোরাবিয়া।
তা সত্ত্বেও একজন বোধহয় ইচ্ছে করলে অনায়াসে সোরাবিয়া আর তার দলবলকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাতে পারত। তা সে দেখায়নি শুধু তার সঙ্গীর জন্যে। সঙ্গীটির প্রথম দিকেই পালাতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে একটি পা মচকে যায়। তাকে নিয়ে পালানো যায় না! তাকে ফেলে যাওয়াও অসম্ভব হয়েছে দ্বিতীয় জনের। সে তাই স্বেচ্ছাতেই ধরা দিয়েছে সঙ্গীর আপত্তি সত্ত্বেও।
পা-ভাঙা সঙ্গীটি যে কাপিন সানসেদো আর তাঁরই জন্যে নিজের মুক্তির সুযোগ যিনি উপেক্ষা করেছেন তিনি যে ঘনরাম দাস তা বোধহয় বলার প্রয়োজন নেই। ত্রিয়ানার বেদেদের দিয়ে কাজ হাসিলের ফন্দি তাঁদের পক্ষে সর্বনাশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক সঙ্গে এই দু-জনকে গারদে ভরতে পারার সৌভাগ্য সোরাবিয়া বোধহয় কল্পনাও করতে পারেনি। খুশিতে ডগমগ হয়ে কয়েদখানায় দু-জনের যথোচিত সমাদরের জন্যে মেদেলিন-এর অ্যালগুয়াসিল অর্থাৎ নগর কোটালকে সে একদিন ভোজ দিয়েই আপ্যায়িত করেছে।
নগর কোটাল অকৃতজ্ঞ নয়। ঘনরাম আর কাপিন সানসেদোকে এমন এক গারদে পাঠাবার ব্যবস্থা হয়েছে যা কবরখানারই শামিল। যারা সেখানে একবার গিয়ে ঢোকে তারা আর কোনওদিন বার হয় না। বাইরের পৃথিবী থেকে তাদের নামই মুছে যায়।
তাদের নাম বাইরের জগৎ ভুলে গেলেও বাইরের খবর তাদের কাছে পৌঁছোয়। সে রকম আগ্রহ থাকলে যমদূতের মতো রক্ষীদের দিয়েই সে খবর সংগ্রহ অসম্ভব হয় না।
শুধু আগ্রহ নয়, তার সঙ্গে অবশ্য একটু উৎকোচও দরকার। উৎকোচ দেবার মতো কিছু ঘনরাম বা সোরাবিয়ার কাছে থাকবার কথা নয়। কিন্তু ঘনরাম কী কৌশলে কে জানে বন্দি হওয়ার পরও কিছু পয়সাকড়ি লুকিয়ে সঙ্গে রাখতে পেরেছিলেন। তাঁদের বেদের পোশাকের দরুন তল্লাশিও বোধহয় তেমন ভাল করে কেউ করেনি। তা ছাড়া একরকম জীবন্ত কবরই যাদের দেওয়া হচ্ছে, তাদের সঙ্গে কী রইল না রইল, তা নিয়ে মাথাব্যথা আর কীসের?
