ফন্দিটা অবশ্য ভালই, কিন্তু তার দরুন নিয়তির হাতটা ঠিক কল্যাণের বোধহয় বলা চলে না।
কারণ মেদেলিন শহরে এই ফন্দি খাটাতে গিয়েই ঘনরাম সানসেদোর সঙ্গে ধরা পড়েন।
ধরা পড়েন আবার যার-তার নয়, একেবারে মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এরই হাতে।
এইখানেই বুঝি নিয়তির কারসাজি। নইলে মার্কুইস হঠাৎ মেদেলিন শহরে ঠিক ওই সময়টিতেই হাজির থাকে কী করে?
নিয়তি মানতে হলে বলতে হয় যে তার হাতের চাল অনেক আগেই শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে কর্টেজ যেদিন টোলেডোের মহাফেজখানায় যেতে যেতে মার্কুইসকে দেখে একটু কৌতূহলী হয়ে তার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন সেইদিন থেকেই।
পরিচয় শুনেও তাঁর মনের ধোঁকা পুরোপুরি যায়নি। ঠিক চিনতে না পারলেও মানুষটা সম্বন্ধে মনে কোথায় একটা যেন খোঁচা থেকে গেছে। কী যেন তার সম্বন্ধে জানলেও স্মরণ করতে পারছেন না বলে মনে হয়েছে।
মনের এ সংশয় দূর করা কিছু শক্ত নয়। মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর বিশদ বৃত্তান্ত সরকারি দফতরে গিয়ে জানতে চাইলেই হয়। বংশানুক্রমে যাঁরা অভিজাত আর অসামান্য কোনও কীর্তির জন্যে সম্রাট যাঁদের আভিজাত্যে প্রতিষ্ঠিত করেন তাঁদের সকলের বিস্তারিত পরিচয় ও বিবরণ লিপিবদ্ধ করে রাখার বিশেষ দফতর আছে।
মার্কুইস তো আর যেমন তেমন পদবি নয়। এ পদবি যাঁরা পান তাঁরা হয় খানদানিদের মধ্যে বংশপরিচয়ে নৈকষ্যকুলীন, নয়তো অসামান্য কীর্তিধর।
গঞ্জালেস দে সোলিস বলে কোনও বনেদি বংশের কথা কর্টেজ মনে করতে পারেননি। তবে সেটা এমন কিছু বড় কথা নয়। তিনি নিজে এমন কিছু খানদানি নন। অর্ধেক জীবন বিদেশে কাটিয়ে স্পেনের সব বড় ঘরোয়ানার নাম জানবার সুযোগই বা কতটুকু পেয়েছেন! সুতরাং মার্কুইস-এর কোনও বনেদি বড় ঘরোয়ানা হওয়া অসম্ভব নয়। আর তা যদি না হয় তা হলে নিশ্চয়ই স্পেনের রাজদরবারকে মুগ্ধ ও বাধিত করবার মতো কিছু তিনি করেছেন।
মার্কুইস-এর সঙ্গে দেখা হবার পর দিনই কর্টেজ আসল ব্যাপারটা কী জানবার কৌতূহলে উপযুক্ত দফতরে যাবার জন্যে রওনা হয়েছিলেন, সেখানে পৌঁছে মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর বিবরণটুকু জানতে পারলেই সমস্ত রহস্য কর্টেজ-এর কাছে পরিষ্কার হয়ে যেত।
এ কাহিনীর বেশ কিছু জটও তা হলে ছেড়ে যেতে পারত এখান থেকেই।
কিন্তু তা হবার নয়। ভাগ্য এইখানেই বাদ সেধেছে।
দফতরে যাবার পথে কর্টেজ হঠাৎ বাধা পেয়েছেন। রাজদরবারে এক দূত তাঁকে। ছুটে এসে ধরে জানিয়েছে যে, সম্রাটের টোলেডো ছেড়ে যাবার বিশেষ তাড়া থাকায় সেইদিনই কর্টেজকে রাজদর্শনের অনুমতি দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন।
কর্টেজ-এর দফতরখানায় যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। ব্যস্ত হয়ে বাসায় ফিরে রাজ-সাক্ষাতের জন্যে তাঁকে যথোচিত পোশাক-পরিচ্ছদ আর কাগজপত্র নিয়ে তৈরি হতে হয়েছে।
সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎটা কর্টেজ-এর পক্ষে মোটেই প্রীতিকর হয়নি। মেক্সিকোর মতো রাজ্য আবিষ্কার ও জয় করে কুবেরের ভাণ্ডার যিনি সম্রাটের হাতে তুলে দিয়েছেন তাঁর যথোচিত মর্যাদা দিতে স্পেনের রাজদরবার কার্পণ্য করেছে। আশাভঙ্গের ক্ষোভে দুঃখে কটেজ-এর মন থেকে অন্য সমস্ত চিন্তা দূর হয়ে গেছে তখন।
মাকুস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর সঙ্গে টোলেডোর দরবারে কি রাস্তাঘাটে এরপর এক-আধবার দেখা হলে কর্টেজের কৌতূহলটা আবার হয়তো মাথা চাড়া দিয়ে দিত। কিন্তু সেই প্রথম সাক্ষাতের দিনের পর টোলেডোতে মার্কুইসকে কর্টেজ কেন, কেউই
আর দেখেনি।
দেখবে কোথা থেকে? কর্টেজ-এর সঙ্গে দেখা হবার পর সে রাতটা পর্যন্ত মার্কুইস টোলেডোতে কাটায়নি। সেই সন্ধ্যাতেই পাততাড়ি গুটিয়ে টোলেডোের টাগুস নদীর সান মার্টিন পোল পেরিয়ে উধাও হয়ে গেছে।
এ রকম হন্তদন্ত হয়ে টোলেডো ছাড়ার কারণ কি কটেজ-এর সঙ্গে ওই আকস্মিক সাক্ষাৎ?
তাই বলেই তো মনে হয়। কর্টেজ না পারলেও এক পলকের দেখাতেই কর্টেজকে চিনতে মার্কুইস-এর ভুল হয়নি। চিনতে পেরে প্রতিক্রিয়া যা হয়েছে তা একটু অদ্ভুত। লক্ষ করবার কেউ থাকলে সেই মুহূর্তে মাকুস-এর ছাই মেড়ে দেওয়া মুখ দেখে একটু অবাকই হত।
কর্টেজকে এতখানি ভয় করবার কী আছে মার্কুইস-এর? যাই থাক, সে রহস্যের মীমাংসা এখন হবার নয়।
আপাতত কর্টেজ-এর নজর এড়িয়ে পালিয়ে মার্কুইস ঘনরাম আর সানসেদোরই। জীবনের শনি হয়ে উঠেছে।
মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস অর্থাৎ সোরাবিয়া টোলেডো থেকে সেভিল-এ ফিরে যায়নি। সেখানে ফিরে যাবার কোনও আকর্ষণও তার নেই। সেভিল-এর বাসা থেকে দলিত ফণিনীর মতো প্রতিহিংসার জন্যে উন্মাদিনী স্ত্রীকে কোনও রকমে ফাঁকি দিয়ে সে রাত্রে যে পালাতে পেরেছে এই তার সৌভাগ্য। আনা সেখানে এখনও থাক বা না থাক, সে বাড়িতে ফিরতে সে এখন আর প্রস্তুত নয়।
একদিকে কর্টেজ-এর ত্রিসীমানা ছাড়িয়ে আর একদিকে স্ত্রী আনার নাগালের বাইরে নিশ্চিন্তে কিছুদিন কাটাবার পক্ষে মেদেলিন শহরের সুবিধার কথাই সারাবিয়ার প্রথমে মনে হয়েছে। মেদেলিন শহরে কাপিন সানসেদোর ভিটেমাটি স্পেন সরকার রাজদ্রোহের দায়ে বাজেয়াপ্ত করেছে। সে জন্যে আর হুলিয়ার ভয়ে সানসেদো সে শহরের ধার অন্তত মাড়াবে না। আনার পক্ষেও মেদেলিন শহরে যাওয়া তাই প্রায় অসম্ভব। আনা এখন সাহায্য আর পরামর্শের জন্যে তার তিয়ে সানসেদোর সঙ্গে দেখা করবার জন্যেই যে ব্যাকুল তা সেভিল-এর ক্যাথিড্রালে তার সেদিনকার ব্যাকুল ছোটাছুটি থেকেই বোঝা গেছে। সানসেদোর যেখানে যাবার সম্ভাবনা নেই সেখানে আনা সাধ করে বেড়াতে যাবে না নিশ্চয়। তার নতুন আস্তানা হিসেবে মেদেলিন শহরের সুবিধা তাই অনেক। এ শহর আস্তানা হিসেবে বাছবার সময় শুধু এই কথাটাই সোরাবিয়ার জানা ছিল না যে মেদেলিন কর্টেজ-এর জন্মস্থান।
