না, আশ্বাস দিয়ে বলেছেন ঘনরাম, আমাদের মতো অভাগাদের নিশ্চিন্তে গা-ঢাকা দিয়ে থাকবার জায়গা এ শহরে আছে। সেখানে প্রায় সবাই দাগি, সুতরাং ঝোড়ো কাকের পালে নেহাত হাঁস কি কবুতর না হলে কারও নজর পড়ে না।
কোথায় সে জায়গা? সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছেন সানসেদো।
এই সেভিল শহরেই নদীর ওপারে ত্রিয়ানায়। জানিয়েছেন ঘনরাম, কুমোরদের কাজ আর গান-বাজনার জন্যে ত্রিয়ানার সারা স্পেনে যত সুনাম তত দুর্নাম চোর আর বেদেদের চিরকেলে আস্তানা বলে। চলুন রাতারাতি নদী পার হয়ে যেতে পারলে কিছু দিনের মতো অন্তত নিশ্চিন্ত।
নদী পার হয়ে সেই ত্রিয়ানায় গিয়েই দুজনে সে রাত্রে উঠেছেন। বেশি দিন সেখানে কাটানো কিন্তু সম্ভব হয়নি। ত্রিয়ানায় তাঁদের লুকিয়ে থাকার অসুবিধে অবশ্য কিছু ছিল না। সেই ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ত্রিয়ানা সত্যিই বেপরোয়া বাউণ্ডুলেদের স্বর্গ ছিল। স্পেনের বেদেদের সেটা ছিল বড় গোছের একটা ঘাঁটি। যত রাজ্যের চোর-ছ্যাঁচড়দেরও সেটা ছিল মনের মতো আস্তানা। তারাও বেদেদের মতোই ভাগ্যের স্রোতে ভাসা শ্যাওলা। আজকের খোরাক জুটলে কালকের ভাবনা কেউ ভাবে না। তারা যার যেমন মর্জি আর পুঁজি সেই মাফিক সেখানে ফুর্তি নাচ-গান খানা-পিনাতেই মেতে থাকত। সবাই সেখানে ছুঁচ বলে চালুনির পেছনে লাগবার গরজ কারও ছিল না। ইচ্ছে করলে কাপিন সানসেদো আর ঘনরাম যতদিন খুশি। সেখানে অজ্ঞাতবাসে থাকতে পারতেন।
কিন্তু শুধু নিবাপদ থাকাই তাঁদের লক্ষ্য নয়। পিজারোর পরিণামের সঙ্গে ঘনরাম নিজেকে জড়িয়েছেন। ত্রিয়ানায় নিশ্চিত হয়ে বসে থাকা তাঁর চলে না। সানসেদোর ব্ৰত আলাদা। নিজের অবিশ্বাস্য ভাগ্যবিপর্যয়ের মূলে কী রহস্য আছে তা তাঁর ভেদ
করলেই নয়। সেই জন্যেই ত্রিয়ানায় নিরাপদ আশ্রয় না ছেড়ে তাঁর উপায় নেই!
পরস্পরের সমস্ত বিররণ শুনে মূল রহস্য সম্পূর্ণ ভেদ না করতে পারলেও নিজেদের সংকল্পে তাঁরা আরও কঠিন হয়েছেন। ত্রিয়ানায় থাকতে থাকতেই টোলেডোর সম্রাটের দরবারে পিজারোর সসম্মানে নিমন্ত্রণের খবর তাঁদের কাছে পৌঁছেছে। ঘনরাম ও সানসেদো দুজনেই এবার যে যার নিজের পথে যাবেন স্থির করেছেন। আলাদা হবার আগে শুধু একটি দুরূহ কাজ তাঁদের সম্পন্ন করতে হবে। সে কাজ হল সানসেদোর অত্যন্ত মূল্যবান একটি সম্পদ তাঁর মেদেলিন শহরের স্পেন সরকারের বাজেয়াপ্ত বাড়ি থেকে উদ্ধার করে আনা।
এ মূল্যবান সম্পদ সোনা-দানা হিরে-মুক্তো কিছু নয়। একটি চামড়ার থলের মধ্যে রাখা কয়েকটা কাগজপত্র মাত্র। সেগুলির মধ্যে একটি কাগজ আবার কাপিন সানসেদোর কাছে সবচেয়ে দামি।
ত্রিয়ানা ছেড়ে যে যার নিজের পথে যাবার সংকল্প করবার পরই সানসেদো অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে এই কাগজটির কথা ঘনরামকে বলেন। নিজের একটা অঙ্গের বিনিময়েও এ কাগজটি উদ্ধার করতে তিনি প্রস্তুত। সানসেদোর মুখে এ কথা শোনবার পর ঘনরাম বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করেন, কাগজটা কী বলুন তো? কোনও দামি সম্পত্তির দলিল!
না, দলিল নয়, একটা চিঠি, বলেন সানসেদো।
একটা চিঠি! ঘনরাম অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, একটা চিঠির এত দাম
আপনার কাছে? কার লেখা সে চিঠি? কাকে লেখা? আপনাকে?
না, আমাকে নয়। বিষণ্ণ স্বরে বলেন সানসেদো, সে চিঠি কাকে লেখা তা জানি। যে ভাষায় লেখা তা আমার অজানা। সুতরাং সে চিঠি পড়েও কিছু বোঝবার ক্ষমতা আমার নেই। সে চিঠির দাম আমার কাছে এত বেশি যিনি লিখেছেন শুধু তাঁর জন্যে।
কে তিনি?
ক্রীতদাস হিসেবে যাঁকে কিনে মুক্তি দিতে পেরে আমি ধন্য হয়েছি, যাঁর কাছে জ্যোতিষ গণনার যৎসামান্য পাঠ নেবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, তিনি সুদূর উদয় সাগরের দেশের সেই অসামান্য পুরুষ।
একটু থেমে সানসেদো আবার বলেন, তাঁর নিজের গণনা যদি সত্য হয় তা হলে তাঁর এ লিপির বাহক যথাসময়েই পাওয়া যাবে। কিন্তু তার আগে সেটি আমার হাতে থাকা তো দরকার। রাজরোষের খবর পাওয়ার পর গোপনে মেদেলিন শহরের বাড়ি ছেড়ে আসবার ব্যস্ততায় এই কাগজটি আমি ভুলে ফেলে আসি। নিজের সে অপরাধ আমি কখনও ক্ষমা করতে পারব না।
সানসেদোর কথা শেষ হবার পর ঘনরাম কিছুক্ষণ যেন উদাসীনের মতো নীরব থেকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করেন, আপনার মেদেলিন শহরের বাড়ি তো সেখানকার কোতোয়ালির জিম্মায়? অন্য কেউ সে বাড়ির দখল নিয়েছে কি না জানেন?
তা ঠিক জানি না। সানসেদো বলেন, তবে না নেবারই কথা। আমরা তা হলে মেদেলিন শহরেই প্রথমে যাচ্ছি। দৃঢ়স্বরে বলেন ঘনরাম, আপনার পূজনীয় গুরুর গচ্ছিত করা লিপি উদ্ধারই এখন আমাদের প্রথম কাজ।
কিন্তু–?
সানসেদোর উদ্বিগ্ন প্রশ্নটা শেষ করতে না দিয়ে ঘনরাম আবার বলেন, কেমন করে তা সম্ভব তা-ই ভাবছেন? চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখুন, ফিকিরফন্দি সামনে। সাজানো রয়েছে। এই জন্যেই মনে হচ্ছে আমাদের ত্রিয়ানায় আসার মধ্যে নিয়তির হাতই ছিল।
সেভিল শহরে কিছুকাল গা ঢাকা দিয়ে থাকবার জন্যে সানসেদোকে নিয়ে গুয়াদালকুইভির নদীর ওপারে চোর-ছ্যাঁচড় আর বেদেদের আস্তানা ত্রিয়ানায় ওঠার মধ্যে নিয়তির হাত আছে বলে মনে করেছিলেন ঘনরাম।
নিয়তির হাত ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারণ ত্রিয়ানায় গিয়ে ক-দিন না কাটালে সানসেদোর গুরুর গচ্ছিত করা লিপি উদ্ধারের অমন ফন্দি ঘনরামের মাথায় বোধহয় আসত না।
