এবার বাপি দত্ত আসল কথাটা তুলল, ভাগ্যিস ড. ক্যালিওর ভূত আপনাকে ডেকেছিল। তার কাছেই তো সব জানতে পারেন?
তা ভূতই বলতে পারো, তবে আসলে জিনিসটা একটা টেপ রেকর্ডার। ঘনাদা মুখ টিপে হাসলেন।
টেপ রেকর্ডার! আমরাও অবাক।
হ্যাঁ, ড. ক্যালিও জন্তুজানোয়ার থেকে পাখি-টাখির আওয়াজ ও তিব্বতিদের কথাবার্তা তুলে নেবার জন্যে ওটি সঙ্গে রাখতেন। শেষ পর্যন্ত মূলারের মতলব বুঝতে পেরে ওই যন্ত্রটি কাজে লাগাবার অদ্ভুত ফন্দি বার করেন। নিজের সব কথা ওই যন্ত্রে তুলে নিয়ে ওইটিই লুকিয়ে এক জায়গায় রেখে আসতে পেরেছিলেন মারা যাবার আগে, যন্ত্রটির এমন প্যাঁচ করেছিলেন যে ফিতেটা নিজে থেকেই একবার গুটিয়ে আর একবার খুলে যায় কথাগুলোও ঘুরে ঘুরে শোনা যায়। আওয়াজ ধরে আমি যন্ত্রটা খুঁজে বার করি একটা পাথরের তলায়। অন্য কটা ফিতে থেকে বাকি কথাগুলোও কিছুটা জানতে পারি। কিন্তু যন্ত্রটা বরফের গুঁড়ো দুকে ঝড়ের ধাক্কায় পাথরে ঠোকাঠুকি খেয়ে প্রায় তখন বিকল হয়ে এসেছে। আমি কিছুটা চালাতেই একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।
ফিতেটা খুলে সঙ্গে আনলে পারতেন! বুনো হাঁসের পেছনে ধাওয়া করার দরকার হত না। শিবুর কেমন বাঁকা মন্তব্য।
ঘনাদা কিছু বলবার আগে বাপি দত্তই শিবুর ওপর মারমুখো হয়ে উঠল, আনবার হলে ঘনাদা আনতেন না, আহাম্মক!
বলা বাহুল্য বাপি দত্তই সেই থেকে ঘনাদার সবচেয়ে বড় ভক্ত।
হাঁস খেতে খেতে আমাদের অরুচি ধরে গেল।
আগ্রা যখন টলমল (গল্পগ্রন্থ)
আগ্রা যখন টলমল
না, তস্য তস্য!
বললেন শ্রীঘনশ্যাম দাস ওরফে ঘনাদা নামে কোনও কোনও মহলে যিনি পরিচিত। বিস্ময়ে বিহ্বলতায় কারও মুখে তখন আর কোনও কথা নেই।
ঘনশ্যাম দাস নিজেই সমবেত সকলের প্রতি কৃপা করে তাঁর সংক্ষিপ্ত উক্তিটি একটু বিস্তারিত করলেন:
মানে, আমার ঊর্ধ্বতন ষোড়শতম পূর্বপুরুষ মীর-ঈ-ইমারৎ সাওয়ানি নিগার—
ঘনশ্যাম দাসকে বাধা পেয়ে থামতে হল।
মেদভারে হস্তীর মতো যিনি বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবু বিস্ফারিত চোখে বলে উঠলেন, আপনার পূর্বপুরুষ বলছেন, অথচ ওই মীর না পীর কী বললেন!
ঘনশ্যাম দাস তাঁর সেই নিজস্ব ট্রেডমার্কের ছাপমারা করুণার হাসি হাসলেন।
মীর পীর নয়, মীর-ঈ-ইমারৎ সাওয়ানি নিগার বচনরাম দাস। মীর-ঈ-ইমার হল যাকে বলে বিল্ডিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট আর সাওয়ানি নিগার মানে আমির-ওমরাহ রাজপুরুষদের না জানিয়ে গোপনে সবকিছু জরুরি খবর সংগ্রহ করে খোদ শাহানশাহ-এর কাছে লিখে ্পাঠানো যার কাজ।
আপনার পূর্বপুরুষ বচনরাম দাস তখন আগ্রায় থেকে ওই কাজ করতেন!
উদরদেশ যাঁর কুম্ভের মতো স্ফীত সেই রামশরণবাবু বিমূঢ়-বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
কিন্তু একটু বেসুরো বাজল, মস্তক যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ সেই শিবপদবাবুর কণ্ঠ।
অবিশ্বাস ও বিদ্রূপের রেশটুকু গোপন না করে তিনি বললেন, সবই বুঝলাম, কিন্তু আপনার পূর্বপুরুষ ওই মীর-ঈ-ইমারৎ সাওয়ানি নিগার বচনলাল না বচনরাম
তখন আগ্রায় না থাকলে ভারতবর্ষের ইতিহাসই অন্যরকম লেখা হত বলছেন?
তাই তো বলছি। ঘনশ্যাম দাস অবোধকে যেন বোঝাতে বসলেন—১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে আগস্ট তারিখটার কথা একটু স্মরণ করুন। সারা দুনিয়ার চোখ-টাটানো শহর মোগল সাম্রাজ্যের অতুলনীয় রাজধানী আগ্রায় সেদিন যেমন সকাল হয়েছিল তেমনই নির্বিঘ্নে সন্ধ্যা যদি নামত, যদি হঠাৎ সেই তারিখটি আগ্রায়, না শুধু আগ্রার কেন, সমস্ত ভারতবর্ষের আকাশে আগুনের অক্ষরে না জ্বলে উঠত, তাহলে আজ যে ইতিহাসের ধারা আমরা দেখছি তা সম্পূর্ণ ভিন্নপথে কি প্রবাহিত হত না!
১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে আগস্ট।
তারিখটার তাৎপর্য স্মরণ করতে সবাই যতক্ষণ চিন্তাকুল, ততক্ষণে এ সমাবেশের একটু পরিচয় ও এ কাহিনীর উদ্ভবের একটু উপক্রমণিকা বিবৃত করা যেতে পারে।
এক এবং অদ্বিতীয় শ্রীঘনশ্যাম দাসকে কেন্দ্র করে এই সমাবেশটি সচরাচর কোথায় জমে থাকে এবং প্রায় নিত্য-নৈমিত্তিকভাবে কারা সেখানে উপস্থিত থাকেন, কেউ কেউ হয়তো জানেন।
স্থান এই কলকাতা শহরেরই প্রান্তবর্তী একটি নাতিনগণ্য জলাশয়, করুণ আত্ম-ছলনায় যাকে হ্রদ বলে আমরা অভিহিত করি কখনও কখনও।
জীবনে যাদের কোনও উদ্দেশ্য নেই, বা কোনও এক উদ্দেশ্যেরই একান্ত একাগ্র অনুসরণে যারা পরিশ্রান্ত, এই উভয় শ্রেণীর নানা বয়স্ক স্ত্রী-পুরুষ নাগরিক প্রতি সন্ধ্যায় এই জলাশয়ের তীরে নিজ নিজ রুচি ও প্রবৃত্তি অনুসারে স্বাস্থ্য অর্থ কাম মোক্ষ এই চতুর্বর্গের সাধনায় একাকী কিংবা সদলে ভ্রমণ করেন বা কোথাও উপবিষ্ট হন।
এ জলাশয়ের দক্ষিণ তীরে একটি নাতি-বৃহৎ পর্কটী বৃক্ষকে কেন্দ্র করে কয়েকটি আসন বৃত্তাকারে পাতা। আবহাওয়া অনুকূল হলে সেই আসনগুলিতে সাধারণত পাঁচটি প্রবীণ নাগরিককে নিয়মিতভাবে অপরাহুকালে সমবেত হতে দেখা যায়।
তাঁদের একজনের শিরোশোভা কাশের মতো শুভ্র, দ্বিতীয়ের মস্তক মর্মরের মতো মসৃণ, তৃতীয়ের উদরদেশ কুম্ভের মতো স্ফীত, চতুর্থ মেদভারে হস্তীর মতো বিপুল, এবং পঞ্চম জন উষ্ট্রের মতো শীর্ণ ও সামঞ্জস্যহীন।
এই পঞ্চরত্নের সভায় স্বাস্থ্য থেকে সাম্রাজ্যবাদ ও বাজার দর থেকে বেদান্ত-দর্শন পর্যন্ত যাবতীয় তত্ত্ব আলোচিত হয়ে থাকে।
আলোচনার প্রাণ অবশ্য শ্রীঘনশ্যাম দাস, প্রাণান্তও তিনি। কারণ সকল বিষয়ে শেষ কথা তিনিই বলে থাকেন এবং তাঁর কথা যখন শেষ হয় তখন আর কারও কিছু বলবার থাকে না।
