এ সব বাড়ির সুবিধা এই যে, মাঝখানের উদ্যান-প্রাঙ্গণে কোনওরকমে গিয়ে পৌঁছোতে পারলে লুকিয়ে থাকবার ব্যবস্থা একটা করা যায়। বেশির ভাগ উদ্যান প্রাঙ্গণেই একটি করে ফোয়ারা থাকে মাঝখানে। তারই সঙ্গে চারিদিকে নানা ফুলের গাছ ও লতার কুঞ্জ। সে বাগিচায় তেমন কোনও পাহারা থাকে না বললেই হয়।
বয়সে প্রৌঢ় হলেও সানসেদো অথর্ব একেবারেই হননি। অন্ধকারের মধ্যে বাইরের দেয়াল ডিঙিয়ে ভেতরে ঢোকবার সুবিধে কোথাও আছে কি না তিনি এবার খোঁজবার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু বেশিক্ষণ তার সুযোগ মেলেনি। হঠাৎ রাস্তায় ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনে তাঁকে চমকে উঠতে হয়েছে। নিঃশব্দে রাস্তার এক অন্ধকার কোণে তিনি তারপরে সরে দাঁড়িয়েছেন! ঘোড়ার পায়ের শব্দ তখন থেমে গেছে। ঘোড়াটা রুখে তা থেকে সাবধানে যে নেমেছে আবছা অন্ধকারেও তাকে চিনতে সানসেদোর দেরি হয়নি।
লোকটি যে সোরাবিয়া তা আমরাও ইতিমধ্যে জেনেছি। নিজের সত্য ভঙ্গ করে ঘনরামকে আনার বিছানায় বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে সে ইতরভাবে অপমান করবার জন্যে স্ত্রী আনাকেই খুঁজতে গেছল। তাকে না পেয়ে ফিরে চোরের মতো সন্তর্পণে নিজের বাড়িতে ঢুকেছে।
সানসেদো এসব ব্যাপারের কিছু জানেন না। সোরার্বিয়ার নিজের বাড়িতে ঢোকার অদ্ভুত ধরনে আরও সন্দিগ্ধ ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে তিনি অধীরভাবে বাইরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছেন। বিপদ যতই থাক, আনার জন্যেই বাড়ির ভেতরে খোঁজ করতে পারেন কি না এই নিয়ে তাঁর মনে তখন প্রবল দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছে।
ধৈর্য ধরতে না পেরে বাড়ির ভেতরেই ঢুকতে যাবেন এমন সময় ঘনরাম দাস দ্রুতপদে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
মানুষটা যে সোরাবিয়া নয়, শরীরের গড়নেই তা বুঝে সানসেদো আরও বিস্মিত চমকিত হয়ে তার পথ আগলে দাঁড়িয়েছেন। তারপর রুক্ষ স্বরে বলেছেন, দাঁড়াও। কে তুমি?
এই উত্তেজিত ব্যস্ততার মধ্যে নিরস্ত্র একটা ভিখিরি গোছের পোশাকের লোকের কথা ঘনরাম অনায়াসে অগ্রাহ্য করতেও পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। অগ্রাহ্য
করবার কারণ এই যে, আবছা অন্ধকারে ভিখিরি গোছের মানুষটার চেহারা দেখা। না গেলেও তার গলার স্বরটা ঘনরামের মনে কোথায় যেন একটা ক্ষীণ সাড়া তুলেছে।
বিনা প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে পড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মানুষটাকে অন্ধকারের মধ্যে চেনার চেষ্টা করে মুখে একটু কৌতুকের স্বরে ঘনরাম বলেছেন, এ বাড়ি থেকে বার হবার পরও পরিচয় জিজ্ঞাসা করবার দরকার হয়? সেভিল শহরে কে না জানে যে এ বাড়ি মহামান্য মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর।
এ বাড়ি তার হতে পারে কিন্তু তুমি সে মার্কুইস নও! সানসেদো কঠিন স্বরে বলেছেন এবার, বলো তুমি কে?
আমি! ঘনরাম মানুষটিকে চিনতে পেরে এবার হেসে উঠেছেন হঠাৎ, মার্কুইস হলে আমায় তো গোলাম হতে হয়। মনে করুন আমি এক ফেরারি গোলাম।
বহুকাল আগে কাপিন সানসেদো বলে এক নাখোদার জাহাজ থেকে এই সেভিল-এর বন্দরেই পালিয়ে ছিলাম।
কয়েক মুহূর্ত বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে থেকে সানসেদো উচ্ছ্বসিতভাবে বলে উঠেছেন দাস! তুমি? এ যে আমার কল্পনাতীত!
আপনাকে এ বেশে এখানে দেখাও আমার পক্ষে তাই! সানসেদোকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে যেতে ঘনরাম বলেছেন, কিন্তু এখানে আর থাকা আমাদের দুজনের কারও পক্ষেই নিরাপদ নয়! পরস্পরের অনেক কিছুই আমাদের জানবার আছে। নির্ভয়ে কিছুক্ষণ কাটাতে পারি এমন আস্তানায় তাই এখন যাওয়া দরকার।
কিন্তু সে রকম জায়গা সেভিল-এ পাবে কোথায়? বিষণ্ণ স্বরে বলেছেন সানসেদো,ফেরারি গোলাম হয়ে কোন সাহসে কীভাবে এ শহরে তুমি এসেছ জানি
না, কিন্তু এ শহরে তোমার চেয়ে আমার বিপদ এখন কম নয়। সোরাবিয়া আমার বিরুদ্ধে এখানে হুলিয়া বার করিয়েছে তা বোধহয় জানেন না!
না জানলেও আপনার চেহারা পোশাক দেখে সে রকম একটা কিছু অনুমান করেছি। তিক্ত স্বরে বলেছেন ঘনরাম, সমস্ত ইতিহাস তাই শুনতে চাই।
সে ইতিহাস তা হলে এই রাত্রে পথে পথে ঘুরেই তোমাকে শোনাতে হবে। কিন্তু এখন আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। রাস্তার মাঝেই থেমে পড়ে বলেছেন সানসেদো, আমার অভিশপ্ত জাহাজের আনাকে নিশ্চয় তুমি ভোলোনি। সেই আনার খবর না নিয়ে এখান থেকে আমি যেতে পারব না। এ বাড়িতে আসার দুঃসাহস কেন তোমার হয়েছিল জানি না, কিন্তু বাড়িটা যখন তোমার চেনা তখন আনা যে এখন মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস অর্থাৎ সোরাবিয়ার স্ত্রী তা-ও তোমার জানা উচিত। এই আনার খোঁজ নেবার জন্যেই আমি এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার সম্বন্ধে দুর্ভাবনার কারণ সত্যিই ঘটেছে!
সে দুর্ভাবনা এখন আপনি ঝেড়ে ফেলতে পারেন। ঈষৎ কৌতুকের স্বরে জোর দিয়েই বলেছেন ঘনরাম, আপনার ভাগ্নি আনা সম্পূর্ণ নিরাপদ এটুকু আশ্বাস আপনাকে দিতে পারি। দুর্ভাবনা যদি করতে হয় তা হলে মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর জন্যেই বোধহয় করা উচিত।
তার মানে? সানসেদো বিমূঢ় হয়েই জিজ্ঞাসা করেছেন।
মানেটা আমার বিবরণ শুনলেই বুঝবেন। একটু হেসে বলেছেন ঘনরাম, আপনার ইতিহাস শোনবার ও আমারটা শোনাবার সুবিধামতো আস্তানায় এখন শুধু যাওয়া দরকার।
কিন্তু সে আস্তানা সেভিল শহরে তো পাওয়া যাবে না। হতাশভাবে বলেছেন সানসেদো, রাত্তিরটুকু পথে পথে যদিবা কাটাতে পারি, সকাল হলেই সমস্ত শহর তো আমাদের শত্ৰুপুরী।
