সানসেদো তাঁর মনের কথা যেন কেমন করে টের পেয়ে বলেন, এখনও আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে আপনি পারছেন না, জানি। আশা করি আমার কৈফিয়তটা শুনলে পারবেন। আপনার জাহাজ নিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে সান লকার-এর চড়া পার করে দিয়ে আপনার এই উপকার করছি যে কাউন্সিল অফ ইন্ডিজ-এর কর্তারা এসে আপনার জাহাজ আর তদারক করতে পারবে না। ওরা যখন আসবে তখন আপনি ওদের নাগালের বাইরে মাঝদরিয়ায়।
কিন্তু তাতে আমার লাভ? হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করেন পিজারো।
লাভ ষোলো আনা। আপনার জাহাজে কতজন লশকর আপনি নিয়ে গেছেন ওদের গুণে দেখার কোনও উপায় নেই। ওরা যখন শুধু হিসেব নিতে আসার খবরই জানিয়েছিল, আপনাকে বন্দরে হাজির থাকার কোনও হুকুম পাঠায়নি তখন আপনার এভাবে চলে আসার কোনও দোষ ধরতে পারবে না। আপনার প্রতিনিধি হিসেবে আপনার ভাই হার্নারেমন্ডো যা বলবে তা মেনে নেওয়া ছাড়া ওদের উপায় নেই। লশকরদের গুনতিতে যা কম পড়বে সব আপনার জাহাজেই আগে চলে গেছে। জানাবে হার্নারেমন্ডো। সে হিসেব নিয়ে গোলমাল ওরা নিজেদের গলদ ঢাকতেই করবে বলে মনে হয় না। যে বিপদে আপনি পড়েছিলেন তা থেকে বাঁচবার এর চেয়ে ভাল। উপায় অন্তত আর কিছু নেই। এখন স্পেন ছেড়ে ক্যানারি দ্বীপাবলির গোমেরায় গিয়ে আপনি অপেক্ষা করুন। হার্নারেমন্ডো আর দুটি জাহাজ নিয়ে সেখানেই আপনার সঙ্গে মিলবে।
কিন্তু এসব কী করে সম্ভব? হতাশভাবে বলেন পিজারো, হার্নারেমন্ডোর এ ব্যবস্থার কথা জানা তো দরকার। আজ রাত্রে শেষ দেখা যখন আমাদের হয়েছে তখন এরকম ঘটনা আমাদের কল্পনার বাইরে।
কিচ্ছু ভাববেন না। জোরের সঙ্গে আশ্বাস দেন সানসেদো, কাল সকাল থেকে যা যা করতে হবে তার পুরো নির্দেশ হার্নারেমন্ডোকে আপনার নামেই পাঠিয়ে না দিয়ে আমরা আসিনি। আপনি তো লিখতে জানেন না, সুতরাং সকালে আপনার জাহাজ গায়েব হয়েছে দেখবার পর অন্যের হাতে লেখা সে নির্দেশ হার্নারেমন্ডো অমান্য করবে না।
নিরক্ষরতার খোঁচাটা হজম করে পিজারো সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেন, নিজের বুদ্ধিতে এত কাণ্ড আপনি করেছেন একা?
না। হেসে বলেন সানসেদো, একা নয়, নিজের বুদ্ধিতেও না। আমার এক সঙ্গী সহায় এই জাহাজেই আছেন।
১৩. মার্কুইস আর মার্শনেস গঞ্জালেস
মার্কুইস আর মার্শনেস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর বাড়ি থেকে ছুটে বেরিয়ে যাবার মুখে সন্ধ্যার অন্ধকারে কে যে ঘনরাম দাসের পথ আটকে ছিল তা এতক্ষণে বোধহয় বোঝা গেছে।
পথ আটকে দাঁড়িয়েছিলেন আর কেউ নয়, স্বয়ং কাপিন সানসেদো।
কাপিন সানসেদো আনার জন্যে নির্দিষ্ট জায়গায় বহুক্ষণ অপেক্ষা করার পর প্রথমে অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ আর তার পরে সত্যি উদ্বিগ্ন হয়ে তার বাড়িতেই আনার সন্ধানে এসেছিলেন।
সানসেদো প্রথম ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন আনা তাঁর সঙ্গে দেখা করাটা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছে মনে করে।
একটু ভেবে দেখবার পর আনার পক্ষে এরকম তাচ্ছিল্য বেশ অস্বাভাবিক বলেই তাঁর মনে হয়েছে।
সোরাবিয়ার স্ত্রী হিসেবে আনার মার্শনেস হওয়া একটা রহস্য নিশ্চয়। কিন্তু যেভাবেই এ আভিজাত্যের ছাপ সে পেয়ে থাকুক, তাঁর সঙ্গে ব্যবহারে কোনও পরিবর্তন তার মধ্যে দেখা যায়নি। উন্নাসিক ঔদ্ধত্যে তাঁকে তাচ্ছিল্য করলে তাঁর একটা চিঠির চিরকুট পেয়েই অমনভাবে নিজেকে বিপদে ফেলে ক্যাথিড্রালে তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্যে সে ছুটে আসত না।
আনার ভাব-গতিক দেখে তখন এই কথাই মনে হয়েছে যে, তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্যে সে নিজেও বিশেষ কোনও কারণে ব্যাকুল।
তা সত্ত্বেও যথাস্থানে যথাসময়ে আনা যদি উপস্থিত না হয়ে থাকে তা হলে তার অন্য কোনও গুরুতর কারণই সম্ভবত আছে। সেই কারণটা ভাবতে গিয়ে সানসেদো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন।
সোরাবিয়া প্রথম সাক্ষাতের ব্যবস্থার সময় ক্যাথিড্রালে কীভাবে ছদ্মবেশে আনাকে চোখে চোখে রেখেছিল তা তিনি দেখেছেন। তাঁদের এ দ্বিতীয় সাক্ষাৎ ব্যর্থ করার মূলে তারই কি কোনও শয়তানি আছে? সে শয়তানি কী হতে পারে অনুমান না করতে পারার দরুনই আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে কাপিন সানসেদো শেষ পর্যন্ত আনার বাড়িতেই তার খোঁজ নেবার জন্যে না এসে পারেননি।
এভাবে আসা যে কতখানি বিপদের তা তাঁর অজানা নয়। যে সোরাবিয়া হিংস্র ব্যাধের মতো তাঁকে সন্ধান করে ফিরছে, এখানে আসা মানে সাধ করে তার-ই খপ্পরে পড়া। তবু কাপিন সানসেদোকে নিরুপায় হয়ে এ দুঃসাহস করতে হয়েছে।
বাড়ির কাছে এসেও কীভাবে আনার খোঁজ নেওয়া যায় তাই নিয়েই হয়েছে। মুশকিল। সোজাসুজি বাড়ির দেউড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। যা সম্ভব তা হল দূর থেকে লক্ষ রেখে চাকর-দাসী কাউকে বাড়িতে ঢুকতে কি সেখান থেকে বার হতে দেখলে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ নেওয়া।
বহুক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনও চাকর-দাসীর সাড়াশব্দ কিন্তু পাননি। বাড়িটাই কেমন অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধ মনে হয়েছে। সন্দেহ হয়েছে সেখানে বুঝি কেউ নেই।
সন্দেহ নিরসনের একমাত্র উপায় বাড়ির দরজায় গিয়ে ঘা দেওয়া কিংবা গোপনে। কোনওরকমে ভেতরে গিয়ে ঢোকা।
দেউড়ির দরজায় ঘা দেওয়া যখন তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, তখন বাড়িতে গোপনে ঢোকবার উপায় খুঁজতে হয়।
সোলিস-এর এ সব বাড়ির ছক তাঁর জানা। বাড়িগুলি পুরনো আমলের মুরদের রীতিতে তৈরি। মাঝখানের একটি বিস্তৃত উদ্যান-প্রাঙ্গণকে ঘিরে সাধারণত এ সমস্ত। বাড়ির ঘরগুলি সাজানো থাকে। আনাদের বাড়িটা এ ধরনের একটু উঁচুদরের ইমারতের মতো দোতলা।
