সবচেয়ে বেশি গালাগাল দেবে বড়ভাই হার্নারেমন্ডো। সে বয়সেই বড় নয়, মেজাজও তার সবচেয়ে কড়া। বেজন্মা বলে ফ্রানসিসকো পিজারোকে সে যে গাল দেবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ও গাল দেবার অধিকার একমাত্র তারই আছে।
ভাইরা যা করে করুক, যাই ভাবুক তার লোকলশকর, পিজারোর সামনে ওই। একটি রাস্তাই খোলা। এই কুয়াশায় ঢাকা রাত্রে নিঃশব্দে জাহাজ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া।
পিজারো সংকল্প স্থির করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে হঠাৎ চমকে ওঠেন।
এ কী! তাঁর জাহাজ যে চলতে শুরু করেছে!
কিন্তু কেমন করে তা সম্ভব? বন্দরে নোঙর বাঁধা জাহাজ হঠাৎ নিজে থেকে ভেসে যেতে পারে কী করে? নোঙর কি তা হলে উপড়ে গেছে হঠাৎ? তা তো অসম্ভব। অজানা সমুদ্রে বাঁধবার জন্যে তৈরি অত্যন্ত মজবুত নোঙর। তা ছাড়া নোঙর উপড়ে দেবার মতো কোনও ঢেউ কি স্রোতের বেগই এখানে নেই।
নোঙর কি তা হলে তোলা হয়েছে? কিন্তু তাঁর হুকুম ছাড়া কেউ তো তা তুলতে পারে না।
ব্যাপারটা যে একেবারে ভৌতিক বলে মনে হচ্ছে। সবচেয়ে বিপদ হচ্ছে এই গাঢ় কুয়াশায় আপনা-থেকে-ভেসে-যাওয়া জাহাজ যেখানে-সেখানে ধাক্কা খেয়ে আর লাগিয়ে যে কোনও মুহূর্তে দারুণ ফ্যাসাদ বাধাতে পারে!
তখন গভীর রাত। সমস্ত মাঝিমাল্লাই বন্দরে বাঁধা জাহাজে কাজকর্মের দায় না থাকায় নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোচ্ছ।
পিজারো আর তাঁর পিছনে কানডিয়াই শুধু শশব্যস্ত হয়ে জাহাজের হাল ধরবার টঙের দিকে ছুটে যান।
টঙ পর্যন্ত উঠতে হয় না। তার আগেই সিঁড়িতে থমকে দাঁড়াতে হয় পিজারো আর
তার পিছনে কানডিয়াকে।
পাইলটের টঙে কে একজন তাঁদের দিকে পিস্তল লক্ষ্য করে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে পিস্তল, গলার স্বরে কিন্তু যেন হাসির আভাস।
শান্ত হয়ে আপনি একলা ওপরে ওঠে আসুন, সেনিয়র পিজারো। কোনও ভয় আপনার নেই। গোড়ায় না বুঝে একটা হ্যাঙ্গামা-ট্যাঙ্গামা পাছে করে বসেন এই জন্যে পিস্তলটা চোতে হয়েছে। সুবোধ ছেলের মতো ওপরে এসে সব শুনলেই বুঝবেন আজ আপনার কত বড় উপকার করেছি।
আমার উপকার করেছেন। আমার জাহাজ লুকিয়ে নোঙর তুলে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে? পিজারো গর্জন করে ওঠেন, আপনাকে হাতে পেলে আমি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ব—
না, কিছুই অমন করবেন না।অত্যন্ত শান্ত গলায় উত্তর আসে—বরং কী পুরস্কার দেবেন তাই ভেবে সারা হবেন।
পিজারোর এবার সন্দেহ হয় একটা দারুণ উন্মাদের হাতেই তাঁর জাহাজ পড়েছে।
কিন্তু আপনি কী করছেন তা জানেন! রাগের চেয়ে উদ্বেগই এবার পিজারোর গলায় বেশি প্রকাশ পায়—এই অন্ধকার কুয়াশায় জাহাজ যে বানচাল হয়ে যাবে এখুনি।
না, তা হবে না।—এবার উত্তরটা দৃঢ়স্বরে দেওয়া—সেভিলের তীর থেকে সমুদ্র পর্যন্ত এই গুয়াদালকুইভীর নদীর সমস্ত আটঘাট অন্ধিসন্ধি নিজের হাতের তেলোর মতো আমার জানা। মায়ের কোলে ছেলের মতো আপনার এ জাহাজকে আমি নদীর মোহনায় সান লকার-এর চড়া দেখতে দেখতে পার করে দেব।
সান স্যুকার-এর চড়া!
নামটা সবিস্ময়ে উচ্চারণ করেন পিজারো। তারপর বিমূঢ়ভাবে জিজ্ঞাসা করেন, সান লুকার-এর চড়া পার করে দেবার কথা বলছেন কেন?
বলছি, সেই মতলবেই বন্দর থেকে নিঃশব্দে নোঙর তুলে এ জাহাজের হাল ধরেছি!—লোকটি তার পিস্তলটা এবার সরিয়ে নিয়ে বলে।
পিজারো তাকে আক্রমণ করবার এ সুযোগ কিন্তু নেন না। বিস্ময়ের সঙ্গে একটু যেন সম্রমের সুরে জিজ্ঞাসা করেন, কে আপনি?
নাম শুনলে কি চিনতে পারবেন! আমার নাম কাপিন সানসেদো!
কাপিন সানসেদো! সত্যিই কথাটা পিজারোর পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হয়। কাপিন সানসেদোর সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় তাঁর কখনও হয়নি। কিন্তু হিসপানিওলা ফার্নানদিনা থেকে নতুন মহাদেশের যে কোনও উপকূলে নিপুণতম নাবিক হিসাবে যাঁদের নাম উচ্চারিত হয় কাপিন সানসেদো তাঁদেরই একজন। সানসেদো নামটা তো অপরিচিত নয়ই, সম্প্রতি টোলেডো আর সেভিলে নানা জনের আলাপ-আলোচনায় মানুষটার নিদারুণ ভাগ্য বিপর্যয়ের কাহিনীও তাঁর কানে এসেছে। সানসেদো সম্রাটের ধনরত্ন চুরি করে যে ফেরারি তাও পিজারো জানেন।
এই মানুষটা তাঁর জাহাজে কোথা থেকে এসে উদয় হল? তাঁর জাহাজ নিয়ে এভাবে গোপনে ভেসে পড়ার উদ্দেশ্যই বা কী? সানসেদো কি নিজের পালাবার সুবিধের জন্যেই এ ফন্দি করেছেন? তা যদি করে থাকেন তা হলে তা তো নেহাত আহাম্মুকি ছাড়া কিছু নয়। শুধু ওই পিস্তলের জোরে জাহাজসুদ্ধ লোককে কতক্ষণ তিনি ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন! চরম দুর্ভাগ্যের চাপে এমন একটা মানুষের সত্যিই কি তা হলে মাথায় গোলমাল কিছু হয়েছে?
কথাগুলো এই ভেবেই একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে পিজারো এবার সহজ শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করেন, নদীর মোহনায় সান লকার-এর চড়া পার করে দেবেন বললেন। বললেন তাতে আমার এমন উপকার করছেন যার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ হব। উপকারটা কী তা তো বুঝতে পারছি না!
এখনও বুঝতে পারছেন না! হেসে বলেন সানসেদো, আপনার ওই দৈত্যাকার সঙ্গীকে ফিরে যেতে হুকুম দিয়ে ওপরে উঠে আসুন, সব বুঝিয়ে বলছি। সব কথা না শুনে বুড়োর ওপর হামলা যে করবেন না এটুকু ভরসা আপনার ওপর বোধহয় রাখতে পারি। আসুন।
পিজারো সানসেদোর নির্দেশ মতোই কানডিয়াকে ফিরে যেতে বলে ওপরে গিয়ে ওঠেন। মনে মনে তখন তিনি স্থির করে নিয়েছেন যে সত্যি উন্মাদ বলে বুঝতে পারলে সানসেদোকে গায়ের জোরে বন্দি করতে তিনি দ্বিধা করবেন না।
