পিজারো টোলেডোতে এসেই বুঝলেন যে, তাঁর যা-কিছু আর্জি তাড়াতাড়ি মঞ্জুর না করাতে পারলে সব বরবাদ হয়ে যাবে। সম্রাট ক-দিন বাদেই ইটালিতে রোমান পন্টিফ-এর হাত থেকে রাজচক্রবর্তীর মুকুট নিতে যাচ্ছেন। একবার স্পেন ছেড়ে চলে গেলে পঞ্চম চার্লস-এর নাগাল পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না।
পিজারোর ভাগ্য একটু ভাল যে, সম্রাট খুব সম্প্রতি সাগরপারের নতুন মহাদেশের আবিষ্কার অভিযান সম্বন্ধে একটু উৎসাহী হয়েছেন। প্রথম দিকে কাগজে কলমে বিরাট সব নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার ও দখলের প্রমাণ পেলেও সেসব জায়গা থেকে এমন কিছু ভেট নজরানা খাজনা পাননি যাতে তাঁর মন ওঠে। নামে তালপুকুর, আসলে ঘটি ডোবে না গোছের নতুন রাজ্য সম্বন্ধে তাই তিনি তখন উদাসীনই ছিলেন।
হাওয়াটা বদলেছে কর্টেজ-এর মেক্সিকো বিজয়ের পর। মেক্সিকো থেকে সোনাদানা মণিরত্ন যা এসেছে তাঁর রাজকোষে, তাতে খুশি হয়ে নতুন মহাদেশের ব্যাপারে তিনি একটু মনোযোগ দিতে শুরু করেছেন।
পিজারো টোলেডোতে এসে সময় নষ্ট করেননি। সভাসদদের মধ্যে যারা হোমরা চোমরা তাদেরই নানা উপহার দিয়ে বশ করেছেন সবার আগে। তারপর পশ্চিম অজানা সমুদ্রের উপকূলের পরমাশ্চর্য সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের বলতে গেলে চৌকাঠ থেকে তুলে আনা সম্পদের নমুনা সম্রাটের কাছে নিবেদন করেছেন।
সোনারুপোর তৈজসপত্র আর অলংকারের কারুকাজ আর প্রাচুর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন পঞ্চম চার্লস, মুগ্ধ হয়েছেন সে দেশের অদ্ভুত পশমের বস্ত্রে। কিন্তু তাতেও পিজারোর ওপর সেরকম সদয় তিনি হতেন কিনা সন্দেহ।
তাঁকে মনঃস্থির করতে যা সত্যিই সাহায্য করেছে তা হল সেই আজগুবি জানোয়ার, ক্লামা, সেভিল শহরে যা পিজায়োর দুর্ভাগ্যের প্রথম বিজ্ঞাপন হয়ে নগরবাসীদের সজাগ করে তুলেছিল।
পিজারোর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে টোলেডডা ছেড়ে যাবার আগে সম্রাট তাঁকে যতখানি সম্ভব সাহায্য করবার হুকুম আমলাদের দিয়ে গেছেন।
সম্রাট তো হুকুম দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু সব দেশে সব যুগেই সরকারি ব্যবস্থার চাকা সমান গদাইলশকরি চালে ঘঘারে।
পিজারোর পুঁজি আর কতটুকু। দু-দুটো অভিযানের পর সর্বস্বান্ত হয়ে মহাজন আর হিতৈষীদের কাছে কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা এনেছেন রাজদরবারে ধরনা দিতেই দিতেই তা প্রায় ফুরিয়ে এল। ফতুর হয়ে রাজদরবারে টেকা যায় না, আর যদি বা টিকে থাকেন, আকালে বীজ পর্যন্ত খেয়ে শেষ করা চাষির খেতে বৃষ্টির পশলার মতে। সম্রাটের অনুগ্রহ তো তখন উপহাস হয়ে দাঁড়াবে! সে অনুগ্রহ তো কোনও কাজেই লাগবে না আর।
মরিয়া হয়ে পিজারো সম্রাজ্ঞীর কাছেই এবার করুণ আর্জি জানালেন, আর তাতেই অঘটন ঘটে গেল। পিজারো রাজানুগ্রহ যা পেলেন তা তাঁর কল্পনাতীত।
সম্রাট টোলেডো ছেড়ে যাবার পর সম্রাজ্ঞীর ওপরই ছিল এ সব রাজকার্যের ভার। মেয়েছেলে এসব অভিযান আবিষ্কারের মর্ম আর কতটা বুঝবে এই ছিল পিজারোর ভাবনা। কিন্তু সম্রাটের বদলে সম্রাজ্ঞীর হাতে ভার পড়া পিজারোর কপালে শাপে বর হল। সম্রাজ্ঞী মেয়েছেলে বলেই অনুগ্রহ যা করলেন তা সব হিসেবের বাইরে।
এই অনুগ্রহ বিতরণের পাকাপাকি ব্যবস্থাপত্র সম্রাজ্ঞী দস্তখত করে দেন ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দের ছাব্বিশে জুলাই। সে ব্যবস্থাপত্র অনুসারে শুধু যে নতুন মুল্লুক আবিষ্কার ও জয় করবার অধিকার পিজারোকে দেওয়া হল তা নয়, তিনি সে প্রদেশের গভর্নর ও ক্যাপটেন জেনারেল হবেন বলেও সাব্যস্ত হল। তা ছাড়া তিনি, আসলে যা-ই হোক, গালভরা নামের আদেলানতাদো আর আলগাকুয়াথিল হবেন সারাজীবনের জন্যে। আর বেতন পাবেন বছরে সাত শো পঁচিশ হাজার মারাভেদি। মারাভেদি যে কোন মুদ্রা তা এখন সঠিক বলা কঠিন। স্পেনে মুরদের আমলের সোনার মুদ্রা একরকম দিনারকে বলত মারাভেদি। পিজারোকে সেই সোনার দিনার-এ মাইনে দেওয়ার কথা ব্যবস্থাপত্রে লেখা হয়েছিল কিনা বলা যায় না। স্পেনের মধ্যযুগের আর এক রুপোর মুদ্রা রিয়াল-এর ভাঙটার নামও ছিল, মারাভেদি। সোনার দিনার-এর বদলে রুপোর মারভেদি হলেই কিন্তু আমরা খুশি হই বোধহয় মনে মনে। সাড়ে চারশো বছর আগে চুকেবুকে গেলেও অমন বরাত দেখলে এখনও আমাদের যেন চোখ টাটায়।
আমাদেরই অবস্থা যখন এই তখন পিজারোর ওপর এই অনুগ্রহ বর্ষণের ঘটা দেখে টোলেডোর রাজসভায় ঈর্ষা যে অনেকের হয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ সৌভাগ্যের সিঁড়ির প্রথম ধাপেই যে জবর কাঁটার বেড়া একটা ছিল সেইটেই বোধহয় বড় কেউ খেয়াল করে দেখেননি।
সে কাঁটার বেড়া হল এই যে, ব্যবস্থাপত্র দস্তখতের তারিখ থেকে ছ-মাসের মধ্যে পিজারোকে অন্তত আড়াইশো জনের এক লশকর বাহিনী তার অভিযানের জন্যে জোগাড় করতে হবে। সে আড়াইশোর মধ্যে নতুন মহাদেশের উপনিবেশ থেকে একশো জন রংরুট নেওয়া চলবে অবশ্য।
শুধু এই নয়, এই লশকর বাহিনী জোগাড় করে পানামায় পৌঁছোবার দু-মাসের মধ্যে পিজারোকে অভিযানে রওনা হতে হবেই।
পিজারোর তখন যা নামডাক আর নতুন মহাদেশের সূর্য কাঁদলে সোনার রাজ্যের যা সব কিংবদন্তি তখন সারা এসপানিয়ায় ছড়িয়েছে তাতে এই সামান্য ক-টা লোক তুড়ি দিয়েই জোগাড় করা যাবে মনে হয়েছিল।
কিন্তু তা হয়নি। পিজারো টোলেডো থেকে তাঁর নিজের জন্মস্থান টুকসিলোয় গেছেন নিজের জানা এলাকায় লশকর সংগ্রহের সুবিধা হবে ভেবে। সেখানে তাঁর চার ভাই তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছে বটে কিন্তু তাঁর মুখের বিবরণ শুনে যত মোহিতই হোক, তাঁর জাহাজের লশকর সেনা হিসেবে নাম লেখাতে বেশি কেউ অগ্রসর হয়নি।
