দেখতে দেখতে তাঁর বরাদ্দ ছ-মাস কেটে গেছে।
সেভিল-এর বন্দরে তিনটে জাহাজ তিনি অভিযানের জন্যে সাজিয়ে রেখেছেন বটে কিন্তু সেগুলির অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। মাঝি-মাল্লা লশকরও তাঁর যা দরকার তা জোগাড় হয়নি।
ব্যবস্থাপত্রের শর্ত সময়মতো প্রাণপণে যখন পূরণ করবার চেষ্টা চলছে তখন রাজ-সরকার থেকে এক নির্দেশ এসে হাজির।
সম্রাজ্ঞীর দেওয়া ব্যবস্থাপত্রের সমস্ত শর্ত ঠিকমতো পূরণ করা হয়েছে কিনা পরীক্ষা করবার জন্যে সরকারি পরিদর্শক আসছেন।
পিজারো সত্যিই চোখে অন্ধকার দেখলেন। অজানা দূর সমুদ্রের কোনও রহস্যময় উপকূলে নয়—তাঁর নিজের দেশ এসপানিয়ার ঘাটেই এমন করে তাঁর ভাগ্যের ভরাড়ুবি হবে তিনি ভাবতে পারেননি।
পিজারোর ভাগ্য যদি অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ হয়ে থাকে তা হলে তাঁর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের দরুন হিসাবের ভুল তার জন্যে কিছুটা দায়ী। তিনি গালভরা সব পদবি আর কাঁড়ি কাঁড়ি মারাভেদি বেতনের আশ্বাসেই গলে গিয়েছিলেন। স্পেনের রাজ-সরকারের সব অনুগ্রহ যে মাছের তেলে মাছ ভাজা, সেটুকু আর তলিয়ে বোঝেননি।
অভিযাত্রীদের উৎসাহ দেবার জন্যে স্পেনের ব্যবস্থা বড় চমৎকার। নিজের রাজকোষ থেকে স্পেন একটি পয়সা খরচ করবে না। ধনপ্রাণ পণ করে যদি কেউ নতুন দেশ আবিষ্কার আর জয় করতে পারে সম্রাটের নামে তা হলে তারই সম্পদের ছিটেফোঁটা তাকে দেওয়া হবে অনুগ্রহ করে। সেই সঙ্গে গালভরা লম্বা লম্বা খেতাব বিলোতেও স্পেন সরকার মুক্তহস্ত।
পিজারোর বেলা ব্যাপারটা যদি গাছে না উঠতে এক কাঁদির স্বপ্ন হয়ে থাকে তা হলেও টোলেরেমন্ডোর রাজদরবারে পিজারোর খবর প্রথম পৌঁছে দেবার বাহাদুরি যে দেখিয়েছে সেই মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর তো তা হবার কথা নয়।
পিজারোর ভাগ্যে যাই হয়ে থাক, মার্কুইস-এর বরাত তো ওই খবর পৌঁছে দেওয়া। থেকেই খুলে যাওয়া উচিত ছিল। আর কিছু না হোক, এই এক বাহাদুরির জোরেই টোলেডোর রাজদরবারে তার পেখম তুলে ঘুরে বেড়ানোর কথা।
আশ্চর্য কথা এই যে, টোলেডোতে পিজারোর সংবাদ সবিস্তারে স্বয়ং সম্রাটের কাছেই জানাবার পরদিন থেকেই মার্কুইসকে আর রাজদরবারের ত্রিসীমানায় দেখা যায়নি।
অথচ মার্কুইস-এর হঠাৎ এমন নিরুদ্দেশ হবার কোনও কারণই পাওয়া যায় না।
সম্রাট পঞ্চম চার্লস এ খবর শুনে কর্তব্যবুদ্ধি আর সুবিবেচনার জন্যে নিজের মুখে। মার্কুইসকে তারিফ করেছেন। সংশ্লিষ্ট রাজকর্মচারী খাতির করে মার্কুইসকে নিজেদের দফতরে ডেকে সেভিলের কোয়ালিতে পাঠাবার হুকুমনামা মুসাবিদা করেছেন তাকে শুনিয়েই।
সেই দফতর থেকে বার হবার মুখে এমন একজন তাকে দেখে একটু থমকে দাঁড়িয়ে তার সম্বন্ধে খোঁজ নিয়েছেন যাঁর কৌতূহলটুকুর দরুনই মার্কুইস-এর কৃতার্থ হওয়া উচিত।
খোঁজ যিনি নিয়েছেন তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং মেক্সিকো-বিজেতা হার্নারেমন্ডো কর্টেজ। তিনি তখন মেক্সিকো থেকে টেলেডোর রাজদরবারে তাঁর কিছু আর্জি আর অভিযোগ জানাতে কয়েকদিন আগে মাত্র এসেছেন।
ঘটনাচক্র নিয়ে যারা মাথা ঘামায় তারা স্পেনের টোলেডোতে একই সময়ে হার্নারেমন্ডো কর্টেজ আর ফ্রানসিসকো পিজারোর উপস্থিতির একটা তাৎপর্য খুঁজতে পারে।
হার্নারেমন্ডো কর্টেজ আতলান্তিক সাগর পারে উত্তর দিকের এক অসীম ঐশ্বর্যের দেশ জয় করে তখন তাঁর কীর্তির শিখরে পৌঁছেছেন।
আর ফ্রানসিসকো পিজারো তখনও দক্ষিণের আর এক আশ্চর্য সোনায় মোড়া দেশ আবিষ্কার ও জয় করবার শুধু স্বপ্নই দেখছেন।
এ দুজনের পরস্পরের মধ্যে আলাপ পরিচয় তখনও বোধহয় হয়নি। অন্তত টোলেডোতে নিশ্চয় নয়। হলে সে সাক্ষাৎ স্মরণীয় হয়ে থাকত।
হার্নারেমন্ডো কর্টেজ সেদিন মার্কুইসকে দেখে কিন্তু একটু চমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। মার্কুইসও দফতরখানা থেকে বেরিয়ে কর্টেজকে দেখেছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু সে একবার দেখেই মুখ ফিরিয়ে হনহন করে যেভাবে বেরিয়ে চলে গেছল তাতে কর্টেজকে সে চেনে না বলেই মনে হয়েছে।
কটেজ-এর কিন্তু মার্কুইসকে সম্পূর্ণ অচেনা বোধহয় মনে হয়নি!
মার্কুইস চলে যাবার পর পাশের এক কর্মচারীকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন উনি কে, বলুন তো?
বাঃ, উনিই তো মাইস গঞ্জালেস দে সোলিস, বেশ একটু সম্ভ্রমের সঙ্গে জানিয়েছিল কর্মচারীটি।
মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস! নিজের মনে নামটা উচ্চারণ করতে করতে কর্টেজের ভ্রূ একটু কুঞ্চিত হয়েছিল। চেহারা আর নামটা যেন কিছুতেই তিনি স্মরণ করতে পারছেন না।
আর একবার রাজদরবারে দেখা হলে হয়তো পারতেন। কিন্তু সে সুযোগ আর মেলেনি।
পরের দিন থেকেই মার্কুইসকে টোলেডোতে আর দেখা যায়নি।
কর্তব্যটুকু করে সে যেন প্রাপ্য সম্মানটুকুর তোয়াক্কা না রেখে চলে গেছে।
শুধু ওই কর্তব্যটুকু সে করেনি। সেভিল থেকে টোলেডো রওনা হবার আগেই সৎ নাগরিকের আর একটি প্রয়োজনীয় কর্তব্য সে পালন করে এসেছিল।
পলাতক ক্রীতদাস হিসেবে ঘনরামের বিস্তারিত পরিচয় সেখানকার কোতোয়ালিতে জানিয়ে এসেছিল।
এর আগে কাপিন সানসেদোর বিরুদ্ধে সে হুলিয়া বার করবার ব্যবস্থা করিয়েছিল, এবার বার করিয়েছে ঘনরামের বিরুদ্ধে।
আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, মার্কুইস-এর সেভিল ছাড়ার দু-দিন বাদেই এই দুটি ফেরারি অপরাধীই একসঙ্গে ধরা পড়েছে। ধরা পড়েছে সেভিল-এ নয়, সানসেদোর নিজের শহর মেদেলিন-এ।
