হঠাৎ থেমে গিয়ে জিভে আফশোশের আওয়াজ করে ঘনরাম বলেছেন, এই দেখুন, এ বেয়াড়া হাতিয়ার এত সাবধানে চালাবার চেষ্টা করেও একটা কান আপনার কেটে ফেললাম। এই জন্যেই আপনাকে তলোয়ার ফেলে হাতে লড়তে বলেছিলাম। যাক, একটা কানই যখন গেছে তখন দুটোই যাক। ছেলেবেলায় যেন কোথায় শুনেছিলাম দুকান কাটা হলে আর লজ্জা-শরম কিছুর দরকার থাকে না। আরে, আরে—আপনি যে আরও খেপে যাচ্ছেন! ভুলে যাচ্ছেন কেন যে এ ছোরার একধারে দাঁত থাকাটা মিথ্যে বাহার নয়। এর কাজ হল অতি ধারালো তলোয়ারও এমনইভাবে কায়দা মাফিক ধরে নিয়ে দু-টুকরো করে ফেলা।
সোরাবিয়ার তলোয়ার তখন সত্যিই ঘনরামের হাতের ছোরার দাঁতালো ধারে পড়ে দু-টুকরো হয়ে সশব্দে মেঝের ওপর পড়েছে।
ব্যাপারটা বোধহয় সোরাবিয়ার একেবারে কল্পনাতীত। মেঝের ওপরকার তলোয়ারের টুকরো দুটোর দিকে চেয়ে সে একেবারে হতভম্ব, নির্বাক।
প্রথম বিমূঢ়তাটা একটু সামলে সে সভয়ে ঘনরামের দিকে তাকিয়েছে। ঘনরামের দিকে ঠিক নয়, তাঁর হাতের ছোরাটার ওপরই তার দৃষ্টি তখন স্থির।
ঘনরাম প্রথমে সজোরে মারবার ভঙ্গিতেই ছোরাটা তুলেছেন।
ফ্যাকাশে মুখে সোরাবিয়া দু-পা পিছিয়ে যেতে একটু মুচকি হেসে ঘনরাম ছোরাটা। আবার নামিয়ে বলেছেন, ভয় নেই, মার্কুইস। আগেই বলেছি আপনার সব কীর্তি আর কথার পুরো জবাব আজই দেওয়া হবে না। দুনিয়ার ইতিহাসের একটা নতুন পাতা খোলাবার জন্যে আপনাকেও এখন একটু দরকার। আপনাকে এই অবস্থাতেই তাই ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছি। আমি চলে যাবার পর আপনারও বেশিক্ষণ এখানে থাকার অন্য বিপদ আছে। আপনার স্ত্রী মার্শনেসকে যে চরম অপমান করেছেন, তাতে লজ্জায় ঘেন্নায় দেশান্তরী হবার মতো মেয়ে তিনি বোধহয় নন। পোশাক বদলে উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতে আসতে তিনি দেরি করবেন না এ অনুমান আমার বোধহয় ভুল নয়। আমি সামনে থাকলে ব্যাপারটা একটু কুৎসিত রকম জটিল হতে পারে বলে আমি এখুনি চললাম। তারপর বিলম্ব না করে আপনারও টোলেডো রওনা হওয়া উচিত। সম্রাট পঞ্চম চার্লস সেখানেই দরবার বসিয়েছেন খবর পেয়েছি। আশা করি নিজের স্বার্থ বুঝে আমার পরামর্শটা নেবেন—
হঠাৎ থেমে বাঁ-হাতের প্রচণ্ড ধাক্কায় সোরাবিয়াকে ঘরের কোণে ছিটকে ফেলে দিয়ে ঘনরাম আবার বলেছেন, না না, মার্কুইস এরকম ভুল করা আপনার উচিত হয়নি। বিশেষ কারণে এখনকার মতো উদার হচ্ছি বলে অসাবধান আমি হইনি। আপনার মতো প্রাণীর প্যাঁচালো মাথার অন্ধিসন্ধি আমার জানা। সুতরাং অন্যমনস্কতার সুযোগে আচমকা কাবু করবেন, বৃথাই সে আশা করেছেন। আপনার সঙ্গে হিসেব-নিকেশ সব বাকি রেখেই এখন যাচ্ছি। আশা করছি একটা কান একটু ছিঁড়ে যার নমুনা দেখিয়েছি, একদিন সেই হিসেব পুরোপুরি চোকাবার সুযোগ পাব।
সেই মুহূর্তে ঘরের বাইরে একটা দ্রুত পদশব্দ শোনা গেছে।
ঘনরাম সজোরে ঘরের বাতিদানের দিকে তাঁর ছোরাটা সঙ্গে সঙ্গে ছুড়ে মেরেছেন।
ঝনঝনিয়ে কাঁচের ঢাকনা সমেত বাতিদানটা মেঝেয় আছড়ে পড়ে ঘর অন্ধকার হয়ে যেতে-না-যেতেই ঘনরাম সেখান থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছেন।
যাবার পথে অন্ধকারে সজোরে একবার ধাক্কা খেয়েছেন।
দেহের উষ্ণ কোমলতা থেকেই সংঘর্ষটা যে কার সঙ্গে হয়েছে তা বুঝতে দেরি হয়নি।
ধাক্কা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোমল দেহটা তাঁর অঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে তা থেকে যেন ইস্পাতের দুটি বাহু বেরিয়ে তাঁকে ধরে রাখতে চেয়েছে।
সেই সঙ্গে নারীকণ্ঠে শোনা গেছে ব্যাকুল জিজ্ঞাসা, কে? কে তুমি? দাস?
ঘনরাম কোনও উত্তর দেননি। নীরবে প্রাণপণ শক্তিতে আনার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে প্রায় নিষ্ঠুরভাবে মুক্ত করে ছুটে বেরিয়ে গেছেন।
বাড়ি থেকে জনহীন নিরালোক রাস্তায় বেরিয়ে এসে তিনি নিশ্চিন্ত হয়েছেন অনেকখানি।
আপাতত সেভিল শহরে সে রাত্রের মতো অন্তত তিনি নিরাপদ। সোরাবিয়ার বাড়ির দেউড়ি থেকে রাস্তায় পা বাড়িয়ে কয়েক পা এগিয়েই তিনি কিন্তু চমকে উঠেছেন।। সেখানে এমন একজন তাঁর পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে, যাকে এখানে দেখবার কথা ঘনরাম কল্পনাও করতে পারেননি।
১১. পিজারোর সেভিল-এর বন্দরে
পিজারোর সেভিল-এর বন্দরে দেনার দায়ে বন্দি হওয়ার খবর সম্রাট পঞ্চম চার্লস-এর দরবারে সত্যি পৌঁছেছিল।
সংবাদের প্রধান বাহক মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস। তার আগে একটু-আধটু উড়ো খবর যা পাওয়া গেছল তা দরবারে যৎসামান্য আলোচনার ঢেউ তুললেও সম্রাটের কানে তোেলবার যোগ্য কেউ ভাবেনি। মার্কুইস বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়ে এ খবর বয়ে না নিয়ে গেলে পিজারোর মুক্তি কতদিনে হত কে জানে! না-ও হতে পারত বছরের পর বছর। তখনকার যুগে অনেক উঁচুদরের মানুষের গারখানার দেওয়ালের আড়ালে চিরকালের জন্যে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা বিরল ছিল না।
মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর কাছে এ খবর পাবার পর সম্রাটের দরবার উত্তেজিত চঞ্চল হয়ে ওঠে।
পঞ্চম চার্লস তখন টোলেডোতে। পিজারো কে, কী জন্যে সে নতুন মহাদেশ থেকে এসেছে, আর এসেই কুড়ি বছরের পুরনো দেনার দায়ে কীভাবে কয়েদ হয়েছে সম্রাটের কানে যাওয়া মাত্র তিনি পিজারোকে মুক্ত করার হুকুম পাঠিয়ে দেন, সেই সঙ্গে রাজদরবারে তৎক্ষণাৎ পিজারোর আসার অনুমতি, যা নিমন্ত্রণেরই শামিল।
পিজারো যখন টোলেডোতে এসে পৌছোলেন তখন সম্রাটের সেখান থেকে ইটালিতে পাড়ি দেবার তোড়জোড় চলছে। জন্মগত উত্তরাধিকারসূত্রে স্পেনের সম্রাট হলে কী হবে, পঞ্চম চার্লস স্পেনে থাকা খুব পছন্দ করেন না। সময়টাও তখন তাঁর অত্যন্ত ভাল যাচ্ছে। তাঁর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সের রাজার মাথা তিনি হেঁট করতে পেরেছেন পাভিয়ার যুদ্ধে। জার্মানির সিংহাসন তাঁর দখলে। এ সব সৌভাগ্যে উৎফুল্ল হয়ে স্পেনের চেয়ে ইউরোপের বড় আসরে রাজাগিরির জাঁক দেখাবার আগ্রহ খুব অস্বাভাবিক নয়।
