ইস! গোলাম জাতের জন্য বড় যে দরদ। তার জন্যেই এ অভিসারের সাজ? কেমন? কুৎসিতভাবে হেসে উঠেছে সোরাবিয়া। তারপর হঠাৎ তলোয়ারের ফলাটা অদ্ভুত কৌশলে আনার পোশাকের ওপর যেন বুলিয়ে দিয়েছে।
তলোয়ারের খেলায় সোরাবিয়া যে উঁচুদরের বাহাদুর তার এই গায়ে আঁচড়টি না লাগিয়ে ফলা বুলোবার কায়দাতেই তা বোঝা গেছে। আনার পরনে কিষাণ মেয়ের পোশাক। কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত সে পোশাক তলোয়ারের ফলার সূক্ষ্ম টানে দু ফাঁক হয়ে ঝুলে পড়েছে শরীরের দুধারে। হঠাৎ এভাবে বেআবরু হয়ে ক্ষণেকের জন্যে স্তম্ভিত ও তার পরেই লজ্জায় অপমানে দিশাহারা অবস্থায় আনাকে ছুটে বেরিয়ে যেতে হয়েছে ঘর থেকে অস্ফুট আর্তনাদ করে।
গোলাম প্রেমিককে রূপ দেখাতে এত লজ্জা কীসের!ইতর মুখভঙ্গি করে আনার পেছনে অপমানটা যেন নোংরা কাদার মতো ছুড়ে দিয়েছে সোরাবিয়া। তারপর ঘনরামের দিকে ফিরে বিদ্রূপে বাঁকা কুৎসিত হাসির সঙ্গে বলেছে, জানের বদলে তোকে একটু খেসারত দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যাবার আগে চক্ষু সার্থক করে যাওয়া তোর কপালে নেই!
ঘনরাম তখন শান্ত স্থির অবিচল, কিন্তু সে স্থৈর্য যেন থমকে যাওয়া তুফানের ভয়ংকর মেঘের।
ভেতরে যে কী চলছে তা শুধু তাঁর চোখের দৃষ্টির তীব্র বিদ্যুৎ-জ্বালায় ধরা পড়ে। গলা কিন্তু তাঁর সহজ স্বাভাবিক, বরং একটু যেন পরিহাসলঘু।
সেই হালকা গলাতেই তিনি বলেছেন, আপনি যে সত্যিকার বনেদি মার্কুইস তা আপনার চালচলনেই বোঝা যায়। নিজের স্ত্রীর সম্মান এভাবে রাখতে ইতর ভুঁইফোড় কেউ পারে! আপনার মতো মার্কুইস-এর উপযুক্ত নজরানা আজই দিয়ে যেতে পারলে খুশি হতাম, কিন্তু তার উপায় নেই। আপনাকে শুধু একটা অনুরোধ করছি। হাতের তলোয়ারটা ফেলে দিন। আমাকে শিক্ষা দেবার বাসনা থাকে তো শুধু হাতেই তা দেবার চেষ্টা করতে পারেন। তলোয়ার হাতে থাকলে আপনার বেশি জখম হবার বিপদ আছে।
বটে! হিংস্রভাবে হেসে উঠে বলেছে সোরাবিয়া, তলোয়ার চালাতে আমি যে আনাড়ি তা ধরে ফেলেছিস, কেমন?
না, আনাড়ি নয়, মার্কুইস, বেশ একটু তারিফ করার ভঙ্গিতেই বলেছেন ঘনরাম, আমি সমুদ্রের এপারে-ওপারে আপনার মতো তলোয়ারের পাকা হাত দেখেছি কি
সন্দেহ। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে, আপনি তলোয়ার না ছাড়লে আমাকেও ছোরাটা হাতে রাখতে হয়। তলোয়ার ঠেকাতে ছোরা, বুঝতেই তো পারছেন বেসামাল হয়ে যদি একটু বেশি ঘা দিয়ে ফেলি।
বেসামাল হয়ে আমায় বেশি ঘা দিয়ে ফেলবি! তোর ওই পুঁচকে ছোরা দিয়ে? শুনে থ হয়েই সোরাবিয়া বোধহয় হাসতে ভুলে গেছে প্রথমে। তারপর রাগে চিড়বিড়িয়ে উঠে বলেছে, সত্যিই তোর মরণ ছিটফিটিনি ধরেছে দেখতে পাচ্ছি। মুখে যাই বলি, ভেবেছিলাম, শুধু তোর নাক কান কেটে খাঁদা বোঁচা করে ঠেলে ফেলে দেব রাস্তায় তোর প্রেয়সীর মন ভোলাতে। সত্যিই তোর শমনের ডাকই এসেছে। নে, ইষ্টনাম জপ করে নে।
দাঁড়ান! দাঁড়ান মার্কুইস। সোরাবিয়া চালাবার জন্যে তলোয়ারটা তুলতেই মিনতির সুরে বলেছেন ঘনরাম, আবার আপনাকে বলছি, তলোয়ারটা ফেলে দিন।
এখনও আপনার অনেক কিছু করার আছে। অনেক ওপরের ধাপে ওঠবার–
ঘনরাম তখন তাঁর কথা আর শেষ করতে পারেননি। সোরাবিয়ার ঘা সামলাতে তাঁকে এক লাফে পাশে সরে যেতে হয়েছে।
সেখান থেকে প্রায় যেন নাচের পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে তিনি আবার আগের কথার খেই ধরেই বলেছেন, আপনাকে সম্রাটের দরবারে যেতে হবে, মার্কুইস—সে কথা ভুলে যাচ্ছেন কেন?
সোরাবিয়ার পরের মারটাও নাচুনে পায়ে এড়িয়ে ঘনরাম যেন বেশ একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে বলেছেন, এই সোজা কথাটা বুঝছেন না কেন? সম্রাটের কাছে কানা খোঁড়া হয়ে কি গায়ে মাথায় ঘেয়ো পটি বেঁধে যাওয়া কি ভাল দেখাবে!
সোরাবিয়ার তৃতীয় মারটা ঘনরাম তাঁর ছোরা দিয়েই ঠেকিয়েছেন এবার। তারপর কিছুক্ষণ কথা বলার ফুরসত পাননি।
সোরাবিয়া তখন সত্যিই একেবারে খেপে গেছে। আজেবাজে নয়, যথার্থই সে উঁচুদরের অসিযোদ্ধা। সামান্য একটা ছোরা নিয়ে তাকে ঠেকানো মানে তার চরম অপমান। সে অপমানের শোধ নিতে খোঁচানো বাঘের মতো সে তখন হিংস্র হয়ে। উঠেছে। ঘনরামকে টুকরো টুকরো করে না কাটলে বোধহয় তার রাগ যাবে না।
কিন্তু ঘনরামকে কাটতে হলে ধরা তো চাই। সেইটেই যে মুশকিল। হাতে তাঁর একটা খাটো ছোরা মাত্র। কিন্তু সেই ছোরা দিয়েই যেন তিনি ভেলকি দেখিয়েছেন। হাতের ছোরার চেয়ে তাঁর পায়ের ভেলকি অবশ্য বেশি বই কম নয়। তলোয়ার হাতে ওই ঘরটুকুর মধ্যে চরকিপাক খেতে হয়েছে সোরাবিয়াকে তাঁকে বাগে পাওয়ার জন্যে। হেলে দুলে যেন নাচের পা ফেলার কৌশলে ঘনরাম সোরাবিয়াকে বার বার এড়িয়ে গিয়ে তার তলোয়ারের নিপুণ চালও হাস্যকর করে তুলেছেন।
সোরাবিয়ার খ্যাপা আক্রোশের প্রথম ধাক্কাটা সামলে ঘনরাম আবার তাকে বোঝাতেও শুরু করেছেন আগের জের টেনে, তলোয়ার আপনি ভালই খেলেন, কিন্তু পায়ের কাজ কিছু শিখলে ভাল করতেন। পায়ের দোষেই ঠিক সুবিধে করতে পারছেন না। তা ছাড়া আমার এই ছোরাটাকে হেনস্থা করাও আপনার উচিত হয়নি। এ ছোরা আপনারই। শুধু এর দাম যে কত তা আপনি জানেন না। নেহাত বাহার হিসেবেই এটা কখনও-সখনও তলোয়ারের কোমরবন্ধে ঝুলিয়েছেন। এ বিষয়ে একটু ওয়াকিবহাল হলে বুঝতেন তলোয়ারের সঙ্গে ডানদিকে শোভার জন্যে ঝোলাবার মিজেরিকদে ছোরা এটা ঠিক নয়। এটা তার চেয়ে অনেক দামি আর কাজের জিনিস। এ ছোরা আপনাদের উত্তর-পুবের পাহাড়ি রাজ্যের পেশাদার সেপাইদের কাছ থেকে পাওয়া। আপনি কোথা থেকে এটা হাতিয়েছেন কে জানে, কিন্তু এ ছোরার পুরো মর্ম ববাঝেননি। পাহাড়ি সেপাইদের ছোরার সঙ্গেও এ ছোরার একটু তফাত আছে। সে ছোরা একটু বদলে এক ধার দাঁতালো করে এ ছোরা বানানো। নাম হল মাইন গাউচে!
