আনা চমকে ফিরে তাকিয়েছে। তার স্বামী সোরাবিয়াই খাপ থেকে খোলা তলোয়ার হাতে সেখানে দাঁড়িয়ে। মুখে তার হিংস্র পৈশাচিক কৌতুকের হাসি।
আনার সাময়িক বিমূঢ় অস্বস্তিটুকু উপভোগ করে সে কথাগুলো এবার যেন কুরিয়ে কুরিয়ে বলেছে, স্বপ্নে যাকে পাশে দেখো সেই গোলামটাকে জ্যান্ত তোমার বিছানায় বেঁধে তোমায় দেখানোই ছিল আসল উদ্দেশ্য। সেইজন্যেই তোমার ফেরার অপেক্ষায় হতভাগাকে বেঁধে রেখে গিয়েছিলাম। ওকে তখন অবশ্য অন্য কৈফিয়ত দিয়েছিলাম। বলেছিলাম—আমাদের মার্শনেস-এর শুচিবায়ু বড় বেড়েছে। আলাদা ঘরে থাকেন, নোংরা হবার ভয়ে তাঁর বিছানা আমায় ছুঁতে দেন না। একটা গোলামকে বেঁধে শুইয়ে বিছানাটা তাই একটু পবিত্র করতে চাই।
আনার মুখের চেহারা আর চোখের শানিত তীব্র ঝিলিক দেখে মনে হয়েছে সে বুঝি ক্ষিপ্ত চিতার মতো তৎক্ষণাৎ সোরাবিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
কিন্তু তা সে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। তার বদলে ঘনরামের দিকে ফিরে জ্বলন্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করেছে, এই কুৎসিত ইতর বিদ্রূপ শুনে একটা জবাবও দাওনি! খুব মজা
পেয়েছিলে বোধহয়?
মজা পাইনি। তবে জবাবও দিতে পারিনি তখন। ঘনরাম অনুত্তেজিত গলায় বলেছেন সোরাবিয়ার দিকে চেয়ে।
জবাবটা এখন তা হলে দিবি বোধহয়! হিংস্রভাবে হেসে উঠেছে সোরাবিয়া তাই দেওয়াই তো আমি চাইছি! ফেরারি গোলাম হিসেবে তোকে শুধু ধরিয়ে দিয়ে আমার কতটুকু আর সুখ হত! মার্শনেস আদর করে তোর বাঁধন খুলে দিয়েছে। এখন তার বিছানাতেই তোর লাশটা শুইয়ে তার সাধ মেটাই। কই, জবাব দে!
সোরাবিয়া তার খোলা তলোয়ারটা ঘনরামের দিকে তুলে ধরেছে এবার।
সেটা যেন লক্ষই না করে ঘনরাম অবিচলিতভাবে বলেছেন, জবাব আপনাকে সত্যিই দেব, মার্কুইস। কিন্তু শুধু ওই ইতর নোংরা রসিকতার নয়। আরও অনেক কিছুর জবাব আপনাকে দেবার আছে। প্রথম জবাব আপনার বেইমানির। পরস্পরের শর্ত মানব বলে আমরা কথা দিয়েছিলাম। আপনার শর্ত মেনে আমি আপনারই আবাসে এসে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আমার বক্তব্য আপনাকে শোনাতে রাজি হয়েছিলাম। আপনার নীচ জঘন্য রসিকতাও নীরবে সহ্য করেছিলাম আপনাকে দিয়ে একটা বড় কাজ করাবার জন্যে। কথা ছিল আপনার শর্ত মানলে আপনিও আমার শর্ত মানবেন। আমার বক্তব্য শুনে সেই অনুসারে কাজ করা আপনার পণেও লাভের বুঝলে আমাকে মুক্ত করে সেই কাজই করবেন। এই বিছানায় বাঁধা অবস্থায় আপনাকে যা আমি বলেছি তার মূল্য আপনি বুঝেছেন, বুঝেছেন যে পিজারোর মতো
অসামান্য আবিষ্কারকের সেভিলে অন্যায়ভাবে বন্দি হওয়ার খবর সম্রাটের দরবারে পৌঁছে দিতে পারলে আপনার কদর সেখানে অনেক গুণ বেড়ে যাবে। সমস্ত কথা বুঝে মনে মনে আমার পরামর্শ নেওয়ার মতলব করেও আমার বাঁধন আপনি খুলে দেননি। সত্যি সত্যিই আপনার স্ত্রী মার্শনেসকে তাঁরই বিছানায় আমার বাঁধাপড়ে-থাকার দৃশ্য দেখিয়ে চরম অপমান করবার জন্যে তাঁকেই খুঁজতে গেছলেন। আপনার এতরকম নীচতা ইতরতা বিশ্বাসঘাতকতার পুরোপুরি জবাব এখন অবশ্য দেওয়া চলবে না।
কেন, তৈরি করার সুযোগ পাসনি বুঝি? বাঁকা হাসির সঙ্গে তলোয়ারের ডগাটা ঘনরামের গলার কাছটায় সুনিপুণ কৌশলে দুবার ঘুরিয়ে বলেছে সোরাবিয়া, মার্শনেস-এর সঙ্গে একটু প্রেমালাপেরও সময় মেলেনি? বড় আচমকা এসে পড়েছি, কেমন!
না, আচমকা নয়, মার্কুইস। যেন বিনীতভাবে বলছেন ঘনরাম, গোলাম হিসেবে। মনিবদের কানমলা খেয়ে খেয়ে কান দুটো আমার একটু বেশি সূক্ষ্ম হয়ে গেছে। এইখানে বসে বাড়ির বাইরের রাস্তায় ঘোড়া থামিয়ে নিঃশব্দে আপনার নামবার চেষ্টা আমি টের পেয়েছি। টের পেয়েছি চুপি চুপি পা টিপে আপনার বাড়ির ভেতর ঢোকা। মার্শনেসকে তাই তখন বলছিলাম যে আপনার ইতর মনের জঘন্য শর্ত মেনে নেওয়ার গ্লানিটুকু ঘোচাবার সুযোগ বোধহয় পাব। আপনি তখন সবে বাইরের দেউড়িতে টুকছেন।
বটে! তোর কান তো তা হলে কুকুরকেও হার মানায়! কুৎসিতভাবে হেসে উঠে বলেছে সোরাবিয়া, তোর কান দুটোই তা হলে আগে কেটে রাখি, তারপর এমন সরেস জবাব দেবার ওই জিভটা।
সোরাবিয়ার আস্ফালিত তলোয়ারের ফলাটা ঝিলিক দিয়ে উঠেছে ঘরের ঝোলানো বাতিদানের আলোয়।
সোরাবিয়ার তলোয়ারের ফলাটা তখনই রক্তপাত করবার জন্যে অবশ্য ঝিলিক। দিয়ে ওঠেনি। সোরাবিয়া নিষ্ঠুর কৌতুকে ঘনরামকে নিয়ে একটু খেলাবার জন্যেই তলোয়ারটা তাঁর মুখের চারিধারে নাচিয়েছে একটু।
কিন্তু সে শুধু বুঝি মুহূর্তের জন্যে।
সোরাবিয়ার তলোয়ারটা তাঁর মুখের কাছে নেচে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘনরাম বিদ্যুৎ গতিতে আনার হাতের ছোরাটা টেনে নিয়ে একটু সরে দাঁড়িয়েছেন।
সোরাবিয়া প্রথম এক লহমা বুঝি একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল, তারপরই তার মুখ শয়তানি হাসিতে কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে।
বাঃ, চমৎকার! চাপা হিংস্র উল্লাসে বলেছে সোরাবিয়া, ফেরারি গোলামের ধরা পড়ে ছোরা নিয়ে আক্রমণ! আজকাল আইন-কানুন একটু বেয়াড়া হয়েছে। নফর গোলাম মারলেও কৈফিয়ত দিতে হয়। কিন্তু বেয়াড়া গোলাম কি খ্যাপা কুকুর মারলে ইনাম পর্যন্ত মেলে। তোকে মুর্দা বানাবার এমন নির্দয় সুযোগ তুই নিজেই দিবি ভাবতে পারিনি।
শোনো!—সোরাবিয়া তলোয়ারটা বাড়িয়ে আবার একটু নাচাতেই রেগে চিৎকার করে এগিয়ে গিয়েছে আনা—এ তোমার অন্যায় লড়াই, সারাবিয়া। তোমার হাতে তলোয়ার আর দাসের হাতে শুধু একটা ছোরা।
