তার কাছে জনহীন নিস্তব্ধ তার নিজের চেনা বাড়িটাই কেমন যেন বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে হঠাৎ।
একবার মনে হয়েছে বাড়ি থেকে বার হয়ে গিয়ে কাউকে সাহায্যের সঙ্গী হবার জন্যে ডেকে আনে।
কিন্তু কাকে এখন সে ডেকে আনতে যাবে? রাস্তায় যাকে তাকে তো সে আহ্বান করতে পারে না। তার নিজের এখনকার সমাজের কাউকে ডাকতে গেলে একটা কৈফিয়ত তো দিতে হবে। কী কৈফিয়ত সে দিতে পারে!
সোরাবিয়াকে বাড়ি থেকে ঘোড়া চড়ে বেরিয়ে যেতে সে দেখেছে। ঘনরামকে সঙ্গে করে এনে তারপর একলা সে গেলই বা কোথায়?
স্থিরভাবে সমস্ত অবস্থাটা একবার বোঝবার চেষ্টা করবার জন্যে আনা তার নিজের ঘরে এবার গেছে! তিয়ো সানসেদোর সঙ্গে দেখা করা আজ আর হবে না। তার নিজের কিষাণ মেয়ের পোশাকটাও তাই বদলানো দরকার।
নিজের ঘরে ঢুকেই আনাকে স্তম্ভিত বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছে।
ঘনরাম তারই ঘরে পড়ে আছে, তারই বিছানার ওপর।
সমস্ত বাড়ির মধ্যে এই ঘরটিতে ঘনরামের থাকার কথা কল্পনা করতে পারেনি বলেই আনা এখানে খোঁজ করতে আসেনি।
নিজের ঘরে নিজের বিছানায় ঘনরামকে দেখবার পর আনা কিছুক্ষণ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থেকেছে। তার হাত পা নাড়বার যেন আর ক্ষমতা নেই।
ঘনরাম কেন যে তার এতক্ষণের ব্যাকুল চিৎকারে সাড়া দেয়নি তা এইবার বোঝা গেছে।
না, সে মৃত কি আহত বা অজ্ঞান নয়, আনার বিছানার ওপরই আষ্টেপৃষ্ঠে খাটের সঙ্গেই বাঁধা। শুধু চোখ দুটি বাদে মুখটাও তার কাপড় গুঁজে বন্ধ করা।
তোমার, তোমার এ অবস্থা কে করেছে! কে তোমায় বেঁধেছে এখানে! এক হিসেবে অর্থহীন প্রশ্ন ক্ষুব্ধ চিৎকার হয়ে বেরিয়েছে আনার কণ্ঠ থেকে।
এ অবস্থায় ঘনরামের যে উত্তর দেবার ক্ষমতা নেই পরমুহূর্তে তা স্মরণ করে আনা ছুটে গিয়ে পাশের সোরাবিয়ার ঘর থেকে আর কিছু না পেয়ে তার দীর্ঘ ছোরাটা নিয়ে এসেছে।
সেই ছোরা দিয়ে ব্যস্তব্যাকুলভাবে ঘনরাম দাসের বাঁধন সে কেটেছে। সব বাঁধন কাটতে হয়নি। বিছানার সঙ্গে জড়ানো হাতের বাঁধনটা কাটবার পর ঘনরাম নিজেই তাঁর মুখের ওপর চাপা দেওয়া কাপড়টা খুলে ফেলে যা বলেছেন তা ওই অবস্থায় একটু অপ্রত্যাশিত আর অস্বাভাবিক।
অন্য সময় হলে আর অমন উত্তেজিত বিহ্বল হয়ে না থাকলে আনার মতো মেয়ে এ কথায় বোধহয় জ্বলে উঠত।
ঘনরাম দাস নিজের মুখের বাঁধন খুলে বিছানার ওপর উঠে বসে একটু হেসে বলেছেন, কাজটা কি ভাল করলেন, মার্শনেস? একটা ফেরারি গোলামকে পালাবার সুযোগ দেওয়া যে অপরাধ তা তো জানেন!
কথাটায় সূক্ষ্ম খোঁচা যা ছিল তা বোঝবার মতো মনের অবস্থা আনার তখন নয়।
জানি!বলে অস্থির আগ্রহে সে জিজ্ঞাসা করেছে, তোমাকে সোরাবিয়াই তা হলে এখানে বেঁধে রেখেছে! কিন্তু কেন? বাঁধলই বা কেমন করে? তোমায় এমন করে বাঁধবার ক্ষমতা তার হল?
তা হবে না কেন? ঘনরাম এবার উঠে দাঁড়িয়ে ঈষৎ কৌতুকের স্বরে বলেছেন, আমি নিজেই যখন তাকে বাঁধতে দিয়েছি।
তুমি নিজেই তাকে বাঁধতে দিয়েছ! আনার গলায় প্রথম গভীর বিভ্রান্তি প্রকাশ পেয়েছে। তারপর তীব্রস্বরে সে বলেছে, এ পরিহাসের সময় নয়, দাস। মনে হচ্ছে চরম বিপদে পড়ে তোমার বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছে! নইলে তোমার অবস্থা যে কী সাংঘাতিক তুমি বুঝতে!
অবস্থা সাংঘাতিক জেনেই এখানে এসেছি, মার্শনেস! ঘনরামের গলায় আর কৌতুকের সুর তখন নেই—আর, পরিহাস করে নয়, সত্যই বলছি, আপনার মার্কুইসকে স্বেচ্ছায় এইভাবে আমায় বাঁধতে দিয়েছি!
কিন্তু গভীর বিমূঢ়তায় আনা কয়েক মুহূর্ত থেমেছে নিজের প্রশ্নটা গুছিয়ে নিতে। একটু অধৈর্যের সঙ্গে তারপর জিজ্ঞাসা করেছে, নেহাত উন্মাদ না হলে তা কি কেউ দেয়? তোমাকে তো তার সঙ্গেই এসে আমি এখানে ঢুকতে দেখেছি। তুমি কি এইভাবে বাঁধতে দেবার জন্যেই তার সঙ্গে এসেছিলে?
তা একরকম বলতে পারেন! ঘনরামের মুখে একটু তিক্ত হাসি এবার দেখা দিয়েছে—বাঁধা পড়বার জন্যে না থোক, তাঁর শর্ত মানতে রাজি হয়েই তার সঙ্গে
এখানে এসেছিলাম। এখানে আসবার পর তিনি ওই শর্তই জানিয়েছিলেন।
মানে তোমায় বেঁধে রাখার শর্ত! আনার মুখ দেখে মনে হয়েছে, ঘনরাম তার সঙ্গে যে পরিহাস করছেন তা তখনও সে এ বিষয়ে নিঃসংশয় হতে পারেনি—আর বেঁধে রাখা আমারই ঘরে আমার বিছানার ওপরে?
হ্যাঁ, এটা মার্কুইস মানে আপনার স্বামীর একটা নীচ ইতর কৌতুক। ঘনরামের গলার স্বর এবার ঘৃণাতীব্র হয়ে উঠেছে—তিনি তাঁর শর্ত জানিয়ে বলেছেন যে, শুধু বাঁধা পড়লেই হবে না, তাঁর স্ত্রী মার্শনেস-এর ঘরের বিছানায় আমায় বাঁধা থাকতে হবে।
এরকম শর্তের মানে?—তীব্র হয়ে উঠেছে আনার কণ্ঠস্বর!
এ বিশেষ শর্তের কারণ কুৎসিত রসিকতা করে তিনি যা বলেছেন তা আপনাকে শোনাতে পারব না মার্শনেস। তিক্তকণ্ঠে বলেছেন ঘনরাম, তা শুনেও বাধ্য হয়ে তাঁর সব কথায় যে রাজি হয়েছি তার জন্যে মনের গ্লানিটুকু ঘোচাবার সুযোগ আশা করছি। এখুনি পাব।
ঘনরামের কথার যথার্থ তাৎপর্যটা আনা তখনও ঠিক ধরতে পারেনি। কথাটা কেমন অদ্ভুত লাগায় ঘনরামের দিকে সবিস্ময়ে চেয়ে নিজের মনের জ্বালাতেই জিজ্ঞাসা করেছে, আমার ঘরে আমারই বিছানায় তোমাকে বাঁধবার শর্তের কী কারণ দেখিয়েছিল আমার স্বামী! শুনি কী রসিকতা সে করেছিল?
সে রসিকতাটা ওই নকল কাবালিয়েরো-সাজা ফেরারি গোলামের জিভে বোধহয়। বাধছে! অত যখন শোনবার আগ্রহ তখন আমিই শোনাচ্ছি না হয়।
