এমন মানুষ কে আছে সেভিল-এ?
ঘনরাম জনতার সঙ্গে মিশে সন্ধান নিয়েছেন! সন্ধান যা পেয়েছেন তাতে হতাশই হতে হয়েছে।
রাজসভায় পর্যন্ত খাতির আছে এমন মানুষ সেভিল-এ থাকবে না কেন? সেভিল তো আজেবাজে শহর নয়। কিন্তু পিজারোর মতো মানুষের জন্যে নড়ে বসতে তাদের দায় পড়েছে। হাজার হলেও ব্যালির এনসিসোর মতো মহাজন তাদেরই জাত-ভাই। দুটো আজগুবি জানোয়ার এনেছে বলে কোথাকার কোন হাঘরে বাউণ্ডুলের জন্যে সেই জাতভাইকে চটাতে সেভিল-এর বনেদি বড় ঘরোয়ানার কেউ রাজি নয়।
ব্যাচিলর এনসিসোর ইয়ার-দোস্ত কি জাত-ভাই নয় এমন হোমরা-চোমরা কি আর কেউ নেই তা হলে সেভিল-এ?
আছে। ওই তো মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিসই আছেন। দু-চারজন ভিড়ের ভেতর থেকে দেখিয়েও দিয়েছে—দরবারে ওঁর নাকি দারুণ খাতির। কোথায় কী ছিলেন কেউ জানে না। একধাপে একেবারে মার্কুইস হয়ে গেছেন কি অমনি অমনি!
মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস!
ঘনরাম ভিড়ের ভেতর দূর থেকে মার্কুইসকে ঘুরতে দেখেছেন। মার্কুইসকে আরও অনেকের মতোই পিজারো আর তার জাহাজের আজগুবি জানোয়ারের খবর কৌতূহলী করে বন্দরে টেনে এনেছে। সেভিল-এর খানদানিরা অবশ্য ব্যাচিলর এনসিসোর এ-ব্যাপারের সঙ্গে সংস্রবের কথা জানবার পর আজেবাজে। চাষাভুষো ইতরের ভিড়ে বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করেননি। সেভিল-এর বাইরের মানুষ বলেই মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিসকে তখনও বন্দরে ঘুরতে দেখা গেছে।
মার্কুইসকে দূর থেকে চিনিয়ে দেবার পর ঘনরাম প্রথমটা চমকে উঠেছেন সত্যিই। কিন্তু তারপর একটু কৌতুকের হাসিই ফুটে উঠেছে তাঁর মুখে।
মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর ঠিক এই সময়টিতে সেভিল শহরে উপস্থিত থাকা নিয়তির আর-এক কুটিল কৌতুক সন্দেহ নেই।
অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে মার্কুইসকেই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ধরতে হবে। পিজারোর খবর সম্রাটের দরবার পর্যন্ত পৌঁছে দেবার এ ছাড়া কোনও উপায় নেই। তাঁকে দেখে চিনতে পারলেই মার্কুইস কী করতে চাইবে তা তিনি ভাল করেই জানেন। পলাতক ক্রীতদাস হিসেবে তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার উৎসাহ ছাড়া মার্কুইস-এর মাথায় আর কোনও চিন্তাই তখন থাকবার কথা নয়।
তবু এ-ঝুকি তাঁকে নিতেই হবে। যেমন করে তোক তাকে বিশ্বাস করাতে হবে যে, পিজারোর খবর ঠিকমতো সম্রাটের দরবারে পৌঁছে দিলে তার নিজের ভবিষ্যৎই আরও উজ্জ্বল হতে পারে। মার্কুইস-এর ওপরে আরও বড় খেতাব আছে। মার্কুইস হিসেবে সে যা পেয়েছে, তার চেয়ে বড় ইনাম। সোরাবিয়া নাম মুছে যে মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস হতে পেরেছে সম্রাটকে বাধিত করে রাখার এ সুযোগ ছাড়া তার উচিত নয়।
মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিসকে এসব কথা বুঝিয়ে বিশ্বাস করানো ঘনরাম যতটা কঠিন হবে ভেবেছিলেন তা হয়নি! সোরাবিয়া নির্বোধ নয়, সম্রাটের দরবারে পিজারোর হয়ে ওকালতি করতে যাবার লাভ যে কী হতে পারে কথা পড়তে-পড়তেইসে বুঝেছে।
প্রথমে অবশ্য ঘনরামকে দেখে সোরাবিয়া ঠিক চিনতে পারেনি, কিংবা চিনলেও বিশ্বাস করা তার পক্ষেও শক্ত হয়েছে।
ঘনরাম নিজে থেকেই ভিড়ের ভেতর সোরাবিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, মহামান্য মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস পুরোনো এক আলাপীকে চিনতে পারবেন কি?
সোরাবিয়া মুখ ফিরিয়ে বেশ খানিকক্ষণ একটু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থেকেছে। তার চোখের বিভ্রম ধীরে ধীরে বিস্ময় থেকে হিংস্র উল্লাসে পৌঁছেছে তারপর।
তুই! তুই এসেছিস এই সেভিল শহরে আমারই চোখের সামনে। পৈশাচিক আনন্দটা সোরাবিয়ার গলায় লুকোনো থাকেনি।
হ্যাঁ, আমি নিজে থেকেই তোমার কাছে এসেছি, সোরাবিয়া! শান্ত অনুত্তেজিত স্বরে বলেছেন ঘনরাম, আমি এখানে সম্পূর্ণভাবে তোমার হাতের মুঠোয়। আমায় যখন খুশি তুমি ধরিয়ে দিতে পারো ফেরারি গোলাম হিসেবে। কিন্তু তার আগে আমি যা বলতে এসেছি, ধৈর্য ধরে নিজের স্বার্থে তোমায় একটু শুনতে অনুরোধ করছি। শুনে মনে না ধরলে আমায় কয়েদ করবার পুরো এক্তিয়ার তোমার থাকবে।
দু-এক মুহূর্ত কী ভেবে নিয়ে সোরাবিয়া বলেছে, চলো। তোমার কথাই আগে শুনব, কিন্তু আমার নিজের বাসায় আমার একটি শর্তে।
তাতেই রাজি হয়ে ঘনরাম সোরাবিয়ার সঙ্গে তার সেভিল-এর আবাসে গেছেন।
১০. আনা শেষ পর্যন্ত
আনা শেষ পর্যন্ত ঘনরামকে খুঁজে পেয়েছে।
খুঁজে পেয়েছে সমস্ত বাড়িতে ব্যাকুল হয়ে ছুটে বেড়াবার পর এমন অবস্থায় এমন একটি জায়গায় যেখানে সন্ধান করার কথা সে প্রথমে ভাবতেই পারেনি।
বাড়িতে দাসদাসী কেউ তখন নেই। ইস্টারের উৎসবের জন্যে বিকেল থেকে সেরাতের জন্যে যে তাদের ছুটি দেওয়া হয়েছে তা আনার ভুলে যাবার কথা নয়। সোরাবিয়াকে একবার শুধু জানিয়ে দুপুর থেকে ছুটি দেওয়ার ব্যবস্থাটা আনা নিজেই করেছিল সন্ধ্যায় কিষাণ মেয়ের ছদ্মবেশে বার হবার সুবিধের জন্যে। এখন কিন্তু সাহায্য করবার কাউকে না পেয়ে সে ক্রমশই বেশি অস্থির হয়ে উঠেছে। তার সমাজের অন্য মেয়েদের চেয়ে কুসংস্কার তার কম। তবু আজকের সব কটি ব্যাপার মিলে তার মনটা যেন দুর্বল করে দিয়েছে। আশাতীতভাবে যার দেখা সে আজ পেয়েছে এই বাড়ির মধ্যেই সোরাবিয়ার সঙ্গে ঢুকে সে লোকটা হঠাৎ এমন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে কী করে?
ব্যাপারটা সত্যিই ভৌতিক কিছু, না সোরাবিয়া নিজের খপ্পরে এনে মানুষটাকে গুমখুনটুন কিছু করেছে?
