আনার কাছে অনেক কিছুর উত্তর তিনি চান, কিন্তু আনা তাঁকে কেন খুঁজেছে তা তিনি ঠিক বুঝতে পারেননি।
বেশ একটু উদ্বেগ-চঞ্চল মন নিয়েই সানসেদো সান মার্কস-এর মিনারের নীচে গিয়ে দাঁড়ান। জায়গাটা একেবারে নির্জন। আনা তখনও সেখানে এসে পৌঁছায়নি। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও আনার দেখা পাওয়া যায় না। সানসেদো এবার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন অধীর হয়ে ওঠেন। হঠাৎ তাঁর মনে হয় আনা বোধহয় আর তাঁর সঙ্গে দেখা করবে না।
একথা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সানসেদোর মন হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আনার সঙ্গে দেখা না হলে তাঁর বিরুদ্ধে যে সাংঘাতিক অভিযোগ দাঁড় করানো হয়েছে তার মূল রহস্য জানবার আর বুঝি কোনও উপায় নেই।
আনা তাঁর সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত মত বদলাতে পারে এমন কথা সত্যিই তিনি ভাবতে পারেননি।
পারলে যত বিপদই থাক, সেই দুপুরবেলাই আনার কাছে যা জানবার তা জেনে নেবার চেষ্টা করতেন।
শুধু পথে-ঘাটে ভিড় অত্যন্ত বেশি বলে নয়, সম্ভ্রান্ত মহিলার পোশাকে আনাকে তাঁর মতে ভিখিরির সঙ্গে বেশিক্ষণ দেখলে লোকে সন্দিগ্ধ হয়ে উঠতে পারে এই কারণেও সানসেদো তখনকার মতো আনাকে ছেড়ে দিয়ে সন্ধ্যায় এই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছিলেন।
তাঁর সামান্য একটা চিরকুটে লেখা চিঠির ডাকেই সকালে আনাকে অমনভাবে সান্তা মারিয়া দে লা ক্যাথিড্রালে উপস্থিত হতে দেখেই সন্ধ্যায় তার কথা রাখার বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন তিনি।
এখন কিন্তু তাঁর সন্দেহ গভীর হতে শুরু করে।
সত্যিই আনার মতো মেয়ে, আজ মার্শনেস গঞ্জালেস দে সোলিস বলে যার। পরিচয়, সে তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্যে এত কষ্ট করে কোনও ঝক্কি নিতে যাবে কেন!
তাঁকে তিয়ো বলে ভক্তি শ্রদ্ধা এককালে সত্যিই করত সন্দেহ নেই। তাঁর কাছে। সে সময়ে যে স্নেহ, সাহায্য ও প্রশ্রয় পেয়েছে তার জন্যে মনে হয়তো একটু কৃতজ্ঞতাও ছিল। সেই জন্যেই তাঁর প্রথম চিঠি পেয়ে তার আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেনি।
কিন্তু তারপর একটা অভাগা বুড়ো ভিখিরির জন্যে নিজের মান-মর্যাদা যাতে খোয়াতে হতে পারে এমন ঝক্কি নেবার কী দায় তার পড়েছে। একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল তা-ই যথেষ্ট।
সোরাবিয়া তাঁর নামে এখানেও যে হুলিয়া বার করেছে তা কি আনার অজানা? স্বামীর এ শয়তানিতে তার সায় না থাক, বাধাও সে নিশ্চয় দেয়নি।
না, আনার সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হওয়ার আশা করাই সানসেদোর ভুল হয়েছে। তাঁর কাছে এককালে যত স্নেহ আদরই পেয়ে থাক, সে যে সারাবিয়ার স্ত্রী হয়েছে। এই থেকেই তার স্বরূপ বোঝা তাঁর উচিত ছিল।
অথচ আনাকে চিনে তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাওয়ার পর কত আশাই না তিনি করেছিলেন! ভেবেছিলেন তাঁর অদৃষ্টকে এইবার বুঝি তিনি রাহুমুক্ত করতে পারবেন।
আনার দেখা তিনি পেয়েছিলেন অবশ্য নেহাতই দৈবাৎ। তাকে খোঁজবার কোনও চেষ্টাই তিনি ভাগ্য বিপর্যয়ের পর করেননি।
তিনি সোরাবিয়ার খোঁজেই ভিখিরি বাউন্ডুলের বেশে শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।
সোরাবিয়া অত্যন্ত নীচ চরিত্রের ইতর জুয়াড়ি। তার মতো লোকের যে রকম। আস্তানা ও আড্ডা হতে পারে সানসেদো প্রতি শহরের সেই সব জায়গার আশেপাশেই টহল দিয়ে ফিরেছেন।
সোরাবিয়ার দেখা সেসব মহলে কোথাও না পেয়ে বিস্মিত হয়েছেন সত্যিই।
সোরাবিয়ার মতো মানুষ হঠাৎ চরিত্র শুধরে সাধুপুরুষ হয়ে উঠেছে এ তো বিশ্বাস করবার মতো কথা নয়। হাঁসকে পুকুর থেকে ঠেকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু জুয়ার আড্ডা থেকে সোরাবিয়ার সরে থাকা অসম্ভব।
বিশেষ করে তাঁর যা অনুমান তা একেবারে ভ্রান্ত না হলে সোরাবিয়ার জুয়ার মহলে এখন বড় চাঁই হিসেবেই পরিচিত হওয়া উচিত।
সে জগতে তাকে খুঁজে না পেলে আবার সে দরিয়া পার হয়ে নতুন মহাদেশে পাড়ি দিয়েছে ভাবতে হয়।
কিন্তু মেক্সিকো থেকে যে বেশ একটু দাগি হয়ে ফিরেছে তার পক্ষে আবার সাগর পাড়ি দেওয়া খুব সহজ নয়। তা ছাড়া আসলে লোকটা শুধু কপট শঠ ইতর নয়, অলস আয়েসিও বটে। নতুন মহাদেশে ভাগ্যোন্নতির ধকল সইতে সে সাধ করে পা বাড়াবে না।
তা হলে মানুষটা হঠাৎ এমন উধাও হতে পারে কী করে কাপিন সানসেদো ভেবে পাননি।
তিনি যখন শহরের আজেবাজে পাড়ায় জুয়াড়ি সোরাবিয়াকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন তখন সে যে মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস হয়ে হয়তো তাঁর চোখের সামনে দিয়েই কখনও-সখনও সাড়ম্বরে চলে গেছে তা তিনি আর কেমন করে জানবেন।
ও ধরনের রাজাগজার দিকে তখন তাঁর নজরই নেই।
সোরাবিয়াকে না দেখুন, আনাকে হঠাৎ একদিন সেভিল-এর এক গরিবানী পাড়াতেই তিনি দেখেছেন।
প্রথমে অবশ্য আনাকেও তিনি চিনতে পারেননি। ভিখিরি সাজলে তার অভিনয়টাও নিখুঁত রাখতে হয়। সানসেদো তাঁর ভবঘুরে ভিখিরির পোশাকে সে দিক দিয়ে ত্রুটি রাখেন না। তাঁর মতে ভিখিরিদের যা দস্তুর, বড় মানুষ দেখলেই সেই মতো ভিক্ষের হাত পাতেন।
গরিব পাড়া দিয়ে লাগাম ধরে নফরের ধরে নিয়ে যাওয়া জমকালো সাজের ঘোড়ায় চেপে সম্ভ্রান্ত চেহারা পোশাকের এক মহিলাকে যেতে দেখে রাস্তার আরও তাঁর মতো দু-একজন ভিখিরির সঙ্গে হাত বাড়িয়েছিলেন একটা পেসোর জন্যে।
ভিক্ষে তিনি পাননি। সম্ভ্রান্ত মহিলার নফর তাঁদের ধমকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই সময়টুকুর মধ্যেই আনাকে চিনতে সানসেদোর ভুল হয়নি।
