আনা তাঁকে অবশ্য চিনতে পারেনি। চেনবার কথাই নয়। তাচ্ছিল্য ভরে-সে তাঁর দিকে একবার চেয়েছে কি না সন্দেহ। সেই এক পলকের নজরে ভেঁড়া-খোঁড়া পোশাকের সঙ্গে ফেরার হওয়া অবধি এক মুখ দাড়ি গোঁফে যা চেহারা হয়েছে তার আড়ালে কাপিন সানসেদোকে চেনা সম্ভব নয়।
আনাকে এই অপ্রত্যাশিত ভূমিকায় দেখে সানসেদোর বিস্ময় কৌতূহল যেমন তীব্র হয়েছে, মনে আশাও জেগেছে তেমনই গভীর।
তখন আনার সঙ্গে সোরাবিয়ার দাম্পত্য সম্বন্ধের কথা তিনি জানেন না। তবু তাঁর মনে হয়েছে তাঁর জাহাজের রহস্যোদঘাটনের ব্যাপারে আনার কথাটাও তাঁর ভাবা উচিত ছিল।
আনার সম্ভ্রান্ত মহিলা হিসেবে নতুন পরিচয় জেনে তার সঙ্গে দেখা করার উপায় তারপর সানসেদোকে ভাবতে হয়েছে।
ভিক্ষে না পেয়ে যেন ক্ষুণ্ণ হয়ে রাস্তার একজনকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন, কনোথে উস্তেদ আ এসা সেনিয়েরা?
তাঁর প্রশ্নে যতটা নয় তাঁর মুখের কিনোথে শুনে লোকটা একটু কৌতুকের বাঁকা হাসি হেসে জিজ্ঞাসা করেছে, তুমি আন্দালুসিয়ার লোক নয়, কেমন?
সানসেদো নিজের ভুলটা ততক্ষণ বুঝে ফেলেছেন। কনোসের বদলে কনোথে বলে গোড়াতেই সেভিল যার প্রধান শহর সেই আন্দালুসিয়ার বাইরের লোক বলে নিজের পরিচয় ধরিয়ে দেওয়াটা তাঁর ঠিক হয়নি।
তাড়াতাড়ি ভুলটা সামলে বলেছেন, না, এখানকারই লোক, তবে কাস্তিলএ অনেকদিন কাটিয়েছি।
সে তোমার দুধে জিভের কনোথে শুনেই বুঝেছি, বলে লোকটা একটু অবজ্ঞা ভরেই হেসেছে। ভবিষ্যতে সমস্ত স্পেনের রাজভাষা যা হয়ে উঠবে তখনও তার কদর তেমন বেশি হয়নি।
আন্দালুসিয়ার কয়েকটা দন্ত্য স কাস্তিল-এর আধো আধো থ হয়ে তখন বিদ্রূপ জাগায়।
শ্রীঘনশ্যাম দাস তাঁর ভাষাতত্ত্বের গভীর জ্ঞান জাহির করে বোধহয় যথোচিত। তারিফের জন্যেই থেমেছেন, মোক্ষম সংলাপ বলতে রঙ্গমঞ্চের জাঁদরেল অভিনেতারা যেমন হাততালির সময় দেবার জন্যে থামেন।
তারিফের তাঁর অভাব হয়নি। মুগ্ধ স্তুতি ফুটে উঠেছে উদরদেশ যাঁর কুম্ভের মতো স্ফীত ভোজনবিলাসী সেই রামশরণবাবু আর মেদভারে হস্তীর মতো যিনি বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবুর মুখে চোখে।
শুধু মর্মরের মতো মস্তক যাঁর মসৃণ সেই ইতিহাসের অধ্যাপক শিবপদবাবু পাণ্ডিত্যের এ আতশবাজিতে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে জিজ্ঞাসা করেছেন অগোপন ঈষৎ অধৈর্যের সঙ্গে, স আর থ-এর মারপ্যাঁচ এখন রাখুন। আপনার সানসেদো আসলে জিজ্ঞেস করেছিল কী?
অজ্ঞ বর্বরদের প্রতি যেন করুণার দৃষ্টি বিতরণ করে দাসমশাই একটু হাসলেন। তারপর বললেন, জিজ্ঞেস করেছিল—ওই মহিলাকে কি চেনেন!
মহিলা! রাস্তার লোকটি আবার হেসে উঠেছিল কৌতুকভরে। তারপর বলেছিল—ওঁকে শুধু মহিলা ভাবছ নাকি, উনি সাধারণ সেনিয়োরা নন, দস্তুরমতো মার্শনেস। কিছুদিন হল স্বামী মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর সঙ্গে সেভিল-এর শোভা বাড়াচ্ছেন।
আমুদে আর রসিক বলে সেভিল-এর লোকের তখনই খ্যাতি ছিল। সানসেদো তাই লোকটির কৌতুকের খোঁচাগুলো গায়ে মাখেননি। আরও খোঁজখবর নিয়ে শেষ পর্যন্ত মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর আবাস খুঁজে বার করেছেন, আর সেখানেই। আনার সঙ্গে দেখা করবার সুযোগের জন্যে বাইরে ঘোরাঘুরির সময় স্বয়ং মার্কুইসকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। আনার মার্শনেস হওয়া বিস্ময়কর হলেও সোরাবিয়া-র মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস হওয়া তাঁর সত্যিই কল্পনাতীত।
সোরাবিয়াই মার্কুইস রূপে আনার স্বামী হওয়ায় ব্যাপারটা যত জটিলই হয়ে উঠুক, সানসেদোকে আনার সঙ্গে দেখা করবার চেষ্টা করতেই হয়েছে! সে বাড়ির একজন পরিচারককে ঘুষ দিয়ে আনার কাছে গোপনে একটি চিঠি পাঠাবার ব্যবস্থা করেছেন। সে চিঠিতে আনাকে সান্তা মারিয়া দে লা সেদে ক্যাথিড্রালের কাছে ইস্টারের পরবের দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ ছিল।
সে চিঠি আনা ঠিকই পেয়েছে। কিন্তু তার আগে সোরাবিয়া স্বয়ং। কারণ বাড়ির প্রত্যেকটি চাকর তার চর।
আনাকে লেখা সানসেদোর গোপন চিঠি চর পরিচারক প্রথমে তার প্রভু মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিসকেই দিয়েছিল।
মার্কুইস অর্থাৎ সোরাবিয়া সে-চিঠি পড়ে ছিঁড়ে ফেলতেও পারত। কিন্তু ছিঁড়ে সে ফেলেনি। বরং আনার হাতে সে-চিঠি পৌঁছে দেবার হুকুমই দিয়েছিল তার পরিচারককে। ” ” আনা চিঠি পড়ে সানসেদোর সঙ্গে দেখা হবার আশায় সান্তা মারিয়া দে লা সেদে ক্যাথিড্রালে গেলে তাকেই টোপ করে সানসেদোকে নিজের হাতে ধরবে এই ছিল সোরাবিয়ার ফন্দি। এইজন্যেই গাঁইয়া চাষির ছদ্মবেশে সে আনাকে অনুসরণ করে ফিরেছে সেদিন।
তার সে-ফন্দি যে সফল হয়নি, তা আমরা জানি।
সফল না হবার কারণ এই যে, কাপিন সানসেদোও আগে থাকতে সাবধান হয়ে গিয়ে আনার সঙ্গে ক্যাথিড্রালের কাছে দেখা করবার কোনও চেষ্টা করেননি।
আনাকে অবশ্য তিনি চোখে চোখে রেখেছিলেন দূর থেকে, আর তারই দরুন আনা না পারলেও সোরাবিয়ার ছদ্মবেশ গোড়াতেই ধরে ফেলেছিলেন আনার পিছনে তার লেগে থাকবার ভঙ্গি দেখে।
কাপিন সানসেদো আগে থাকতে সাবধান হতে পেরেছিলেন সোরাবিয়ার অতিরিক্ত উৎসাহের দরুন। সানসেদোকে ধরার আগ্রহাতিশয্যে সে তাঁর চিঠি পড়বার পরই সেভিল-এর কোতোয়ালিকে সজাগ করে দিয়ে সেখান থেকে সানসেদোর নামে হুলিয়া বার করাবার ব্যবস্থা করে।
তেঁড়া পিটে সে-হুলিয়ার কথা শহরে জানানো হয় বলেই কাপিন সানসেদো আগে থাকতে সোরাবিয়ার ফন্দি সম্বন্ধে সাবধান হবার সুযোগ পান।
০৯. সোরাবিয়ার শয়তানি ফন্দি
সোরাবিয়ার শয়তানি ফন্দি এড়িয়ে আনার সঙ্গে কয়েক মুহূর্তের আলাপে সান মার্কস-এর মিনারের নীচে গোপন সাক্ষাতের যে ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন, তা ব্যর্থ হওয়ায় একান্ত হতাশ ও ক্ষুব্ধ হওয়া সানসেদোর পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু আনার প্রতিশ্রুতিভঙ্গের কারণ তিনি যা ভেবেছিলেন তা ভুল। নিজের আগ্রহেই কথা দিয়েও আনা কেন যে তা রাখতে পারেনি, তা কল্পনা করাও সানসেদোর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
