করেননি সত্যিই। জ্যোতিষবিদ্যার হাতেখড়ি যাঁর কাছে তাঁর হয়েছিল এ তাঁর সেই গুরুরই আদেশ।
মৃত্যুর আগে নিজের বিদ্যা যতখানি সম্ভব সানসেদোকে দান করে এই অলঙ্ঘ্য নির্দেশই তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন যে নিজের ভবিতব্য নির্ধারণের জন্যে এ-বিদ্যা কখনও যেন তিনি প্রয়োগ না করেন।
সানসেদো তখন অবশ্য বিস্মিত হয়েছিলেন এ আদেশে। একটু ক্ষুণ্ণও বোধহয়।
আপনি নিজে তো আপনার বিধিলিপি সম্পূর্ণ জানেন বলেই মনে হয়। তা হলে আমার প্রতি কেন এ নির্দেশ? জিজ্ঞাসা করেছিলেন সেই আশ্চর্য প্রৌঢ়কে।
তোমার প্রতি এ-নির্দেশ প্রথমত বিদ্যা তোমার অসম্পূর্ণ বলে, বলেছিলেন স্থৈর্যের প্রতিমূর্তি সেই সৌম্য মানুষটি, এ খণ্ডিত বিদ্যা নিজের জন্যে প্রয়োগ করলে অকারণ উদ্বেগ আর অশান্তিকেই নিত্যসঙ্গী করে শুধু নিজেকে নিয়েই তুমি তন্ময় থাকবে। এ বিদ্যা তা হলে হবে নিষ্ফলা।
একটু থেমে তিনি আবার প্রশান্ত গভীর স্বরে বলেছিলেন, এ বিদ্যা তোমার সম্পূর্ণ হলেও নিজের ভাগ্যলিপি পাঠ করার বিষয়ে এই নিষেধই তোমায় জানাতাম।
কেন?সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন সানসেদো, সম্পূর্ণ বিদ্যা নিয়ে আপনি কি নিজের অদৃষ্টলিপি আদ্যোপান্ত পাঠ করেননি?
তা করেছি। স্নিগ্ধ করুণ অপরূপ একটি হাসি ফুটে উঠেছিল সেই আশ্চর্য মানুষটির মুখে। ধীরে ধীরে তিনি বলেছিলেন, কিন্তু নিজের নিয়তি নির্ভুলভাবে জেনেও জীবনের ভার অকাতরে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাওয়ার কঠিনতম পরীক্ষা সকলের জন্যে নয়। যতটুকু বিদ্যা পেয়েছ অপরের জন্যে যথাসাধ্য প্রয়োগ করে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বদলে নিজের বেলা প্রত্যক্ষ বর্তমান নিয়েই ব্যাপৃত থেকো।
সানসেদো গুরুর সেই নির্দেশই একান্ত বাধ্যতার সঙ্গে পালন করে এসেছেন।
প্রলোভন যে আসেনি তা নয়, দুর্বলতাও হয়েছে। কিন্তু তা তিনি জয় করেছেন শেষ পর্যন্ত।
এবার এসপানিয়ার মাটি ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস্য নিদারুণ ভাগ্যবিপর্যয়ের পর নিজের সম্বন্ধে অটল থাকা বুঝি সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সে কঠিন পরীক্ষায়ও তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। ব্যাকুলতা যত তীব্ৰই হোক গণনার সাহায্যে নিজের ভবিষৎ জানবার চেষ্টা তিনি করেননি, সামনে যা উপস্থিত সেই ঘটনাপ্রবাহ থেকেই নিজের গতিবিধি ও কর্তব্য নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন।
মেদেলিন শহর থেকে নিরুদ্দেশ হবার পর যে কোনও মুহূর্তে ধরা পড়বার আশঙ্কা সত্ত্বেও একটি লক্ষ্য নিয়ে এসপানিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত সমস্ত শহর বাউণ্ডুলে ভিখিরির সাজে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন।
সে লক্ষ্য হল তাঁর বিরুদ্ধে অতবড় মিথ্যা অভিযোগ যে সাজিয়েছে তাকে খুঁজে বার করা।
তাকে খুঁজে বার করলেই অবিশ্বাস্যভাবে তাঁর জাহাজের বন্ধ সিন্দুকের ঐশ্বর্য লোপাট হবার রহস্য ভেদ করা সম্ভব হবে কি না সানসেদো জানেন না, কিন্তু তাঁর কল্পনাতীত ভাগ্যবিপর্যয়ের মূল কারণে পৌছোবার আর কোনও উপায় তিনি ভেবে পাননি।
এক ছদ্মবেশী ক্রীতদাসের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সম্রাটের উদ্দেশ্যে ্পাঠানো মহামূল্য। সব নতুন মহাদেশের সম্পদ চুরি করেছেন বলে সাংঘাতিক অভিযোগ কাপিতান সানসেদোর বিরুদ্ধে সাজিয়েছিল কে, তা বোধহয় আর বলতে হবে না।
যার সঙ্গে বিশেষ প্রীতির সম্পর্কের দরুনই সানসেদো গভীরভাবে সন্দেহভাজন, এসপানিয়ার বন্দরে জাহাজ ভেড়বার পর রহস্যজনকভাবে পলাতক সেই ছদ্মবেশী ক্রীতদাসই বা কে, তা-ও সম্ভবত এখন কারও অগোচর নয়।
ক্রীতদাস আর কেউ নয়, সেই ঘনরাম দাস আর কাপিন সানসেদোর বিরুদ্ধে অভিযোক্তা হল ঘনরাম দাসের কাছে জুয়ায় জুয়াচুরির চেষ্টায় চরম শিক্ষা-পাওয়া সেই সোরাবিয়া, মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস বলে এসপানিয়ার খানদানি সমাজে যে এখন পরিচিত।
কিন্তু মেক্সিকো বিজয়ী কর্টেজ-এর নিজের স্বাক্ষরিত মুক্তিপত্র সত্ত্বেও ঘনরাম দাসকে আবার ছদ্মবেশে ক্রীতদাসের পরিচয় লুকোবার শাস্তি এড়াতে পলাতক হতে হয় কেন?
নিজেকে রমণীমোহন মনে করার গর্বে আত্মহারা, অসাধু, অপদার্থ জুয়াড়ি সোরাবিয়াই বা মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস হয়ে ওঠে কী করে?
এ দুই রহস্য হয়তো একসঙ্গেই জড়ানো। একটির সমাধান হলেই আর একটির উত্তর আপনা থেকে মিলে যাবে।
বাউন্ডুলে ভিখিরির বেশে কাপিন সানসেদো সেই আশাতেই সান মার্কস-এর মিনারের তলায় আনার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে ব্যাকুলভাবে এদিকে প্রায় নির্জন হয়ে আসা সেভিল-এর সংকীর্ণ রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেন।
আনা-র সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছে মাত্র সম্প্রতি। সে যে এখন সামান্য আনা নয়, মার্শনেস গঞ্জালেস দে সোলিস এই সংবাদই তাঁর কাছে বিস্ময়কর। কিন্তু তার। চেয়ে বড় বিস্ময় হল আনার স্বামী মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর আসল পরিচয়। এই জমকালো খানদানি উপাধির আড়ালে সোরাবিয়াই যে গা ঢাকা দিয়ে আছে তা তিনি আগে কল্পনা করতে পারেননি।
এসপানিয়ার শহরে শহরে ঘুরেও কেন যে সোরাবিয়ার খোঁজ এতদিন তিনি পাননি এই সেভিল শহরে এসে আকস্মিকভাবে আনা-র সঙ্গে দেখা হবার পরই তিনি। প্রথম বুঝতে পেরেছেন। তিনি যেখানে সোরাবিয়াকে সন্ধান করে ফিরেছেন মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস সে জগতের মানুষ আর নয়।
আনার সঙ্গে দৈবাৎ সেভিল-এর একটি রাস্তায় দেখা না হয়ে গেলে সোরাবিয়ার নামের এ রূপান্তর তাঁর কাছে অজানাই থেকে যেত। আনাকে তাঁর নতুন আভিজাত্যের চেহারা পোশাকে দেখে বিস্মিত হলেও সানসেদো সেই সঙ্গে অত্যন্ত খুশিও হয়েছেন। তিনি যখন সোরাবিয়াকে অধীরভাবে খুঁজে ফিরছেন তখন আনা যে আবার তাঁরই সন্ধানে ব্যাকুল এইটুকু তাঁর জানা ছিল না।
