এসপানিয়া ছেড়ে নতুন মহাদেশে পালাতে পারলে এ অভিশাপ হয়তো এড়ানো সম্ভব। কিন্তু নতুন মহাদেশে জাহাজ যা যায় তা নেহাত গোনাগুনতি। অপরাধীদের দেশ ছেড়ে পালাবার সুযোগ সে সব জাহাজে বন্ধ করবার জন্যেই বন্দরে বন্দরে কড়াকড়িটা একটু বেশি। সাধারণ চোরছ্যাঁচড় সে কড়াক্কড়ির ভেতর দিয়ে গলে যেতে পারলেও, তাঁর মতো স্বয়ং সম্রাটের কাছে যারা অপরাধী তাদের সে আশা নেই। বন্দর-কোতোয়ালদের শ্যেনচক্ষু তাদের জন্যেই সারাক্ষণ সজাগ হয়ে আছে।
অন্য কোনও উপায় যখন নেই, রাজদ্বারেই আত্মসমর্পণ করে তাঁর বিরুদ্ধে যা অভিযোগ তা খণ্ডন করাবার চেষ্টা কি তিনি করতে পারেন না?
কেমন করে করবেন? নিজের স্বপক্ষে কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণই যে তাঁর নেই। সত্যিই তিনি যে এক হিসেবে হাতে হাতে ধরা পড়েছেন।
একান্ত বিশ্বাসে তাঁর জিম্মায় মেক্সিকো থেকে এসপানিয়ায় সম্রাট পঞ্চম চার্লস-এর রাজকর ও উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো প্রচুর সোনাদানা ও মহামূল্য রত্নসম্পদের অধিকাংশ তাঁর জাহাজের গোপন সুরক্ষিত সিন্দুক থেকে কীভাবে খোয়া গেছে সানসেদো তার কোনও কৈফিয়ত দিতে পারেননি।
এসপানিয়ার বন্দরে নামবার আগে জাহাজের সিন্দুকে রাখা ধনরত্নের হিসাব মেলাতে গেলে এই সর্বনাশা তসরুফের ব্যাপারটা তিনি আগেই টের পেতেন। তখন তাঁর হয়তো এ চুরির রহস্য ভেদ করবার কিছু উপায় থাকত।
কিন্তু জাহাজের ওপর আর-এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায় তুমুল আলোড়ন তখন চলছে। বন্দরে ভেড়াবার আগে সিন্দুক খুলে দেখবার সময়ই তিনি পাননি।
বন্দরে জাহাজ লাগাবার পর সম্রাটের খাজাঞ্চিখানার কর্মচারীদের কাছে সিন্দুক খুলে হিসেব মিলিয়ে দিতে গিয়েই সাংঘাতিক ঘাটতিটা ধরা পড়েছে।
কাপিন সানসেদো এসপানিয়া সাম্রাজ্যের অনেক দিনের অত্যন্ত বিশ্বাসী নাবিকপ্রধান। ব্যাপারটা যত গুরুতরই হোক সন্দেহক্রমে তাঁকে বন্দি করার কোনও প্রশ্নই বন্দরের কোনও রাজপুরুষের মনে তাই ওঠেনি। কাপিন সানসেদো তাঁর। নিজের বিবৃতি দিয়ে বিমূঢ় বিহ্বলভাবে তাঁর মেদেলিন শহরের বাড়িতে ক-দিনের জন্যে ঘুরে আসতে গিয়েছেন। ফিরে এসে তাঁর যা বক্তব্য রাজদরবারেই তিনি পেশ করবেন এই স্থির হয়েছে।
রাজদরবারে কৈফিয়ত দেবার জন্যে আর তিনি ফিরে আসেননি। মেদেলিন শহর থেকেই একদিন হঠাৎ তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন।
নিরুদ্দেশ না হয়ে তাঁর উপায়ও ছিল না। মেদেলিন শহরে নিজের বাড়িতে যাবার পরদিনই তাঁর জাহাজে অত্যন্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত এক মাল্লার মারফত তাঁর বিরুদ্ধে কী সর্বনাশা ষড়যন্ত্র যে হয়েছে তা তিনি জানতে পেরেছেন। জানতে পেরেছেন যে স্বয়ং সম্রাটের স্বাক্ষরিত পরোয়ানা নিয়ে সওয়ার সেপাই আসছে মেদেলিনের কোতোয়ালিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করাবার জন্যে।
তখনও কি তিনি নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করবার জন্যে এই অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারতেন না?
না, তা সম্ভব ছিল না। পৃথিবীর সর্বত্রই তখন ন্যায়বিচারের ধারণা অত্যন্ত অস্পষ্ট। বিচারের ফলাফল বেশির ভাগই দৈবাধীন।
তা ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে যে সাংঘাতিক অভিযোগ করা হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন সত্যিই তা খণ্ডন করবার মতো কোনও বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি-প্রমাণ উপস্থিত করতে তিনি তখন অক্ষম।
জাহাজের গুপ্ত সিন্দুক তাঁরই জিম্মায় ছিল। তার চাবি নিজের কাছছাড়া করাও তাঁর পক্ষে অপরাধ। সে সিন্দুক থেকে ওই সব অমূল্য সম্পদ তিনি নিজে ছাড়া আর কে সরাতে পারে?
সরিয়ে তিনি রাখবেন কোথায়? তিনি তো ঝাড়া হাত-পা জাহাজ থেকে নেমে সেই অবস্থাতেই মেদেলিনে গিয়েছেন!
সানসেদোর প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস যাদের তখনও টলেনি তারা কেউ কেউ ওই প্রশ্ন তুলেছে।
কিন্তু সানসেদোর বিরুদ্ধে ওই ভয়ংকর অভিযোগ যে সাজিয়েছে, জবাব দিতে তার দেরি হয়নি।
কাপিন সানসেদো নিজে সরিয়ে রাখবেন কেন! তিনি তাঁর দোসর সেই গোলামটার হাত দিয়ে সব চুরির মাল পাচার করে সাধু সেজেছেন। তাঁর যোগসাজস থাকলে বন্দরের ওই কড়া পাহারার ভেতর দিয়ে সে গোলাম পালাতে পারে? এ ষড় যে তিনি অনেক আগেই করেছিলেন জাহাজে গোলামটার সঙ্গে তাঁর গলাগলি দেখেই তা বোঝা গেছল।
এ-সব যুক্তি সাজাবার গুণে একেবারে অকাট্য বলে মনে হয়েছে। এর ওপর আর। বলবার মতো কথা কেউ পায়নি। কাপিন সানসেদোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁর জাহাজ থেকে একটা ছদ্মবেশী গোলামের রহস্যজনকভাবে উধাও হওয়ার দরুনই। অখণ্ডনীয় হয়ে উঠেছে।
ক্রীতদাস বলে ধরা পড়বার পর একজন যে তাঁর জাহাজ থেকে পালিয়েছিল। একথা তো মিথ্যে নয়। তাঁর সঙ্গে সেই ছদ্মবেশী গোলামের যথেষ্ট সম্প্রীতি যে ছিল তাও জাহাজের যাত্রীমাত্রেই দেখেছে।
সুতরাং আত্মসমর্পণের চেষ্টা তাঁর বৃথা। ঘটনাচক্র সম্পূর্ণ তাঁর বিপক্ষে বুঝে সানসেদো নিঃশব্দে নিরুদ্দেশ হওয়াই শ্রেয় মনে করেছেন।
তার ফলে প্রাণে এখনও বেঁচে আছেন বটে, কিন্তু রাজরোষে যথাসর্বস্বই তাঁকে হারাতে হয়েছে। পালিয়ে যাবার দরুন তাঁর অপরাধ আরও অভ্রান্তভাবে প্রমাণিত বলে যে ধরা হবে তা তিনি জানতেন। তবু এ ছাড়া আর কোনও উপায় তাঁর ছিল না।
সানসেদো তো সুদূর উদয়সমুদ্রের এক ঐশ্বর্যময় দেশের আশ্চর্য জ্যোতিষবিদ্যা। কিছুটা শেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন। ঘনরামের ভবিষ্যৎ তিনিই গণনা করে বলে দিয়েছিলেন অনেকখানি। অন্যের ভাগ্যলিপি যিনি অমন নিপুণভাবে পড়েছেন নিজের অদৃষ্ট জানবার কোনও চেষ্টা কি তিনি করেননি।
