নগরের পথে পথে পিজারোর বন্দিত্বের বিবরণ যে সেদিন নানা জটলায় দিয়ে ফিরেছে সে মানুষটাই বা কে?
বন্দর থেকে ক্লামাটির সঙ্গে আশ্চর্য দেশের অন্যতম জীবন্ত প্রমাণ হিসেবে সুদূর টম্বেজ থেকে আনা একজন আদিবাসীও কেমন করে নিখোঁজ হয়েছিল, পিজারোর সঙ্গী পেড্রো দে কানডিয়া তার কিনারা করতে পারেননি।
গ্লামাটি শেষ পর্যন্ত ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে সেভিল-এর রাস্তায় ধরা পড়েছিল। কিন্তু সেই আদিবাসীর কোনও সন্ধান আর মেলেনি।
সম্পূর্ণ অপরিচিত এক দেশের শহরে অজ্ঞ অসহায় একজন ভিন্নজগতের আদিবাসী ওভাবে উধাও হয়ে কোথায় যেতে পারে?
দাসমশাই একটু থামতেই মস্তক যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ সেই শিবপদবাবু একটু বাঁকা হাসির সঙ্গে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শ্রীঘনশ্যাম দাস সে-সুযোগ তাঁকে দিলেন না।
শিবপদবাবুর মুখের হাসিটা বাঁকা থেকে সোজা করে একেবারে বিমূঢ়তায় পৌঁছে দিয়ে দাসমশাই বললেন, আপনি যা বলতে চাইছেন, তা জানি। এসব প্রশ্নের জবাব আমি যা দেব, সরকারি ইতিহাসে তা পাবেন না ঠিকই। তবে বিখ্যাত স্থপতি হেরেরা-র তৈরি লঙ্কা-র নাম শুনেছেন? তার লাল বাদামি মার্বেল পাথরের সিঁড়ি দিয়ে আচিতভা দে ইনদিয়াস-এ গিয়েছেন কখনও? সেখানে গেলে স্পেনের আদি আবিষ্কারক অভিযাত্রীদের সম্বন্ধে ত্রিশ হাজার বিরল প্রাচীন পুঁথি পাবেনা, সেসব পুঁথির অনেকগুলি এখনও যে পরীক্ষাই করা হয়নি আপনার ইতিহাসের পণ্ডিতদের জিজ্ঞাসা করলেই তা জানতে পারবেন। সেসব পুঁথির পাঠ উদ্ধার হলে স্পেনের
ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে এইটুকু জেনে রাখুন।
শিবপদবাবুকে নির্বাক করে দিয়ে শ্রীঘনশ্যাম আবার শুরু করলেন—সান মার্কস-এর মিনারের কাছে আনার সঙ্গে সন্ধের সময় দেখা করবেন বলেছিলেন সানসেদো। শহরের অন্য সব রাস্তাঘাটে সন্ধ্যায় উৎসবে মত্ত নর-নারীর ভিড় বাড়বে ভয় করেই মুসলিম মিনারের কাছাকাছি নির্জন জায়গা তিনি বেছে নিয়েছিলেন আনার সঙ্গে গোপন সাক্ষাতের জন্যে।
সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে সেকালের সেভিল-এর বেশির ভাগই সংকীর্ণ আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে সান মার্কস-এর মিনারের দিকে যেতে যেতে সানসেদো রাস্তায় তেমন কোনও ভিড় কিন্তু দেখতে পান না।
প্রথমটা একটু অবাক হলেও রাস্তাগুলো এমন ফাঁকা হওয়ার কারণটা তিনি অনায়াসেই বুঝতে পারেন। ইস্টার উৎসবে যে জনস্রোত নানাদিক থেকে শহরে এসে মিলেছিল তার গতি এখন অন্যদিকে! শহরের ভেতর থেকে বেশির ভাগ জনতা এখন সেভিল-এর বন্দরে গিয়ে জমায়েত হয়েছে।
বেশির ভাগ নাগরিকই সেখানে গেছে নতুন অজানা রহস্য রাজ্য থেকে আশ্চর্য সব জিনিস আর জানোয়ার নিয়ে বন্দরে নেমেই দেনার দায়ে যিনি বন্দি হয়েছে, সেই পিজারো সম্বন্ধে কৌতূহলী হয়ে।
পিজারোর কিংবদন্তি যারা কিছু কিছু আগে শুনেছে তাদের সঙ্গে নামটা যাদের কাছে একেবারে অজানা, তারাও যোগ দিয়েছে শহরের রাস্তাঘাটের অদ্ভুত কয়েকটা। রটনার উত্তেজনায়। বিকট আজগুবি এক জানোয়ারের সামনে পড়ার ভয়েও সন্ধ্যার পর শহরের মাঝখানে বেশি কেউ আসতে সাহস করেনি।
আলকাজার প্রাসাদের ধারে দুপুরে আনার কাছে তাড়াতাড়ি বিদায় নেবার পর সানসেদো এই অদ্ভুত জানোয়ারটির রহস্য জানবার জন্যে খোঁজখবর নিয়ে আরও অনেকের মতো পিজারোর সমস্ত বিবরণই পেয়েছেন।
সত্যি কথা বলতে গেলে এ ব্যাপারে খুব বেশি উত্তেজিত হবার কারণ তিনি পাননি। আর পাঁচজন দুঃসাহসী অভিযাত্রীর থেকে পিজারোর কিছু তফাত আছে সন্দেহ নেই। এ পর্যন্ত যা আবিষ্কৃত হয়েছে তা থেকে আরও অজানা বিচিত্র কোনও রাজ্যের সন্ধান যে পিজারো পেয়েছেন ওই অদ্ভুত জানোয়ারটি তার প্রমাণ। কিন্তু নতুন মহাদেশে এখনও অনেক রহস্য-বিস্ময় আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকারই তো কথা। শুধু ওই জানোয়ারটি দেখেই পিজারোর কীর্তি সম্বন্ধে কোনও ধারণা করা তাই উচিত নয়।
পিজারোর বন্দি হওয়ার দুর্ভাগ্যটা সত্যি অবশ্য শোচনীয়। কিন্তু তাঁদের সময়কার দুনিয়ার হালই তো এই। বিশেষ করে নিজেদের জীবন নিয়ে অজানা মুল্লুকে যারা ভাগ্যের সঙ্গে জুয়া খেলার সাহস করে তাদের ক্ষণে হাতে দড়ি ক্ষণেকে চাঁদ-এর মতো নসিব তো মেনে নিতেই হবে। তাঁর নিজের দুর্ভাগ্যটা কি কম নিদারুণ? ছিলেন এসপানিয়ার রাজদরবারের একান্ত বিশ্বাসী মান্যগণ্য একজন কাপিন। সৎ ও কর্তব্যনিষ্ঠ বলে এমনই ছিল তাঁর সুনাম যে সম্রাটের খাজনা ও নজরানার সোনাদানা মেক্সিকো থেকে এসপানিয়ায় বয়ে নিয়ে আসার ভার তাঁকেই দেওয়া হয়েছে বার বার।
সেই তাঁকেই আজ ফেরারি হয়ে বাউণ্ডুলে ভিখিরি সেজে চোরের মতো পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে শহর থেকে শহরে। তাঁর নিজের মেদেলিন শহরের বাড়িঘর সব নিলেম হয়ে গেছে। সেখানে কোয়ালির সেপাইরা তাঁকে খুঁজছে গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে।
সে শহর থেকে পালিয়ে এসেও তাঁর নিস্তার নেই। রাহুর মতো একজন দুশমন তাঁর পেছনে লেগে আছে। এই শহরেও তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া বার করিয়েছে সে। এ শহরে সুতরাং বেশিক্ষণ থাকা তাঁর পক্ষে নিরাপদ নয়। এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে যাওয়াই ভাল।
কিন্তু কোথায় বা যাবেন! এসপানিয়ার যেখানেই যান ভয়ে ভয়ে তাঁকে লুকিয়ে ফিরতে হবে। তাতেও আর ক-দিন রেহাই পাবেন! অনিবার্য অভিশাপের মতো এ হুলিয়া তাঁর পিছনে লেগে থাকবেই।
