তা কেউ ধরছে না কেন এখনও! এ জানোয়ার যে এনেছে সে-ই বা করছে কী? এত অসাবধান সে হয় কেন?
সে আর কী করবে! সে তো শুনছি কয়েদ হয়েছে বন্দরে পা দিতেনা-দিতে পুরনো দেনার দায়ে।
দেনার দায়ে কয়েদ!
জনতার মধ্যে এই শুনেই আর-এক ধরনের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সুদখোর মহাজনদের ওপর সে যুগের মানুষের ঘৃণা আক্রোশ কিছু কম ছিল না। বিশেষ করে জীবনমরণ তুচ্ছ করে যারা নতুন মহাদেশ আবিষ্কারে সর্বস্ব পণ করছে তাদের প্রতি মুগ্ধ শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি তখন এত বেশি যে কোনও মহাজনের হাতে তাদের একজনের নিগ্রহ জনতাকে ক্রমশ অস্থির ক্রুদ্ধ করে তুলেছে।
কাকে কয়েদ করেছে, কাকে? এই অজানা নতুন মুল্লুক থেকে কে এনেছে এই অদ্ভুত জানোয়ার? উত্তেজিত জিজ্ঞাসা শোনা গেছে নানা জটলায়।
এনেছেন ফ্রানসিসকো পিজারো! বন্দরে পা দিয়ে তিনিই হয়েছেন বন্দি।
ফ্রানসিসকো পিজারো!
অনেকের কানেই নামটা একেবারে নতুন শোনায়নি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, এ নামটা তো একটু-আধটু তাদের কানেও পৌঁছেছে। বিশেষ করে দারিয়েন পানামা থেকে যে সব জাহাজ দেশে ফেরে তাদের কোনও কোনও মাঝিমাল্লা গল্প করেছে এক রূপকথার দেশের মতো আজগুবি রাজ্যের। সে রাজ্য খোঁজার দুঃসাহসিক অভিযানের যারা নায়ক তাদের নাম শোনা গেছে এইসব নাবিকদের মুখে। কখনও অবজ্ঞায় বিদ্রূপে, কখনও মুগ্ধ বিস্ময়ে। তার মধ্যে সবচেয়ে যাঁর নাম বেশি করে রটেছে, তিনি হলেন ফ্রানসিকো পিজারো।
সেই ফ্রানসিসকো পিজারো দেনার দায়ে বন্দি? কে তাকে বন্দি করেছে?
করেছে ব্যালির এনসিসো।
তা দেনা মিটিয়ে দিলেই তো হয়।
মেটাবে কী করে? জানপ্রাণ কবুল করে নতুন দেশ যারা খোঁজে তাদের নিজের বলতে কিছু থাকে কি। অভিযানের পেছনেই সব কিছু ঢেলে তারা তো ফতুর। ব্যাচিলর এনসিসোর কাছে দেনাও তো কম নয়। প্রায় কুড়ি বছর আগের তিল প্রমাণ দেনা সুদে কেঁপে দশ-বিশটা তাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে দেনা শোধ করবার মতো সম্বল পিজারোর নেই। তাই এখন তাঁকে যতদিন বাঁচেন জেলেই পচে মরতে হবে।
জেলেই পচে মরতে হবে। অসহায় আক্রোশ ফুটে উঠেছে নানাজনের গলার স্বরে— কেন, কেউ কি নেই তাঁর জামিন হয়ে দাঁড়াবার!
কে দাঁড়াবে তাঁর হয়ে! সত্যি সে ক্ষমতা যাদের আছে সেই বড়মানুষরা লাভের আশা যাতে অনিশ্চিত তেমন দায় কি ঘাড়ে নয়? এখনও তো তিনি কাম ফতে করে আসতে পারেননি! ফ্রানসিসকো পিজারো দুবারের পর তিনবারের অভিযানের খরচা জোগাড় করতে পারেননি বলেই স্বয়ং সম্রাট পঞ্চম চার্লস-এর কাছে আসছিলেন তাঁর অনুগ্রহ ভিক্ষা করতে। কিন্তু এখন সম্রাটের কাছে তাঁর খবরই পৌঁছোবে না। আশ্চর্য দেশের সামান্য যে সাক্ষীপ্রমাণ পিজারো সঙ্গে এনেছেন তা কে গাপ করবে কে জানে?
না, কিছুতেই তা হতে দেব না! আজগুবি জনোয়ারটার ছোটাছুটি এবার আতঙ্কের বদলে একটা কঠিন সংকল্পই জাগিয়েছে নানা জায়গায় ছোট ছোট দলের মধ্যে।
পিজারোকে দেনার দায়ে কয়েদ করার খবর সম্রাটের দরবারে পৌঁছে দিতেই। হবে। প্রতিজ্ঞা করেছে অনেকে।
ব্যাচলর এনসিসো-র মতো একটা চামার মহাজনের জুলুমে এতবড় একজন সাহসী বীরের সব চেষ্টা কিছুতেই পণ্ড হতে দেওয়া হবে না। এই কথাই শোনা গেছে। বহুজনের মুখে।
তাদেরই কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে উঠেছে পিজারোর খবর যার কাছে পাওয়া গেছে তার বিষয়েও।
কিন্তু আপনি এত কথা জানলেন কী করে? জিজ্ঞাসা করেছে দু-একজন।
আমি? মানুষটা একটু হেসেছে। তারপর যা উত্তর দিয়েছে তা সব জায়গায় এক নয়।
কোথাও বলেছে, আমি জানব না তো জানবে কে? আমি যে পিজারোর সঙ্গে এক জাহাজেই আসছি।
লোকে একটু অবাক হয়ে মানুষটাকে একটু বেশি করে লক্ষ করেছে এবারে।
হ্যাঁ, মানুষটাকে আগে এ শহরে দেখেছে বলে কারও মনে পড়ে না। লোকটার চেহারা পোশাকও একটু কেমন আলাদা। নেহাত ইস্টারের উৎসবের দিন বলেই এতক্ষণ তেমন চোখে পড়েনি।
লোকটার ভাল করে খবরাখবর নেওয়ার কিন্তু সুযোগ মেলেনি কারওই। তার আগেই কেমন করে ভিড়ের সঙ্গে মিশে লোকটা যেন হারিয়ে গিয়েছে। দেখা গিয়েছে তাকে আবার আর-এক দলে। সেখানেও পিজারোর বন্দি হওয়ার খবরটা একটু হেরফের করে শুনিয়েছে সে।
বেশির ভাগ জায়গায় প্রশ্নটা ঘুরে তার নিজের সম্বন্ধেই ওঠবার আগেই সে হাওয়া। হয়ে গিয়েছে। যেখানে তা সম্ভব হয়নি সেখানে কোথাও বলেছে বন্দর থেকে টাটকা খবর শুনেই সে আসছে। কোথাও নিজেকে পিজারোর জাহাজের মাল্লা বলে চালিয়েছে। কোথাও বা তারই অনুচর।
এ মানুষটার আসল পরিচয় সম্বন্ধে দু-একজন একটু সন্দিগ্ধ যে না হয়েছে তা নয়।
কিন্তু পিজারো সম্বন্ধে উত্তেজনা সহানুভূতি ও উৎসাহ ক্রমশ দুর্বার হয়ে উঠেছে। সমস্ত সেভিল শহরে সাড়া পড়ে গেছে তখন।
পিজারোকে কয়েদখানা থেকে ছাড়াতেই হবে। ব্যালির এনসিসো যদি তাঁকে নিজে থেকে না মুক্তি দেয়, তা হলে খোদ সম্রাটের কাছে তার জুলুমের খবর না। পৌঁছে দিয়ে তারা ছাড়বে না।
সেভিল শহরের এ দৃঢ়সংকল্পের মূলে আছে অজানা অদ্ভুত একটা প্রাণীর। আকস্মিক আবির্ভাব। বন্দরে পিজারোর জাহাজ থেকে নামাবার সময় এই মাটি। ছাড়া পেয়ে না পালালে অমন সচকিত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে সেভিল-এর নাগরিকেরা সেইদিনই পিজারোর দুর্ভাগ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়ে তার প্রতিকারে তৎপর নিশ্চয় হত না। মাটি কেমন করে ছাড়া পেল? কে তাকে ছেড়ে দিয়েছিল?
