আলকাজার প্রাসাদের কোল দিয়ে তখন ভীত বিশৃঙ্খল জনতার স্রোত বইছে। তারই ভেতর এক পাশে একটু সরে দাঁড়িয়ে যিনি তাকে বুকে ঈষৎ ভর দেবার সুযোগ দিয়ে ধরে আছেন, তাঁকে দেখে প্রথমটা মার্শনেস সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে।
এ কোন অজানা অচেনা একটা বুড়ো বাউণ্ডুলে ভিখিরি তাকে ধরে আছে?
ঝটকা দিয়ে সরে আসতে গিয়ে ভিখিরিটার মুখের হাসি দেখেই মার্শনেসকে একটু থমকে যেতে হয়।
জট পড়া সাদা কালো দাড়ির ফাঁকের হাসিটা তার যেন চেনা।
পরমুহূর্তেই আবার ভিখিরীটার বুকের ওপরই মাথা গুঁজে রেখে মার্শনেস উচ্ছ্বসিত গলায় বলে ওঠে, তিয়েন! তুমি? আমি যে তোমায়
বাউণ্ডুলে ভিখিরি চেহারার লোকটি চাপা গলায় এবার বলে, চুপ! তারপর বেশ একটু জোর করেই মার্শনেসকে দূরে ঠেলে দিয়ে জনতার স্রোতে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে এগিয়ে যায়।
এক মুহূর্তের জন্যে একটু চমক লাগলেও মার্শনেস আর অবাক হয় না।
বাউণ্ডুলে ভিখিরি চেহারার লোকটিকে চিনতে তার ভুল হয়নি। মানুষটা যে তার। পাতানো তিয়া অর্থাৎ কাকা, কখনও কখনও আদর করে যাকে সে তিয়েন বলে, সেই কাপিন সানসেদো সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
কেন যে কাপিন সানসেদো তাকে অমনভাবে ঠেলে সরিয়ে ভিড়ের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছে মার্শনেস তখন তাও বুঝে নিয়েছে।
শহরের ক-জন পাহারা সেপাই তাদের পাশ দিয়েই তখন ছুটে যাচ্ছে। কাপিন সানসেদোর সন্ধানে অবশ্য তারা ছুটছে না। তবু সাবধানের মার নেই বলেই সানসেদো। নিশ্চয়ই মার্শনেসকে ঠেলে দিয়ে সরে গেছেন।
মার্শনেস-এর মতো সম্ভ্রান্ত পোশাক ও চেহারার সুন্দরী এক মহিলাকে একটা হাঘরে ভিখিরির সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ হতে দেখলে পাহারাদারদের পক্ষে সন্দিগ্ধ হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু রাস্তার ধারের এরকম অদ্ভুত কোনও দৃশ্যও লক্ষ করবার মতো অবস্থা তাদের বোধহয় তখন নয়।
রাস্তার জনতা যে কারণে তখন উত্তেজিত, ভয়ার্ত, পাহারাদার সেপাইরাও অস্থির ও শশব্যস্ত সেই কারণেই।
মনের মধ্যে সেই একই আতঙ্ক বিহ্বলতা নিয়েও মার্শনেস জন-প্রবাহের মধ্যে তার তিয়েনকে অনুসরণ করেই এগিয়ে চলে।
বেশি দূর মার্শনেসকে এভাবে যেতে হয় না।
আলকাজার প্রাসাদের টরে-দেল-অরো নামে টুঙ্গির নীচে পৌঁছেই মার্শনেস কাপিন সানসেদোর সঙ্গে মেলবার সুযোগ পায়।
পাহারাদার সেপাইরা সামনে বেরিয়ে যাবার পর সানসেদো সেখানে জনতার প্রবাহ থেকে সরে টুঙ্গির নীচে একটি কোণে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
মার্শনেসকে বেশি কিছু বলবার অবসর সানসেদো দেন না।
সে গিয়ে তাঁর কাছে দাঁড়াবার পরই চাপা গলায় ব্যস্তভাবে সানসেদো বলেন, শোনো আনা, তোমার আমার এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলাও নিরাপদ নয়। তোমার মার্কুইস কী করেছে, তা বোধহয় জানো। এখানকার কোতোয়ালিতেও আমার বিরুদ্ধে হুলিয়া বার করিয়েছে! সমস্ত শহরের লোক হঠাৎ অত্যন্ত উত্তেজিত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে তাই।
সানসেদোকে বাধা দিয়ে, প্রধান প্রশ্নটা আপাতত স্থগিত রেখে, অস্থির উদ্বেগের সঙ্গে আনা জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু ব্যাপারটা কী, তিয়ো? শহরের মানুষের মতো আমিও তো ভয়ে দিশাহারা। এইমাত্র যা দেখেছি তা সত্যি না দুঃস্বপ্ন তা বুঝতে পারছি না। তুমিও দেখেছ নিশ্চয়!
হ্যাঁ, দেখেছি! অস্বস্তির সঙ্গে বলেন সানসেদো, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে আমারও মন চাইছে না। কিন্তু সমস্ত শহরের লোকের একসঙ্গে দৃষ্টি বিভ্রম হওয়াও সম্ভব নয়। সুতরাং একটা অদ্ভুত ভয়ংকর কিছু মানে ব্যাপারটার নিশ্চয় আছে। কিন্তু এখন তা নিয়েও কথা বলবার সময় নেই। তোমার সঙ্গে দেখা হবার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভাগ্যক্রমে তা যখন হয়েছে তখন সন্ধ্যার পর সান মার্কস-এর মিনারের কাছে সাধারণ কিষাণ মেয়ের পোশাকে আমার সঙ্গে দেখা কোরো। ও মুসলিম মিনারের কাছে আজকের পরবের দিন তেমন ভিড় হয়তো না থাকতে পারে। মনে রেখো–
সানসেদোর কথার মাঝখানেই উত্তেজিত আতঙ্কবিহ্বল জনতার আর্ত চিৎকার হঠাৎ আবার তীব্র হয়ে ওঠে। সামনের দিকে জনতার যে স্রোত বয়ে গিয়েছিল তা আবার বিশৃঙ্খলভাবে সবেগে ঘুরে আসছে।
কী? কী ওটা, তিয়ো?ছদ্মবেশী সানসেদোর খাটো আলখাল্লা গোছের পোশাকটা সভয়ে আঁকড়ে ধরে মার্শনেস প্রায় চিৎকার করে ওঠে।
কী তা জানি না। সানসেদো বিচলিত-স্বরে বলেন, তবে এখন তাই জানবার চেষ্টাই আগে করতে হবে।
***
সানসেদো না জানলেও সেভিল-এর নানা জায়গায় খবরটা তখন ছড়াতেও শুরু করেছে।
জনতার মধ্যে এখানে সেখানে সামান্য একটু কানাকানি। বিরাট জলাশয়ে ছোট ছোট ঢিল পড়লে যেমন হয়, সেই সামান্য খবর তেমনই চারিদিকে ঢেউ তুলে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে তখন।
কে যে কোথায় কলকাঠি নাড়ছে তা কেউ জানে না। কিন্তু লোকের মুখে কটা প্রশ্ন আর উত্তর চালাচালি হচ্ছে প্রায় সর্বত্রই।
কিম্ভুতকিমাকার প্রাণীটার সম্বন্ধে ভয়ের বিহ্বলতাটা তখন তীব্র কৌতূহলে। রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে।
এটা কী আজগুবি জানোয়ার? কোথা থেকে এল? শংকিত ব্যাকুল প্রশ্ন।
সে প্রশ্নের উত্তরও কেউ কেউ দিচ্ছে, ঠিক জানি না। তবে ওরা বলছে নতুন মহাদেশ থেকে নাকি আমদানি।
নতুন মহাদেশের জানোয়ার! সবিস্ময়ে অবিশ্বাসের সুরে বলেছে অনেকে, এরকম জানোয়ার তো সেখান থেকে এ পর্যন্ত কখনও আসেনি!
তা আসেনি। তবে এ হিসপানিওলা ফার্নানদিনা মেক্সিকো কি দারিয়েন-এর জানোয়ার নয়। একেবারে অজানা আর এক আশ্চর্য মুল্লুক থেকে আনা। কে আনল, কে? এনে এমন করে রাস্তায় ছেড়েই দিয়েছে কেন? ছেড়ে দেয়নি। শুনছি, কেমন করে আপনা থেকেই পালিয়ে এসেছে বন্দরের জাহাজ থেকে।
