কত আপনার দেনা? দেনাই-বা কীসের?—জিজ্ঞাসা করেছে পেড্রো দে কানডিয়া।
তারপর দেনা কত আর কীসের ব্যাচলর এনসিসোর মুখে শুনে কানডিয়া থ হয়ে গিয়েছে একেবারে। পিজারো স্পেন থেকে সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে প্রথম ড্যারিয়েন-এই গিয়েছিলেন। এখন যাকে পানামা-যোজক বলি তারই তখনকার নাম ছিল ড্যারিয়েন। সেখানে তখন নতুন উপনিবেশ বসছে। যারা সে উপনিবেশে বসতি করতে চেয়েছে মহাজন হিসেবে তাদের ধার দিয়েছিল এই ব্যালির এনসিসো। পিজারোও এরকম ধার নিয়েছিলেন। সে ধার আর শোধ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। চক্রবৃদ্ধি সুদে বেড়ে প্রতি এক ড়ুকাটের ঋণ বছর কুড়ির মধ্যে একশো ড়ুকাট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই দেনার দায়েই ব্যচিলর এনসিসো এখন পিজারোকে গ্রেফতার করিয়ে কয়েদখানায় চালান করছে।
সত্যি চোখে অন্ধকার দেখেছে পেড্রো দে কানডিয়া। নেহাত সাদাসিধে মানুষ। চেহারাটা তার যত বিরাট, বুদ্ধিটা তত অল্প। পিজারো বন্দি হবার পর সঙ্গের নজরানার জিনিসপত্র, জন্তুজানোয়ার আর আদিবাসীদের কটাকে নিয়ে কী করবে তাই সে ভেবে পায়নি। তার বুদ্ধিতে মুশকিল আসানের একটিমাত্র যে উপায় সে বার করতে পেরেছে তা হল, সঙ্গে যা কিছু আনতে পেরেছে তা নিলেমে বেচে পিজারোকে দেনা মিটিয়ে খালাস করা।
কিন্তু সবকিছু বেচেও দেনা শোধ হবে কি না সে বিষয়ে তার কোনও ধারণা নেই। তা ছাড়া এ সব বেচে দিয়ে পিজাররাকে ছাড়ালে মনের দুঃখে তিনি তো আবার আত্মঘাতী হবেন। পিজারো তখন ছাড়াই পাবেন শুধু, কিন্তু সম্রাটের দরবারে কোন মুখে কী নিয়ে যাবেন?
দারুণ ফাঁপরে পড়ে জাহাজ থেকে নামানো মালপত্র তদারক করতে গিয়ে কানডিয়াকে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তে হয়েছে।
জাহাজ থেকে নামানো ক্লামাগুলোর মধ্যে একটা মা নেই। সেই সঙ্গে সুদুর টম্বেজ থেকে আনা চারজন আদিবাসীর একটিও নিরুদ্দেশ।
পিজারোকে ধরে হাজতে নিয়ে যাওয়ার অপ্রত্যাশিত ব্যাপারে বন্দরের লোকজন বেশ উত্তেজিত চঞ্চল থাকবার দরুনই কখন যে আদিবাসীটি আর ক্লামাটা তাদের চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেছে কেউ খেয়াল করেনি।
কিন্তু আদিবাসীটার এমন দুর্বুদ্ধি হলই বা কেন? গ্লামাটাকে সে-ই যে বাঁধন খুলে ছেড়ে দিয়েছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। সঙ্গে করেও যদি নিয়ে বেরিয়ে থাকে তাতে তার লাভটা কী? এই সম্পূর্ণ অজানা বিদেশে একটা অদ্ভুত অচেনা জানোয়ার নিয়ে সে পালাবে কোথায়? পালাবার দরকারটাই বা তার কী ছিল?
প্রশ্নগুলোর উত্তর দৈত্যাকার পেড্রো দে কানডিয়া অন্তত ভেবে পায়নি।
সে তখন পিজারোকে ছাড়াবার জন্যে ব্যালির এনসিসোরই হাতে পায়ে ধরা একমাত্র উপায় বলে ঠিক করেছে।
ব্যাচিলর এনসিস কিন্তু অটল নির্মম। দেনার একটি দামড়ি সে ছাড়তে প্রস্তুত নয়, আর কড়ায় ক্রান্তিতে দেনা শোধ না হলে পিজারোকে।
দে কানডিয়া নিরুপায় হয়ে যা-কিছু সঙ্গে এনেছে সব নিলেমে তোলার নিয়ম কানুন খোঁজ করতে ব্যস্ত হয়েছে।
সেটা ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দ। গ্রীষ্মকালের শুরু। ইস্টার পরবের আনন্দে সমস্ত সেভিল শহর তখন মেতে উঠেছে।
পিজারো সম্বন্ধে একটু-আধটু উড়ো খবর আর গুজব অতলান্ত সমুদ্র পার হয়ে এ কূলে মাঝে মাঝে ভেসে এসেছে বটে কিন্তু পিজারোর নামে তখনও সে জাদু নেই। বন্দরের দু-চারজন বাদে উৎসবমত্ত সেভিল শহর সেদিন পিজারোর কারারুদ্ধ হবার খবরেও এমন কিছু চঞ্চল হয়ে বোধহয় উঠত না।
সে খবর তাদের কাছে কতদিনে কীভাবে পৌঁছোত তারই ঠিক নেই। বাসি ও ফিকে হয়ে সে খবর যখন সাধারণের কানে যেত তখন কানডিয়ার নিলেমে বিক্রি করা জিনিসপত্র শৌখিন সম্ভ্রান্ত ধনীদের প্রাসাদে সাধারণের চোখের আড়ালে হত গায়েব। হাজত থেকে মুক্তি পেলেও বিষদাঁত ভাঙা সাপের মতো পিজারো তখন হতেন নিঃসহায় নিঃসম্বল। : ইস্টার উৎসবে মত্ত সেভিল শহর কিন্তু পিজারো সম্বন্ধে উদাসীন থাকতে পারেনি।
পিজারোর গ্রেফতারের খবর যাদের কাছে পৌঁছোলেও এমন কিছু সাড়া তুলত না তারাই সচকিত উত্তেজিত হয়ে উঠেছে একটি অভাবিত ব্যাপারে।
সেভিল শহরের রাস্তায় রাস্তায় উৎসবমত্ত জনতা হঠাৎ সেদিন বিস্মিত বিহ্বল আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে।
কিঞ্চিৎ সুরা পানে যারা মত্ত তারা আচ্ছন্ন মস্তিষ্কের দুঃস্বপ্নই দেখছে বলে মনে করেছে। যারা সহজ স্বাভাবিক তারা নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারেনি।
সেভিল শহরের রাস্তায়, চিরপরিচিত রাস্তায় রাস্তায় অবিশ্বাস্য অদ্ভুত এক প্রাণী ছুটে বেড়াচ্ছে!
এ কি শয়তানের প্রেরিত কোনও মূর্ত অভিশাপ, না বাস্তব কোনও প্রাণী?
মার্শনেস গঞ্জালেস দে সোলিস দুঃসহ রাগে ঘৃণায় স্বামীর কাছ থেকে চলে গিয়েছিল ক্যাথিড্রালের ভেতরে। সেখান থেকে কিছুক্ষণ বাদে বার হয়ে মনের অশান্ত অস্থিরতায় উৎসবের ভিড়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসেছিল সেভিলের মুসলিম যুগের বিখ্যাত প্রাসাদ আলকাজার-এর কাছে। গ্রানাদার আলহামব্রার সঙ্গে তুলনীয় এই প্রাসাদের কাছেই মার্শনেস হঠাৎ জনতার ভীত চিৎকার শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর তার চোখের সামনে দিয়ে যে প্রাণীটি ছুটে চলে যায় সেটিকে দেখে আতঙ্কে বিস্ময়বিহ্বলতায় মুহূর্তের জন্যে সম্বিৎ হারিয়ে সে প্রায় টলেই পড়ছিল।
পেছন থেকে কে যেন তাকে তখন ধরে ফেলে।
কে ধরে ফেলেছে মার্শনেস-কে?
দু-এক মুহূর্তের অচেতনতার পরই মার্শনেস সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে চমকে পাশে তাকায়।
