***
সে উপায় আর কিছু নয়, পেড্রারিয়াস-এর কাছে বিফল হলেও স্পেনে গিয়ে খোদ সম্রাটের কাছেই একবার হত্যা দেওয়া।
কুয়োয় জল না পেলে নদীতে যেতে হয়।
কুয়ো হল পেড্রারিয়াস। পেড্রারিয়াস যদি আশা না মেটায় তা হলে চলো, পেড্রারিয়াস যার হুকুমের চাকর সেই সম্রাট পঞ্চম চার্লস-এর কাছে শেষ চেষ্টা করে দেখতে। .
কিন্তু যাবে কে এই গুরুভার নিয়ে?
আলমিগরো?
না, মুখখু শুধু নয়, বেঁটেখাটো গাঁট্টাগোট্টা চোয়াড়ে চেহারা। রাজদরবারে গিয়ে দাঁড়ালে চাকরবাকর ছাড়া আর কিছু মনে হবে না।
হ্যাঁ, চেহারার দিক দিয়ে মানায় বটে পিজারোকে। তিনিও মুখখু বটে, এককালে শুয়োরের রাখাল ছিলেন। কিন্তু চেহারা দশাসই হোমরাচোমরা গোছের। বলিয়ে কইয়েও ভাল। অভিযানের কাহিনী ফলাও করে শোনাবার উপযুক্ত লোক।
সুতরাং ঠিক হয়েছে পিজারোই যাবেন স্পেনে সম্রাটের কাছে নিবেদন জানাতে।
কিন্তু এদিকে তখন অভিযাত্রী দলের যে ভাঁড়ে মা ভবানী। পানামা থেকে স্পেনের রাজদরবারে পাঠাবার পাথেয় জোগাড় করাই দায় হয়ে উঠেছে। দু-দুটো অভিযানে খরচ তো বড় কম হয়নি। সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের হদিস তাতে মিলেছে, কিন্তু লাভ যা হয়েছে তা উজ্জ্বল সোনালি আশা, আসল সোনা নয়।
অনেক কষ্টে পনেরোশো ড়ুকাট জোগাড় হয়েছে। তাই নিয়ে পিজারো একদিন পানামার বন্দর নোম্বর দে দিয়স থেকে পাড়ি দিয়েছেন। সঙ্গী হিসেবে নিয়েছেন শুধু পেড্রো দে কানডিয়াকে।
জাতে এসপানিওল নয়, গ্রিক। বিশাল দৈত্যাকার চেহারা।
পিজারোর অনুগত বিখ্যাত তেরো সঙ্গীর একজন। টমবেজ শহরে তার বিশাল বর্মপরা চেহারা দেখেই সেখানকার মানুষ থ হয়ে গেছল।
স্পেনের রাজদরবারে তাঁদের অভিযানের প্রমাণ হিসেবে দাখিল করবার জন্যে পিজারো সোনাদানার নানান জিনিসপত্র, গয়না, ও দেশের পশমি কাপড়-চোপড়, আর দু-তিনটি বিচিত্র প্রাণী, গ্লামা তো নিয়েছিলেনই, কয়েকজন ওদেশের আদিবাসীও সঙ্গে নিতে ভোলেননি।
এইসব লটবহর নিয়ে পিজারোর জাহাজ নিরাপদেই মাঝখানের অকূল সমুদ্র পার হয়ে একদিন সেভিল বন্দরে গিয়ে ভেড়ে।
অতলান্ত দীর্ঘ সমুদ্রপথে যার দেখা পাননি, সে আপদ তাঁর জন্যে সেভিলের বন্দরেই অপেক্ষা করছিল তা আর পিজারো কেমন করে জানবেন!
স্পেনে নতুন মহাদেশ থেকে কোনও জাহাজ এসে ভিড়লেই তখনও একটু উৎসুক হয়ে খোঁজখবর লোকে নেয়।
কোথা থেকে জাহাজ এল? ফার্নানদিনা কি হিসপানিওলা থেকে এলে তেমন কোনও কৌতূহল নেই। মেক্সিকো য়ুকাটান কি নতুন উপনিবেশ পানাম গুয়াতামেলা থেকে এলে আগ্রহ একটু বেশি।
এ জাহাজ পানামা থেকে এসেছে শুনে দু-চারজন বন্দরে একটু কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়েছেন, দাঁড়িয়ে দেখাটা সার্থকও হয়েছে। কী সব অদ্ভুত জানোয়ার নামানো হয়েছে তক্তা ফেলে জাহাজ থেকে! অ্যাডমিরাল কলম্বাস ছত্রিশ বছর আগে সেই নতুন সমুদ্রপারের দেশ আবিষ্কার করার পর থেকে অনেক কিছু অবাক করবার মতো দেখলেও এমন অদ্ভুত জানোয়ার স্পেনের কেউ কখনও দেখেনি। শুধু জানোয়ারই নয়, একটু ভিন্ন চেহারার আদিবাসীও নেমেছে জাহাজ থেকে।
কোথা থেকে এসব আমদানি?
তা কেউ সঠিক বলতে পারে না।
এনেছে কে?
এনেছে এমন একজন যার সম্বন্ধে উড়ো খবর এই সেভিলেও কিছু কিছু পৌঁছেছে। লোকটার নাম ফ্রানসিসকো পিজারো।
ফ্রানসিসকো পিজারো! বন্দরে নতুন জাহাজের মাল খালাস দেখবার জন্যে ছোট্ট যে-ভিড় জমেছিল তার ভেতর থেকে একজনকে উত্তেজিত হয়ে উঠতে দেখা গেছে।
ফ্রানসিসকো পিজারো? নামটা শুনতে ভুল হয়নি তো? না, ভুল হয়নি। ওই তো পিজারো, একজন দেখিয়েছে। পিজারো তখন জাহাজ থেকে নামবার জন্যে ডেকের ধারে এসে দাঁড়িয়ে আর-এক দৈত্যাকার সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলছেন।
ভিড়ের উত্তেজিত লোকটিকে এবার ব্যস্ত হয়ে যেতে দেখা গেছে বন্দরেরই কোতোয়ালিতে।
কিছুক্ষণ বাদে পিজারো জাহাজ থেকে বন্দরে নেমে দু-পা যাবারও সময় পাননি। চারজন সেপাই এসে তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে।
এ কী ব্যাপার! অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন পিজারো।
কী ব্যাপার বুঝতে পারছ না!-সেপাইদের পেছন থেকে ভিড়ের সেই। উত্তেজিত লোকটি এবার এগিয়ে এসেছে—আমায় দেখলে হয়তো বুঝতে পারবে। চিনতে পারছ আমায়?
পিজারো সবিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেছেন, আপনি—আপনি ব্যালির এনসিসো!
নামটা তো মনে আছে দেখছি! ব্যাচিলর এনসিসো ব্যঙ্গ করে বলেছে, শুধু দেনাটাই ভুলে গেছ বেমালুম। স্মরণশক্তিটা সেদিকে একটু উসকে দেবার জন্যেই এই হাজতে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেছি। দেনাটা শোধ করতে পারো ভাল, নইলে হাজতেই পচিয়ে মারব।
পিজারো সত্যিই তখন হতভম্ব। স্পেনের বীর সেবক সে যুগের সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযানের নায়ক, দেশের মাটিতে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই দেনার দায়ে
গ্রেফতার হয়ে হাজতে চলেছেন! তাঁর হয়ে বলবার, তাঁকে বাঁচাবার কেউ নেই?
বাধা দেবার জন্যে দৈত্যাকার পেড্রো দে কানডিয়া অবশ্য ছুটে এসেছিল। নেহাত সরকারি সেপাই না হলে অমন গোটা দশেক লোককে সে একাই তক্তা বানিয়ে দিতে পারত। কিন্তু মারামারির জায়গা এটা নয়, সেটুকু বুদ্ধি তার ঘটে ছিল।
কানডিয়া নিজেকে সামলে যতদূর সম্ভব ভদ্রভাবেই জিজ্ঞাসা করেছে ব্যাচিলর এনসিসাকে, কী করছেন আপনি! কাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন, জানেন?
জানি, জানি! ব্যাচিলর এনসিসো টিটকিরি দিয়ে বলেছে, উনি নাকি সাগরপারে মস্ত এক বীর হয়েছেন আজকাল! বাঁশবনে গিয়ে শিয়াল রাজা! তা উনি রাজাগজা। যা-ই হোন, আমার কাছে উনি খাতক। দেনা শুধতে না পারলে শ্রীঘর যেতেই হবে।
