তুমিই তা হলে মেদেলিন শহরে তাঁর ভিটেমাটি নিলামে চড়িয়ে আমার তিয়েনকে দেশছাড়া করেছ, সম্রাটের নজরানা চুরির মিথ্যে অভিযোগ সাজিয়ে তাঁর নামে হুলিয়া বার করিয়েছ, আর এই সেভিল শহর থেকেও তাঁকে তাড়িয়েছ। পাছে আমার সঙ্গে দেখা হয় বলে!
মার্কুইসকেও একবার চমকে ভুরু কুঁচকে তাকাতে হয় স্ত্রীর দিকে। মার্শনেস যেন হঠাৎ অন্য কেউ হয়ে গেছে। এতগুলো কথা যে বলেছে তার মধ্যে উত্তেজনা আক্রোশ কিছুই নেই। এক পর্দায় কথাগুলো যেন ছোটদের মুখস্থ পড়ার মতো সে বলে গেছে। কিন্তু সেই একঘেয়ে একটানা বলাটাই যেন আরও বেশি অস্বস্তিকর।
ভেতরে বেশ একটু অস্বস্তি বোধ করলেও বাইরে তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার সঙ্গে। মার্কুইস বলে, ফিরিস্তিটা ঠিকই দিয়েছ। কিন্তু আমায় লুকিয়ে মেদেলিন শহরে সানসেদোকে খুঁজতে গিয়ে যখন রাজদ্রোহের অপরাধে ভিটেমাটি খুইয়ে তাঁর ফেরারি হবার কথা জেনেছিলে তখনই আমার বাহাদুরিটুকু আঁচ করা উচিত ছিল। সেভিলে তাঁর সঙ্গে মেলবার মিথ্যে আশা তা হলে আর করতে না। আর যেখানেই পাও, সেভিল শহরে তাঁর দেখা পাবে না।
মার্শনেস কিছুই না বলে স্বামীর দিকে একদৃষ্টে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে ক্যাথিড্রালের ভেতরেই চলে যায়। মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর আস্ফালন কিন্তু মিথ্যে হয়ে গেছে অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনায়।
কাপিন সানসেদোর মতো সামান্য একটা মানুষের বিরুদ্ধে হুলিয়া নিয়ে সেভিল শহরের মাথাব্যথার তখন অবসর নেই। লুকিয়ে থাকতে হলেও কাপিন সানসেদাকে সেভিল ছেড়ে যেতে হয়নি। তিনি তখন সেভিল ছেড়ে গেলে এ কাহিনীর সমাপ্তি এখানেই টানতে হত কি না জানে!
সেভিল শহর শুধু নয়, সারা স্পেনকে পরে সজাগ চঞ্চল করে তোলবার মতো একটি ব্যাপার তখন ঘটেছে। ঘটেছে প্রথমে কিন্তু নিঃশব্দে।
যাঁর সম্বন্ধে অনেক কিংবদন্তি আগেই স্পেনে এসে পৌঁছেছে সেই ফ্রানসিসকো পিজারো সেভিল-এর বন্দরে তাঁর জাহাজ নিয়ে এসে নোঙর ফেলার পরই পুরনো দেনার দায়ে গ্রেফতার হয়েছেন।
তাঁকে গ্রেফতার করিয়ে জেলে যিনি পাঠিয়েছেন ইতিহাসে শুধু সেই একটি কারণেই তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর নাম ব্যাচিলর এনসিসো।
০৮. কুড়ি বছর বাদে আবার
হ্যাঁ, পিজারো সত্যিই কুড়ি বছর বাদে আবার নিজের দেশ এসপানিয়ায় ফিরেছেন।
ছন্নছাড়া অভাগা বাউণ্ডুলে হিসেবে দেশ ছেড়ে দুর্গম অজানা বিপদের রাজ্যে অনিশ্চিতের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করতে যাবার পর এতদিন বাদে অনেক আশা নিয়ে ফিরে দেশের মাটিতে পা দেওয়া মাত্র জেলখানার কয়েদি হতে বাধ্য হওয়া যদি অভাবনীয় হয়, তা হলে পানামা থেকে তোড়জোড় করে তাঁর স্পেনে আসার ব্যবস্থা করাই আশ্চর্য ব্যাপার।
পানামার গভর্নর পেড্রারিয়াস তো পিজারো আর আলমাগরোর সব আশায় ছাই ঢেলে দিয়েছিলেন। তাদের আকুল প্রার্থনায় কানই দিতে চাননি, নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা না করে চরম দুঃখ দুর্যোগ বিপদের সঙ্গে যুঝে আশ্চর্য এক দেশের যেসব চাক্ষুষ প্রমাণ তাঁরা এনেছিলেন সস্তা ক-টা খেলনা বলে তা অগ্রাহ্যই করেছিলেন।
পিজারো-আলমিগরো তো বটেই, তাঁদের সঙ্গীসাথী আর মহাজন পর্যন্ত তখন হতাশায় ভেঙে পড়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। পেড্রারিয়াস যখন বিমুখ তখন চিরকালের মতো তাঁদের কপাল ভেঙে গেছে বলে তাঁরা মেনেই নিয়েছিলেন।
তারই মধ্যে হঠাৎ স্পেনে আসার মতলব এল কোথা থেকে!
এল বার্থালমিউ রুইজ-এর সেই নেশার ঘোরে শোনা ভুতুড়ে নির্দেশ থেকে।
ইদারায় জল না পেলে নদীতে যেতে হয়।
মাতালের খেয়ালে কথাটা মুখে আওড়াতে আওড়াতে রুইজ সেদিন মাঝরাত্রে মোরালেস-এর বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন।
বন্ধুর ঘরেই রুইজ-এর শোবার ব্যবস্থা। রুইজ-এর মাতাল হয়ে রাত করে বাড়ি ফেরা মোরালেস বন্ধুত্বের খাতিরে মেনেই নিয়েছেন। কিন্তু সেদিন এই বিড়বিড়িনির উপদ্রবে ঘুমোতে না পেরে চটে উঠে বলেছিলেন, মাতাল হওয়ার সঙ্গে পাগলও হয়েছ নাকি! বিড়বিড় করে বলছ কী?
বলছি, ইদারায় জল না পেলে নদীতে যেতে হয়।
তার মানে? মোরালেস বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন—রাতদুপুরে জপ করবার এ মন্তর আবার কোথায় পেলে?
পেলাম ভূতের কাছে!
থামো! ঘুমোতে দাও, বলে ধমক দিয়েছিলেন মোরালেস। রুইজ কিন্তু থামেননি। বলেছিলেন, সত্যি বলছি তোমায়, এখানে আসতে জলার ধারের রাস্তায় ভূত দেখেছি। অনেক দূরের অজগর জঙ্গল ঘেরা, এক জলাবাদার মাঝখানে যে হঠাৎ যেন হাওয়াতেই মিলিয়ে গেছল একদিন, সেই দোভাষীটাই নির্জন পথে আমায় খানিক আগে থামিয়ে
ওই কথাটা শুনিয়েছে। শুনিয়েই আবার মিলিয়ে গেছে অন্ধকারে।
কী কথাটা আর-একবার বলো তো! মোরালেস হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। বলো, বলো।
ইদারায় জল না পেলে নদীতে যেতে হয়, মোরালেস-এর হঠাৎ এত উত্তেজিত হবার কারণ বুঝতে না পেরে একটু হতভম্ব হয়েই বলেছিলেন রুইজ।
হয়েছে! হয়েছে। ঠিক হয়েছে! মোরালেস বিছানা ছেড়েই উঠে বসেছিলেন।
কী ঠিক হয়েছে? রুইজ বন্ধুর জন্যেই তখন চিন্তিত। শুড়িখানা থেকে তো তিনিই আসছেন, মোরালেস তা হলে এমন আবোল-তাবোল বকছেন কেন?
ঠিক হয়েছে—তোমাদের এখন কী করতে হবে তা-ই! উত্তেজনার ভেতরই গম্ভীর হয়ে এবার বলেছিলেন মোরালেস, কালই পিজারো আর আলমাগরোকে ডেকে আনবে। তোমাদের সব সমস্যা মেটাবার এই উপায়টার কথাই আগে মাথায় আসেনি।
