মার্শনেস! লোকটার কাছে তার পরিচয় তা হলে অজানা নয়। তা সত্ত্বেও চাষাটার এতবড় বেয়াদবি করবার স্পর্ধা হয়েছে!
রাগে মার্শনেস প্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, চোখের দৃষ্টিতে আগুন ছিটিয়ে বলে, হাতদুটো কাটিয়ে নুলো হতে চাস?
তাতে রাজি আছি, মার্শনেস দে সোলিস! লোকটার মুখে কোনও ভাবান্তর দেখা দেয় না। তার আগে ওই মিহি কোমরটা একবার জড়িয়ে ধরবার অনুমতি যদি দেন!
মার্শনেস অভদ্র চাষাটার গালে কযাবার জন্যে চড়টা তুলেছিল তার আগে। কিন্তু হাতটা তাকে বেশ একটু হতভম্ব হয়ে নামাতে হয়।
তাকে মার্শনেস বলে চেনা একজন চাষা-ভুষোর পক্ষে যদি বা সম্ভব, মার্শনেস দে সোলিস বলে তার পুরো পরিচয়টা জানা তো প্রায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
লোকটাকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে এবার লক্ষ করে মার্শনেস সত্যিই চমকে ওঠে—তুমি! চাষাড়ে মোেটা নকল গোঁফটা খুলে আর মাথায় বড় কানাতোলা থালার মতো টুপিটা নামিয়ে লোকটি এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন গলায় তীব্র বিদ্রূপের সঙ্গে বলে, হ্যাঁ আমি, মার্শনেস দে সোলিস! তোমার প্রিয়তম স্বামী। সামান্য একটু ছদ্মবেশ করে তোমার ওপর নজর রাখছি অনেকক্ষণ থেকে। সান্তা মারিয়া দে লা সেদে ক্যাথিড্রালের ইস্টার উৎসবে যোগ দেবার নামে যখন একলা বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছ তখন থেকেই। আমার ছদ্মবেশ অতি সাধারণ। কোনও ছেলেমানুষের চোখকেও বোধহয় এতে ফাঁকি দেওয়া যায় না। কিন্তু কোনও কিছুর চিন্তায় তুমি এত উতলা, এমন অস্থিরভাবে কাউকে খুঁজতে ক্যাথিড্রালের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছ যে অমন একটা বেয়াদবির পরও আমাকে ভাল করে লক্ষ করবার ক্ষমতা তোমার হয়নি।
একটু থেমে মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস বাঁকা হাসিতে বিষ ছড়িয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, এত ব্যাকুল হয়ে কাকে খুঁজছ বলে ফেলো দেখি! কার সঙ্গে এই ক্যাথিড্রালের ভেতরে বা বাইরে দেখা করবার ব্যবস্থা করেছ?
একটা গোলামের সঙ্গে, প্রথম চমকের পর ইতিমধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে মার্কুইস-এর চেয়েও তিক্ত তীব্র বিদ্রূপের চাবুক চালিয়ে মার্শনেস বলে, যাকে শয়তানি ফন্দিতে গোলাম না বানাতে পারলে আজ মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর বদলে ছদ্মবেশে যা সেজে আছ তোমার অবস্থা তারও অধম হত।
তা যে হয়নি, মার্কুইস যেন স্ত্রীর তীব্র বিদ্বেষটা উপভোগ করে বলে, তার জন্যে মার্শনেস-এর কাছেই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কারণ শয়তানকেও হার মানানোর ফন্দিটা খাটাবার বাহাদুরি আমার একার নয়, তাতে তাঁরও কিছু কেরামতি আছে। আর আমি আজ মার্কুইস না হয়ে চাষার অধম হলে বেহায়া বিধবা হিসেবে ফার্নানদিনাতেই তাঁরও বোধ হয় এতদিনে সোনার অঙ্গে ছাতা ধরত।
জানোয়ার! দাঁতে দাঁতে চেপে কথা দিয়েই মাংস খুবলে নেবার মতো গলায় বলে মার্শনেস।
নিশ্চয়ই! তা না হলে তোমার স্বামী হবার যোগ্য হতে পারি! আগের মতোই জ্বালা-ধরানো হাসির সঙ্গে বলে মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস, কিন্তু পরস্পরকে মধুর সব সম্ভাষণ করবার যথেষ্ট সময় পরে পাওয়া যাবে। আপাতত তোমার এত ছটফটানি কার জন্যে সেইটেই বুঝে দেখা যাক। সেই গোলামটার? মার্কুইস একটু থেমে ভুরু কুঁচকে যেন গম্ভীরভাবে ভাববার ভান করে বলে, না, গোলামটা নয়। তবে তারই হদিস পাবার আশায় আর কারও জন্যে!
কথাগুলো কীরকম বিধছে বোঝবার জন্যেই স্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে মার্কুইস খানিক চুপ করে।
মার্শনেস-এর মুখ যেন পাথর কেটে তৈরি। শুধু চোখদুটো আঙরার মতো জ্বলছে।
সে আর কেউ-কে কি আমি চিনি? মার্কুইস যেন সরবে চিন্তা করে, মনে হচ্ছে চিনি। সেই অপদার্থ বুড়ো পাইলটটা, সেই কাপিন সানসেদো, তোমার তিয়েন সেই আহাম্মকটা, যার ধর্মজ্ঞানের বাড়াবাড়িতে আমাদের সবকিছু বানচাল হতে বসেছিল। হ্যাঁ, ঠিক! সে ছাড়া আর কেউ নয়। বুড়ো জরদগবটা গোড়া থেকেই আমায় বিষনজরে দেখেছে। সেই গোলামটার ওপরই তার ছিল যত টান। জুয়াতে গোলামটার ওপর দরদের জন্যে তাকে তার শোধও আমি নিয়েছি। মহামান্য স্পেন-সম্রাটের সোনাদানার নজরানা মেক্সিকো থেকে জাহাজে বয়ে আনার সময়ে বেশ কিছু সরাবার দায়ে তার পেছনে হুলিয়া ছুটছে। বুড়োকে এখন ফেরার হয়ে ফিরতে হচ্ছে গা-ঢাকা দিয়ে। তার মেদেলিনের বাড়িঘর সম্পত্তি সব বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। সেই বুড়োটার সঙ্গে তোমার কোনওভাবে দেখা হয়েছে নিশ্চয়ই। বুড়োই গোপনে যোগাযোগ করেছে। সে তোমায় জপাতে চায় সেদিনকার আসল ব্যাপারটা তার কাছে ন্যায়ধর্মের খাতিরে খুলে বলবার জন্যে! আর তুমি তার কাছে গোলামটার হদিস চাও। বুড়ো আবার কীসব ডাইনি বিদ্যে-টিদ্যের জোরে ভূতভবিষ্যৎ বলে কিনা! দু-জনে গোপনে যুক্তি করে এইখানেই কোথাও দেখা হবার ব্যবস্থা তাই ঠিক করেছিলে, কেমন?
শয়তানের মতো হেসে ওঠে এবার মার্কুইস। তারপর আক্রোশ আর বিদ্বেষে মুখচোখের বিকৃত ভঙ্গিতে বলে, কিন্তু তা হবার নয়, মার্শনেস। সেই বুড়ো আহাম্মক, তোমার তিয়েন, কাপিন সানসেদোকে সেভিল শহরে আর দেখতে পাবে না। তুমি ডালে ডালে ফেরো বলে আমায় পাতায় পাতায় থাকবার ব্যবস্থা করতেই হয়। চরেদের কাছে খবর পেয়ে তোমার আর কাপিতানের জোটবাঁধার রাস্তাটা তাই বন্ধ করতে হয়েছে। তোমার আদরের পাতানো মামা কাপিন সানসেদোর নামে হুলিয়াটা এখানেও চালু করে দিয়েছি। এখানে ধরা পড়লে হাজতের দরজা যে তাঁর জন্যে হাঁ করে আছে তা জেনে কত পগার তিনি এতক্ষণে পার হয়েছেন কে জানে!
