রীরডস-এর মূর্তিগুলি পুরোপুরি না দেখেই মহিলাকে গির্জার আর-একদিকে চলে যেতে দেখা যায়।
এখানেও ক্যাথিড্রালের একটি অতুলনীয় সম্পদ অবশ্য আছে। মেরিমাতার একটি প্রমাণ মাপের কাঠের মূর্তি। জননী মেরি রুপোর সিংহাসনে বসে আছেন। তাঁর কেশরাশি সোনার সুতোয় তৈরি।
এ অপূর্ব মূর্তির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষণেকের জন্যে নতি জানিয়েই মহিলা উঠে পড়ে আবার গির্জার বাইরের তোরণের দিকেই এগিয়ে যায়।
ক্যাথিড্রালের ঈষৎ স্তিমিত আলো থেকে বাইরে আসবার পর সুন্দরী মহিলাকে কেউ কেউ চিনতে পারে।
মহিলা সেভিলের অধিবাসিনী নয়। কিছুদিন মাত্র এ নগরে তাকে দেখা যাচ্ছে। এই সময়টুকুর মধ্যে মহিলা শুধু মুগ্ধ বিস্ময়ই নয়, তার স্বামীর সঙ্গে বেশ একটু তীব্র কৌতূহলও জাগিয়েছে।
মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস নামটা তখন স্পেনের খানদানি মহলে একেবারে অপরিচিত নয়। বনেদি প্রাচীন ঘরানা না হয়েও কীসের দৌলতে মার্কুইস উপাধি পাবার সৌভাগ্য হয়েছে সেই বিষয়েই সঠিক ধারণা বিশেষ কারও নেই। নানারকম অনুমান ও গুজব তাই এই নিয়ে প্রচলিত। মার্কুইস-এর আভিজাত্য কত গভীর সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও তাঁর স্ত্রী মার্শনেস-এর সৌন্দর্য সম্বন্ধে অবশ্য দ্বিমত নেই। সেভিল-এর সম্ভ্রান্ত মহলে মার্কুইস ও মার্শনেস-এর খাতির সেই জন্যেই দিন দিন বাড়ছে।
কিন্তু মার্শনেস-এর মতো অভিজাত সুন্দরী মহিলাকে এখন দেখলে একটু অবাকই হবার কথা।
সান্তা মারিয়া দে লা সেদের ব্যাথিড্রাল থেকে সে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। নেহাত মেলার আবহাওয়া না হলে মার্শনেস-এর এভাবে চলাফেরা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। হত।
ধর্মের উৎসবের দিন। রাস্তায় উৎসবমত্ত নাগরিকদের ভিড়। মার্শনেস-এর ওপরে বিশেষভাবে কেউ নজর দেয় না।
এসপানিওলরা জাত হিসেবেই ফুর্তিবাজ। তার ওপর সেভিল শহর শুধু নয়, দক্ষিণ স্পেনের সমস্ত সেভিল প্রদেশের লোকেরই আমুদে বলে খ্যাতিটা সবচেয়ে বেশি। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে সেভিল শহরের পত্তন থেকেই সেখানকার মানুষ আমাদের দেশের বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো যে কোনও ছুতোয় একটা উৎসব করতে পেলে আর কিছু চায় না। স্পেনের নিজস্ব ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে তারা যেমন মেতে ওঠে তেমনই ধর্মের অনুষ্ঠানের মেলা কি কার্নিভ্যালেও তাদের অদম্য উৎসাহ।
তখনকার উৎসবটা আবার ইস্টার-এর। সেভিলের এই উৎসবটাই সবচেয়ে বড়। সেভিল জলার দেশ বললেই হয়। শাখা-প্রশাখা সমেত গুয়াদালকুইভির নদীর বন্যা সামলাতে বর্তমান যুগেও সেখানে অনেক তোড়জোড় করতে হয়। কিন্তু জলার দেশ হলেও আন্দালুসিয়া অঞ্চলটার শুকনো রোদে ঝলমল আবহাওয়াই সেখানকার মানুষের পোশাক যেমন মনও তেমনই রংচঙে করে তোলে।
শুধু শহরের লোক নয়, দূর গ্রামাঞ্চল থেকেও চাষিরা সপরিবারে তখন মেলায় যোগ দিতে এসেছে। তাদের রংবেরং-এর সাবেকি ধরনের সাজের মধ্যে মার্শনেস-এর পোশাক একটু বেমানান হয়তো লাগে। কিন্তু তা নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো সময় ও উৎসাহ কারও নেই।
মার্শনেস ক্যাথিড্রাল থেকে বেরিয়ে উত্তর-পূর্ব কোণের ঘণ্টামিনার বা জিরাল্ডার নীচে খানিক দাঁড়ায়। এ ঘণ্টামিনার এখন প্রায় দুশো হাত উঁচু। তখন ছিল মাত্র সওয়া একশো হাত। আগের মিনারটি নতুন করে গেঁথে পরে বাড়িয়ে তোলা হয়। পুরনো মিনারটির বয়স কিন্তু গির্জাটির চেয়ে সাড়ে তিনশো বছরের বেশি। সে মিনার ছিল একটি প্রাচীন মসজিদের অংশ। স্পেনের সুদীর্ঘ মুসলিম অধীনতার স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে এ ঘণ্টা-মিনারটি সেভিল ক্যাথিড্রালকে একটি বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
স্থাপত্যরীতির ওসব ভেদাভেদ বুঝে উপভোগ করবার মতো ক্ষমতা থাক বা না থাক মার্শনেস-এর তখন সেদিকে দৃষ্টি দেবার মতো মনের অবস্থাই নয়। কী একটা অস্থিরতা তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছে।
ঘণ্টামিনারের নীচে একটু অপেক্ষা করে মার্শনেস আবার ক্যাথিড্রালের দিকেই ফেরবার জন্যেই পা বাড়ায়।
ঠিক সেই সময় পেছন থেকে তার পোশাকে একটা টান পড়ে।। বেশ একটু চমকে মার্শনেস ঘুরে দাঁড়ায়। সেভিল-এর লোকেরা ফুর্তিবাজ, কিন্তু তাদের শিষ্টতার খ্যাতি অনেককালের। তারা তো পারতপক্ষে এমন অসভ্যতা করে না। তা ছাড়া মার্শনেস-এর পোশাকটাই তাকে চিনিয়ে দেয়। সে পোশাক যে হেঁজি-পেঁজির ঘরের নয় তা বুঝে এরকম অসম্মান করবার সাহস করবে কে?
গাঁ-দেশ থেকে চাষাভুষো অনেক এসেছে। তারা অবশ্য অতশত বোঝে না। মাতাল হয়ে খোশমেজাজে তারাই কেউ কি না-জেনেশুনে এ বেয়াদপি করেছে?
ফিরে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে চেয়ে সেই অনুমানই ঠিক বলে মনে হয়।
রংদার হলেও একেবারে মাকামারা গ্রাম্য-উৎসবের পোশাকে একটি গাঁইয়া লোক নেশায় ঢুল-ঢুলু চোখে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। খাটো আঁট ইজের। কোমরবন্ধ আঁটা ঝোলা কুর্তা আর উপুড়-করা প্রকাণ্ড সানকির মতো টুপিতে লোকটার গাঁইয়া পরিচয় স্পষ্ট করে লেখা।
মার্শনেস এক মুহূর্তে রেগে আগুন হয়ে ওঠে। তার মধ্যে যে একটা হিংস্র বাঘিনী আছে বাইরের রূপ দেখে তা বোঝবার উপায় নেই।
সেই বাঘিনীটাই যেন হঠাৎ জেগে উঠে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।
নিজেকে তবু অতিকষ্টে সামলে সে গোলামদের ধমক দেবার ভঙ্গিতে ক্রুদ্ধ চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করে, তুই আমার পোশাক ধরে টেনেছিস, বদমাশ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, মার্শনেস! অম্লানবদনে আগের মতোই মুচকে মুচকে হাসতে হাসতে বলে লোকটা।
