দেখে গেছে মোরালেসকে, পাদরি হার্নান্দো লুকে-কে, আর তখনও পর্যন্ত পিজারোর অভিযানের আসল মহাজন হিসেবে যিনি আত্মপ্রকাশ করেননি সেই লাইসেনসিয়েট গ্যাসপার দে এসপিনোসাকেও।
দেখা যায়নি শুধু পানামার গভর্নর পেদ্রো দে লোস রিয়স ওরফে পেড্রারিয়াসকে। তাঁর সম্মানে বাধলেও তাঁর সরকারি-দপ্তরের কেউ তো তাঁর হয়ে পিজারোদের অভ্যর্থনা জানাতে আসতে পারত। সেরকম কেউও আসেনি।
পিজারো, আলমাগরো ও রুইজ-এর তখনই উদ্বিগ্ন হবার কথা। কিন্তু নাগরিকদের উচ্ছ্বসিত সমাদরে কিছুকাল মাথা ঠাণ্ডা রাখাই তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়েছে।
মেঘলোক থেকে মাটিতে নামবার অবসর হবার পর তিনজনে যখন পেড্রারিয়াস-এর কাছে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে দরবার করতে গেছেন তখন যে আঘাত তাঁরা পেয়েছেন তা সত্যিই কল্পনাতীত।
সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ জয় করার স্বপ্ন একমুহূর্তে ধূলিসাৎ করে দিয়ে গভর্নর পেড্রারিয়াস বলেছেন, নো এনতেনদিয়া দে দেসপোবলার সু গবর্নেসিওন পারা কে আভিয়া মুয়েরতো—
নিজেকে যেন কড়া রাশ টেনে থামিয়ে দাসমশাই নিজের ত্রুটি স্বীকার করে বললেন, ভুলে পেড্রারিয়াস-এর আসল মুখের কথাই বলে ফেলছিলাম। মোদ্দা কথা হল পেড্রারিয়াস পিজারোদের আরজি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে রূঢ়ভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, নিজের মুল্লুক ভাসিয়ে দিয়ে অন্যের মুল্লুক গড়ে দেবার বাসনা তাঁর নেই। সস্তা ক-টা সোনা-রুপোর খেলনা আর কিম্ভুত একজাতের ভেড়ার জন্যে যতজন প্রাণ খুইয়েছে তা-ই যথেষ্ট। তার বেশি প্রাণ অকারণে নষ্ট হতে তিনি দেবেন না।
পাহাড় টললেও পেড্রারিয়াস টলবেন না। হয় পিজারোদের অভিযানের অসীম সম্ভাবনা তিনি ধারণা করতে পারেননি কিংবা সে সম্ভাবনা অত বিরাট বলেই ভয় পেয়ে গেছেন।
কিন্তু পিজারো আর তাঁর সঙ্গীরা যে চোখে অন্ধকার দেখেছেন। তাঁদের এত দুর্ভোগ এত প্রাণের মায়া-ত্যাগ করা দুঃসাহস, সব নিষ্ফল? অন্যের কাছে যা সাহায্য পেয়েছেন তার ওপরে নিজেদের যথাসর্বস্ব তাঁরা এই অভিযানের পেছনে ঢেলেছেন। এখন তাঁরা পথের ভিখিরি বললেই হয়। পানামার গভর্নর বিরূপ হবার পর আর নতুন অভিযান সাজাবার কথা ভাবা বাতুলতা। সূর্য কাঁদলে সোনা-র দেশ অনাবিষ্কৃতই থেকে যাবে, কিংবা তাঁরা যে প্রথম ধাপ কেটে দিয়ে যাচ্ছেন তাই দিয়ে ভাগ্যের পরিহাসে আর-কেউ সাফল্যের শিখরে উঠবে এ দেশ আবিষ্কারের গৌরব আত্মসাৎ করতে।
পিজারো আর আলমাগরো একেবারে ভেঙে পড়ে নিজেদের বাসা থেকেই আর বার হন না।
রুইজ শুধু এত বড় আশাভঙ্গের দুঃখ ভুলতে শুড়িখানাতেই প্রায় দিনরাত পড়ে থাকেন। অনেক রাত্রে শুড়িখানার মালিক যখন একরকম জোর করে তাঁকে রাস্তায় ঠেলে বার করে দিয়ে দোকান বন্ধ করে, রুইজ তখন কোনওরকমে টলতে টলতে মোরালেস-এর বাড়িতেই গিয়ে ওঠেন। সে-ই তাঁর আস্তানা!
সেদিন অমনই টলতে টলতে মোরালেস-এর বাড়িতে যাবার পথে রুইজ নির্জন জলার রাস্তায় যেন ভূত দেখেছেন। নেশায় নিজেকে বেহুঁশ জেনে প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে জেগে স্বপ্ন দেখছেন বলেই মনে করছেন। কিন্তু স্বপ্ন বা চোখের ভুল নয়। সত্যিই নির্জন রাস্তায় চাঁদের আলোয় মানুষটাকে স্পষ্ট দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। নির্জন রাস্তায় এমন একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকা কিছু আজগুবি ব্যাপার নয়। কিন্তু মানুষটা যে সেই দোভাষী, ভেলা-জাহাজ বালসা থেকে যাকে তুলে নিয়েছিলেন আর পিজারো-র তখনকার আস্তানা রিও-দে-সান জোয়ান-এর তীরে জাহাজ বাঁধবার পর যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল আশ্চর্যভাবে।
তুমি! তুমি এখানে? রুইজ-এর নেশায় জড়ানো জিভ যেন আরও অসাড় হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, একটা কথা শুধু বলবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি এখানে।
কী কথা? রুইজ মাথাটা পরিষ্কার করবার চেষ্টা করে জিজ্ঞাসা করেছেন।
ইদারায় জল না পেলে নদীতে যেতে হয়।
অ্যাঁ! মাথাটায় ঝাঁকানি দিয়ে ঝাপসা বুদ্ধি ও দৃষ্টি একটু স্পষ্ট করতে যাবার পর রুইজ সামনে আর কাউকে দেখতে পাননি। লোকটা যেন জ্যোৎস্নার আবছা আলোয় মিশে গেছে।
বালসা থেকে যাকে তুলেছিলেন সেই দোভাষীকেই সত্যি এইমাত্র দেখেছেন কি মনে সন্দেহ জেগেছে।
যা সে বলে গেল সে কথাটারও মাথামুণ্ডু কিছু খুঁজে পাননি।
০৭. উৎসবের আনন্দ কোলাহল
সারা সেভিল শহরেই সেদিন উৎসবের আনন্দ কোলাহল। এক জায়গায় জনতার চেহারা একটু সম্ভ্রান্ত।
সেখানে ঘুরেফিরে অনেকেরই দৃষ্টি একদিকে পড়ছে। পড়া কিছু আশ্চর্য নয়। অভিজাত সুন্দরী নারী। সৌন্দর্যেও বিশেষত্ব আছে। অনেক সুন্দরী নারীর ভিড়েও এ মহিলাকে আলাদা করে দেখতে হয়।
ভিড় জমেছে অসামান্য এক গির্জার উৎসব উপলক্ষে। যে সে গির্জা নয়, সান্তা মারিয়া দে লা সেদে ক্যাথিড্রাল! সেভিল শহরের পরম গর্বের স্থাপত্যনিদর্শন।
পৃথিবীতে ওর চেয়ে বড় গির্জা আর একটি মাত্রই আছে।
শতাধিক বছর আগে কাজ শুরু হয়ে ১৫১৯-এ মাত্র নবছর হল গির্জাটি তৈরি শেষ হয়েছে। সেই থেকে প্রতিবছর এ গির্জাকে কেন্দ্র করে উৎসব হয়ে আসছে। দর্শকদের ভিড় যেখানে সবচেয়ে বেশি পূজাবেদীর পেছনের সেই অপূর্ব চুয়াল্লিশটি গিল্টি করা কাঠের খোদাই মূর্তিগুলির কাজ সাতচল্লিশ বছর ধরে নানা শিল্পীর সাধনায় সমাপ্ত হয়েছে মাত্র দুবছর আগে।
অন্য অনেকের দৃষ্টি বারবার যার ওপর গিয়ে পড়ছে সেই সুন্দরী মহিলার অখণ্ড মনোযোগ কিন্তু এই অপূর্ব শিল্পনিদর্শনের ওপর নেই। নেহাত বাইরের ভড়ং রাখবার জন্যেই সে মূর্তিগুলির ওপর চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে মাত্র। ভাল করে একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়, ক্ষণে ক্ষণে সুন্দরী বাইরের গিজাতেরণের দিকেই কীসের একটা প্রত্যাশায় যেন তাকাচ্ছে।
