এ রাজ্যের শাসনশৃঙ্খলার পরিচয় টম্বেজ নগরীতে ভালভাবে পাওয়া গেছে। পূর্বতন এক রাজ্যেশ্বর মহামহিম টুপাক ইউপাঙ্কি নগরে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ স্থাপন করেছেন। এ নগরের সুবর্ণমণ্ডিত দেব-স্থান পিজারো ও তাঁর সহ-অভিযাত্রীদের বিস্ময় উৎপাদন করেছে। নগরের একটি আশ্চর্য আবাস-হর্ম তাঁরা দেখেছেন সূর্যকুমারীদের জন্যে যা নির্দিষ্ট। নগরময় অসংখ্য জলধারা বহন করবার কৃত্রিম প্রণালী তাঁদের চোখে পড়েছে। তাঁরা দেখেছেন সমুদ্র আর উর্বর মৃত্তিকার দাক্ষিণ্যে নগরবাসীদের কোনও কিছুরই অভাব নেই।
নমুনা স্বরূপ এ নগর দেখেই এ সোনার রাজ্য জয় করবার লালসা তীব্র হয়ে উঠেছে পিজারোর মনে। কিন্তু সেবারের মতো এ রাজ্যের বিশদ কিছু বিবরণ আর তার কল্পনাতীত ঐশ্বর্যের বিস্ময়কর কিছু নিদর্শন নিয়েই পিজারোকে সদলবলে পানামায় ফিরতে হয়েছে।
টম্বেজ থেকে আরও কিছু দক্ষিণ পর্যন্ত অবশ্য তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন। সে পথে সমুদ্র উপকূলে আরও বহু সমৃদ্ধ নগর তিনি দেখেন আর সর্বত্রই সেই অসামান্য রাজ্যেশ্বরের কথা শোনেন, আকাশছোঁয়া তুষারমৌলি গিরিশ্রেণীর এক গহন গোপন উপত্যকায় যাঁর পরমাশ্চর্য রাজধানী রূপকথার রহস্য-বিস্ময় দিয়ে ঘেরা।
সে স্বপ্নপুরীতে পৌঁছোবার সুগম পথ কি নেই? দক্ষিণ সমুদ্রে একটু করে পিজারো এগিয়ে গেছেন জাহাজ নিয়ে। তাঁর বাঁদিকে অজানা তটরেখা। অনতিদূরে আকাশপটে অভ্রংলিহ সব গিরিশিখরের একসঙ্গে নিষেধ ও নিমন্ত্রণ। সে সব গিরিশিখরের নাম তিনি শুনেছেন স্থানীয় অধিবাসীদের
কাছে।
চিম্বোরাজো, কোটোপাক্সি—সে সব নামগুলিই শঙ্কামেশানো সম্ভ্রম আর বিস্ময় জাগায়।
আর-একটু, আর-একটু করে পিজারো আর তাঁর সঙ্গীরা বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রায় নবম অক্ষাংশের কাছে এসে পৌঁছেছেন। ইউরোপের কারও ইতিপূর্বে এতদূর পর্যন্ত
আসার সৌভাগ্য হয়নি।
সুন্দর বিশাল একটি নদীর মোহনায় ঢুকে পিজারো এক বন্দরনগরে জাহাজ ভিড়িয়েছেন এবার।
প্রশস্ত চওড়া নদী, তার ধারে সুন্দর ছোট্ট শহর। তবু এখানে পা দেবার পর থেকেই কেমন যেন একটা অস্বস্তিবোধ করেছে সবাই—কী একটা প্রায় গা ছমছম করা ভাব।
কী নাম এ শহরের নাম জানা গেছে সান্তা।
এখানে এ রকম অদ্ভুত অনুভূতি হবার কারণটা কী হতে পারে? শহরটা কি আলাদা ধরনের কিছু?
এমন কিছু নয়। হাওয়াটা শুধু বড় বেশি রকম যেন শুকনো। নিঃশ্বাস নিতে নাকের ভেতর পর্যন্ত শুকিয়ে দেয়।
আর, আর ওগুলো কী? জিজ্ঞাসা করেছে পিজারো আর তাঁর দলের লোকেরা, শহরে ঘুরতে বেরিয়ে।
ওগুলো গুয়াকাস!
গুয়াকাস! সে আবার কী? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন পিজারো।
নগরবাসীরা গুয়াকাস কী বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু দলের কেউ তো নয়ই, পিজারো বা আলমাগলরাও স্পষ্ট করে কিছুই বুঝতে পারেননি।
বুঝবেন কী করে? আসলে দু-জনেই তো সরস্বতীর ত্যাজ্যপুত্র টিপসই দেওয়া মূখ। এ দেশের রাজ্যেশ্বরের পরিবার আর খানদানিরা যে মৃত্যুর পর আপনজনের মৃতদেহ মিশরিদের মতো মামি করে রাখে আর এখানকার আবহাওয়া অসম্ভব রকম শুকনো বলেই সান্তা বন্দর যে সমাধি-নগর হিসেবে নির্বাচিত, তা বোঝবার মতো জ্ঞানবিদ্যে দু-জনের কারওই নেই।
গুয়াকাস মানে সমাধিস্থান। এইটুকুই তাঁরা বুঝেছেন, আর যত রাজ্যের সেকাল একালের মড়া তার মধ্যে ওষুধে আরকে তাজা রাখবার ব্যবস্থা হয় এইটুকু জেনেই ও শহরে থাকবার উৎসাহ পাননি।
জীবিতের চেয়ে মৃতের মর্যাদাই যেখানে বেশি সে বন্দর-নগর ছাড়বার পর পিজারোর লোকজন আর অজানা দক্ষিণে পাড়ি দিতে চায়নি। পিজারোকেও তাদের মতে সায় দিতে হয়েছে।
সূর্য কাঁদলে সোনার কিংবদন্তির দেশ যে সত্যি আছে তার যথেষ্ট প্রমাণ তো তাঁরা এবার সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন। ছোটখাটো একটা জনপদ তো নয়, এ বিশাল সমৃদ্ধ শক্তিমান রাজ্য জয় করা পিজারোর ওই সামান্য ক-জন সাঙ্গোপাঙ্গদের ক্ষমতার বাইরে। তার জন্যে পুরোপুরি তৈরি হয়ে আসতে হবে।
এবারের সার্থক অভিযানের বিবরণ শুনলে আর এ অজানা আশ্চর্য রাজ্যের। কল্পনাতীত ঐশ্বর্যের কিছু নিদর্শন চাক্ষুষ দেখলে শাসনকর্তা পেড্রারিয়াস যে কিছুতেই আগের মতো বিমুখ থাকতে পারবেন না, নতুন অভিযান সাজাবার জন্যে যা কিছু দরকার সাগ্রহেই তা দেবেন, এ-বিষয়ে পিজারোর কোনও সংশয় তখন আর নেই।
আশায় উৎফুল্ল হয়ে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রায় আঠারো মাস বাদে পিজারো তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ সমেত দুটি জাহাজ পানামা বন্দরে ভেড়ালেন।
পানামা বন্দরে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সমস্ত শহরই যেন ভেঙে পড়েছে। পিজারো আর তাঁর সঙ্গীদের দেখতে আর অভ্যর্থনা জানাতে। তাঁরা যে এখনও প্রাণে বেঁচে আছেন পানামার কেউ তা-ই ভাবতে পারেনি। আঠারো মাস যাঁদের কোনও সংবাদ নেই, অজানা অসীম সমুদ্রে সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত ভূভাগে বেপরোয়া হয়ে পাড়ি দিয়ে নিজেদের গোঁয়ার্তুমির চরম শাস্তিই তারা পেয়েছে বলে সবাই ধরে নিয়েছেন।
তার বদলে তাঁরা শুধু নিরাপদে ফিরেই আসেননি, কিংবদন্তির দেশ সত্যিই আবিষ্কার করে তার আশ্চর্য বিবরণ আর নিদর্শন সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, এ খবর চাউর হবার পর পানামার মতো বন্দরনগরে উৎসাহ-উত্তেজনার জোয়ার বওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
পানামা বন্দরে সেদিন গণমান্য থেকে অতিনগণ্যদেরও প্রায় সকলকেই উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।
