দাসমশাইকে আবার থামতে হয়েছে। এবার বাধা দিয়েছেন মর্মরের মতো মস্তক যাঁর মসৃণ সেই শিবপদবাবু। দাসমশাই-এর উন্নাসিক কৃপাকটাক্ষটুকুই সহ্য করতে না পেরে শিবপদবাবু জিজ্ঞাসা করেছেন, পাণ্ডুলিপিটা কী জানতে পারি?
পারেন বইকী! দাসমশাই অনুকম্পাভরে চেয়ে বলেছেন, পাণ্ডুলিপির পরিচয় হল রিলেসইয়োর সাকাদা দে লা বিবলিওটেকা ইমপেরিয়াল দে ভিয়েনা।
শিবপদবাবু সামলে ওঠবার আগেই মেদভারে হস্তীর মতো যিনি বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবু তাড়াতাড়ি বলেছেন, পাণ্ডুলিপির নাম জেনে কী হবে, মশাই! বালসা জাহাজে কী ছিল তাই বলুন!
দাসমশাই যেন ভোট অফ কনফিডেন্স পেয়ে আবার শুরু করলেন—ওই পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায় যে, ভেলা-জাহাজটিতে সোনা-রুপোর উঁচুদরের। কারুকাজ করা গহনাপত্র ও পশমি পোশাক ছাড়া বিচিত্র আকারের ধাতুর পাত্র আর পালিশ করা রুপোর যে আয়না ইত্যাদি জিনিস রুইজ দেখেন, তা উঁচুদরের সভ্যতারই পরিচয় দেয়। এ পর্যন্ত এ ধরনের সূক্ষ্ম ও উন্নত চারুশিল্পের নিদর্শন তাঁরা কোথাও দেখেননি।
দোভাষীর কাছে টম্বেজ নামে বন্দরনগরের কথা শুনে রুইজ সেখানেই যাবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। পথ দেখাবার জন্যে বালসা থেকে দোভাষীকে যে তিনি নিজের জাহাজে তুলে নেন, তা বলাই বাহুল্য। টম্বেজ-এ একা যাওয়া অবশ্য তাঁর। চলে না। এ অভিযানের নেতা পিজারোর অধীনেই সেখানে যাবার আয়োজন করতে হয়। তাই পিজারো আর তাঁর সঙ্গীদের রিও-দে-সান-জোয়ান নদীর তীরে যেখানে ছেড়ে এসেছিলেন, সেখানেই প্রথমে ফিরে গেছেন রুইজ।
পিজারো আর তাঁর দলবলের ইতিমধ্যে দুর্দশার একশেষ হয়েছে। রুইজ জাহাজ নিয়ে সে সময়ে না ফিরলে এ দলের অস্তিত্বই থাকত কি না সন্দেহ। পিজারোর দলের কিছু নাবিক সৈনিক মারা গেছে অসুখে-বিসুখে ও অনাহারে। সঙ্গের সামান্য খাবার ফুরিয়ে যাবার পর বুনো আলু, নোনা তীরভূমির নারকেল আর গরানগাছের তেতো ফল ছাড়া আর বিশেষ কোনও আহার তাঁদের জোটেনি। নদীতীরের বাদা-জঙ্গলে ওদের কুমির কেম্যান-এর পেটে গেছে কেউ কেউ, কারও জীবনান্ত হয়েছে ওখানকার অজগর আনাকোণ্ডার আলিঙ্গনে। আর কিছু মরেছে আদিবাসীদের গোপন আক্রমণে। ও অঞ্চলের যে আদিবাসীরা প্রথম দিকে স্পেনের অভিযাত্রীদের সূর্যের সন্তান—দেবতা–বলে ভক্তির চোখে দেখেছিল, তারা এসপানিওলদের সত্যকার স্বরূপ তখন জেনে ফেলেছে।
রুইজ একেবারে শেষ মুহূর্তে জাহাজ নিয়ে ফিরে পিজারো আর তাঁর অনুচরদের শোচনীয় পরিণাম থেকে বাঁচিয়েছেন। পিজারোর ভাগ্য এবার সবদিক দিয়েই অনুকূল মনে হয়েছে। শুধু রুইজ নয়, আলমাগরোও পানামা থেকে প্রচুর রসদ ও নতুন ভর্তি হওয়া নাবিক-সৈনিক নিয়ে এসে পৌঁছেছে সেই সময়।
রুইজ-এর কাছে পিজারো ও আলমাগলরা তাঁর অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ। শুনে উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন। টমবেজ বন্দর-নগরের খবর যার কাছে পাওয়া গেছে। ভেলা-জাহাজ বালসা থেকে তুলে নেওয়া সেই দোভাষীর সঙ্গে তাঁরা সরাসরি আলাপ করতে চেয়েছেন।
কিন্তু কোথায় সে দোভাষী! কোথাও তাঁর পাত্তা পাওয়া যায়নি। রিও-দে-সান-জোয়ান-এর তীরে পিজারোর আস্তানায় ফিরে আসার দিনও দোভাষীকে জাহাজে দেখেছেন বলে রুইজ-এর মনে আছে। অন্যান্য নাবিকরাও তাঁকে সমর্থন করে জানিয়েছে যে সেই দোভাষীকে তীরে নামতেও তারা দেখেছে। তারপর থেকে তার আর কোনও হদিস নেই।
নদীর মোহনায় বালুকাময় তীরভূমিতে পিজারো আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ অনুচরদের ছোট্ট একটা উপনিবেশ। তার চারদিকে দুস্তর বিপদসংকুল বাদা-জলা আর দুর্ভেদ্য জঙ্গল। নেহাত আহাম্মকের মতো জলা-বাদা পার হয়ে যদি না সে কুমির, অজগর কি জাগুয়ারের শিকার হবার ভয় তুচ্ছ করে পালিয়ে থাকে তাহলে তার এমনভাবে উধাও হওয়া তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। হঠাৎ অকারণে সে পালাতে যাবেই বা কেন?
দোভাষীর অন্তর্ধান-রহস্যের কোনও মীমাংসা শেষ পর্যন্ত হয়নি।
তার দেওয়া বিবরণের ওপর নির্ভর করে পিজারো দক্ষিণের বন্দর-নগর টম্বেজ খুঁজতে যাওয়ার সংকল্প কিন্তু ছাড়েননি। দলের সকলেরই মনে এখন নতুন আশা, নতুন উৎসাহ। বুনো আলু আর গরানগাছের ফল খেয়ে যাদের হাড়-চামড়া সার হয়েছিল, তাদের এখন আর রসদের অভাব নেই। আলমাগরোর চেষ্টায় লোকবলও। তাদের বেড়েছে। তুমুল উত্তেজনা ও উৎসাহের মধ্যে দুটি জাহাজ প্রায় একসঙ্গেই ছেড়েছে। লক্ষ্য, দূর দক্ষিণ সমুদ্রের বন্দরনগর টমবেজ, এ যুগের স্বর্ণলঙ্কার যা হয়তো প্রথম সোপান।
অভিযাত্রীদের এবারের স্বপ্নও কিন্তু বিফল হয়েছে। আশ্চর্য বন্দর-নগর টম্বেজ-এ পিজারো তাঁর দলবল নিয়ে পৌঁছেছেন। আশাতীত অভ্যর্থনাও সেখানে পেয়েছেন। বন্দর-নগর টম্বেজ যে অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ এক অজানা রাজ্যের একটি সীমান্তঘাঁটি মাত্র তা বুঝতে তাঁর দেরি হয়নি। সর্বত্র রাস্তায় ঘাটে দেব-স্থানে সোনা-রুপোয় ছড়াছড়ি দেখেছেন, দেখেছেন সেই আশ্চর্য প্রাণী যার কোমল মসৃণ নোম ইউরোপের শ্রেষ্ঠ পশমকেও হার মানায়–অজানা সভ্যতায় ব্যবহৃত নতুন কয়েকটি শব্দ শিখেছেন যেমন কুরাকা, যেমন মিনি মায়েস, যেমন ইঙ্কা।
এই টমবেজ বন্দর-নগরেই পিজারো মহামহিম রাজ্যেশ্বর হুয়াইনা কাপাক-এর নাম শুনেছেন, সমুদ্রতীর থেকে অনতিদূরের অভ্রভেদী তুষারমৌলি পর্বতশ্রেণী পর্যন্ত যাঁর একছত্র রাজত্ব বিস্তৃত।
