সে অভিযানও ব্যর্থ। কিন্তু তার ব্যর্থতার ইতিহাসও বিস্ময়কর। সূর্য কাঁদলে সোনার দেশে সেবারেও পিজারো কি আলমিগরো পৌঁছোতে পারেননি। কিন্তু অজানা মহাসমুদ্রে দক্ষিণের দিকে যত এগিয়েছেন তত এমন কিছু সব দেখেছেন যা তাঁদের কল্পনারও বাইরে।
এ অভিযানের প্রথম অসামান্য বিস্ময় নাবিক-প্রধান রুইজকে প্রায় স্তম্ভিত করে দিয়েছে। সমুদ্রের উপকূলে নতুন নতুন বর্ধিষ্ণু গ্রাম-নগর, নতুন জাতের মানুষ ও পশুপাখি তাঁরা এ পর্যন্ত অনেক দেখেছেন। সসৈন্য তীরে নেমে কোথাও লুঠপাট করে, কোথাও ভদ্রভাবে বিনিময় করে সোনাদানার জিনিস ও অলংকার যা তাঁরা সংগ্রহ করেছেন তা চোখ ধাঁধাবার মতো। সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের আশ্বাস এই সব সোনার জিনিসের মধ্যে ভালভাবেই পাওয়া গেছে। কিন্তু লুব্ধ ও মুগ্ধ করলেও এইসব ঐশ্বর্য তাঁদের কল্পনাতীত নয়।
কল্পনাতীত যে বস্তুটি নাবিক প্রধান রুইজ-এর চক্ষু বিস্ফারিত করে তুলেছে তা তিনি দেখেন উপকূল থেকে বহু দূরে মাঝদরিয়ায়।
প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। কারণ দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্রের মাঝে যা তিনি দেখেছেন তা গোড়াতে পালতোলা ক্যারাভেল জাতীয় বেশ বড় জাহাজ বলেই মনে হয়েছে। এ অজানা সমুদ্রে তাঁদের আগে কোনও ইউরোপীয় জাহাজের পাড়ি দেওয়া তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। ইউরোপীয় যদি না হয় তাহলে নিশ্চয়ই জাহাজটি এই দেশীয়দেরই। কিন্তু নৌ-বিদ্যায় এ সব দেশ তো একেবারে আদিম যুগে পড়ে আছে বললেই হয়। সভ্যতায় অতখানি অগ্রসর মেক্সিকোর মানুষও তো সমুদ্রে জাহাজ ভাসাবার কথা কল্পনাই করতে পারে না। এ পালতোলা জাহাজ তাহলে কাদের?
কাছাকাছি যাবার পর বিস্ময় আরও বাড়ে।
যা জাহাজ ভাবা গেছল তা জাহাজ নয়, অদ্ভুত বিরাট সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক রকম ভেলা যা ছোটখাটো জাহাজেরই শামিল।
প্রথমে যা শুধু দেখেই অবাক হতে হয়েছিল পরে খুঁটিয়ে তার পরিচয় পাবার পরও সে বিস্ময় বেড়েছে বই কমেনি। এই ভেলা-জাহাজ বড় বড় অত্যন্ত হালকা এক রকম গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি। গাছটির নাম বালসা তা থেকে এই ধরনের জাহাজগুলিও বালসা নামে পরিচিত। এই বালসা কাঠের ভেলায় লোহা তো নয়ই, তামার কোনও পেরেকও ব্যবহার করা হয় না। সমস্ত কাঠের গুঁড়িগুলো ওখানকার জঙ্গলের এক রকম শক্ত লতায় বাঁধা। ভেলার ওপর মোটা শরের পাটাতন। তার ভেতর থেকে দুটি শক্ত মাস্তুলের খুঁটি বেঁধে তোলা হয়েছে। সেই মাস্তুলে প্রকাণ্ড পাল ঝোলানো। এই বালসা বা ভেলা-জাহাজে দাঁড় বলে কিছু নেই। একটি বড় হাল আর বাঁকানো হেলানো যায় এমন ইরাক বা কীল-এর সাহায্যে সেটি চালাবার ব্যবস্থা। এ বালসা যারা চালায় তাদের নৈপুণ্য নিশ্চয়ই খুব উঁচুদরের, তা না হলে খোলা সমুদ্রে এই ধরনের ভেলা নিয়ে তারা চলাফেরা করতে সাহস করত না।
রুইজ তাঁর জাহাজটি বালসা-ভেলার কাছে ভেড়াবার পর উভয় পক্ষই কিছুক্ষণ অবাক হয়ে পরস্পরকে লক্ষ করেছে। তারপর পরস্পরের আলাপ পরিচয়ের সুযোগ হয়েছে বালসার একজন আদিবাসী যাত্রীর সাহায্য।
রুইজ ও তাঁর এসপানিওল নাবিকেরা প্রথমত ভেলা-জাহাজ বালসা আর তারপর তার সওয়ারি নারী পুরুষের গায়ের সোদানা আর পোশাকের বৈচিত্র্য দেখে অত হতভম্ব ও মুগ্ধ না হলে এই সম্পূর্ণ অজানা অঞ্চলের আজব ভেলা-জাহাজে অমন আশাতীত ভাবে দোভাষী পাওয়াতে কৌতূহলী হয়ে তাকে একটু ভাল করে লক্ষ করতেন।
কিন্তু তাঁরা সবাই তখন বালসার যাত্রীদের সোনার গহনার ওজন ও কারুকাজ আর সেই সঙ্গে তাদের গায়ে পশমের মতো কী বস্তুতে চমৎকার নকশা তুলে বোনা পোশাকের খোঁজ নিতেই তন্ময়।
দোভাষীর কাছেই রুইজ জেনেছেন যে, পশমের মতো যা দেখতে সে পোশাক। ভেড়ার নোম থেকে তৈরি নয়, এ দেশের সম্পূর্ণ ভিন্নজাতের অদ্ভুত এক পশুই তা জোগায়।
সেই দোভাষীই তাঁকে আরও কিছু দক্ষিণের এক বন্দর-নগরের খবর দিয়েছে। সে নগরের নাম টম্বেজ। সেখানে গেলে এ দেশের পশম যারা জোগায় সেই অদ্ভুত প্রাণীর পাল মাঠে-ঘাটে দেখা যাবে আর যা দেখা যাবে তার বর্ণনা শুনেই রুইজ ও তাঁর সঙ্গীদের চোখ লোভে চকচক করে উঠেছে।
সেখানে সোনা আর রুপো নাকি কাঠ কাঠরার মতোই সস্তা জানিয়েছে দোভাষী। সোনা রুপো সম্বন্ধে এ ধরনের উচ্ছাস রুইজ বা অন্য এসপানিওলরা এর আগেও অনেক শুনেছে। যত অতিরঞ্জিতই হোক, এ সব বিবরণের মধ্যে কিছু সত্য আছে। বিশ্বাস করেই তারা সুখ-শান্তি এমনকী জীবনের মায়াও জলাঞ্জলি দিয়ে পাড়ি দিয়েছে এই অজানা বিপদের দেশে। কিন্তু ভেলা-জাহাজ বালসার দোভাষীর আশ্বাসের বেশ ভালো রকম প্রমাণ চাক্ষুষই দেখা গেছে। দেখা গেছে ওই বালসাতেই। ওই ভেলা-জাহাজে রুইজ আর তার নাবিকেরা কী দেখেছিল তার একটা তখনকার লেখা বিবরণ আছে একটা পুরনো পাণ্ডুলিপিতে। তাতে লিখছে এম্পোহোস গুয়ার নাসিদস দে লা দি চা প্লাটা। ঈ তাসাস ঈ ওট্রাস ভাসিহাস পারা বেবের—
শ্রীঘনশ্যাম দাসকে থামতে হয়েছে। উদরদেশ যাঁর কুম্ভের মতো স্ফীত সেই রামশরণবাবুর গলা থেকে জলে কুম্ভ নিমজ্জনের মতোই একটা খাবি-খাওয়া গোছের আওয়াজ শোনা গেছে। ধ্বনিটা সত্যিই মারাত্মক কিছু নয়, দাসমশাইকে তাঁর কী যেন বলার চেষ্টা দ্বিধায় সংকোচে ওই ধ্বনিরূপ নিয়েছে।
দাসমশাই অস্ফুট বক্তব্যটা সঠিক অনুমান করে নিয়ে বলেছেন, ও আপনারা তো আবার স্প্যানিশ জানেন না। ও পাণ্ডুলিপিতে লেখা আছে—
