তা জানি না। গণৎকার যেন সরলভাবেই বলেছে, হাত গুনে ওই নাম পাচ্ছি।
হাত গুনে নামও পাওয়া যায়? এ তোমার কোন জ্যোতিষ? রুইজ জিজ্ঞাসা করেছেন।
তাতে আপনার কী দরকার? একটু উদ্ধতভাবেই বলেছে গণৎকার, যা বললাম বিশ্বাস করতে পারেন তো পিজারোর খোঁজে যাবেন, নইলে যাবেন না।
পিজারোকে ওই চিকামায়ই পাব? একটু সন্দিগ্ধভাবে বলেছেন রুইজ, তিনি তো অনেক দিন পানামা ছেড়ে গেছেন। তাঁর জাহাজ পশ্চিমের অজানা মহাসমুদ্রে কোথাও ড়ুবে গেছে বলেই সকলের ধারণা।
আমার গণনা তা বলে না। বেশ রুক্ষ স্বরে বলে গণকার চলে গিয়েছিল।
বিশ্বাস করুন বা না করুন রুইজ চিকামায় পিজারোর খোঁজে একবার না এসে পারেননি। সেখানে পিজারোর দেখা পেয়ে বিস্মিত বিমূঢ় হয়েছেন।
পিজারোও রুইজ-এর কথা শুনে অবাক হয়ে ভেবেছেন, কে এই গণকার!
গণৎকার যে-ই হোক, পিজারো আর রুইজ এই মিলনের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। নতুন স্বর্ণলঙ্কা আবিষ্কারের স্বপ্ন সফল হওয়ার সূচনা এই মিলন থেকেই হয়েছে। কিছুদিন বাদে পিজারোর সহায় ও সুহৃদ আলমাগরো চিকামায় এসে বন্ধুর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
ইতিমধ্যে তিনিও বেশ কিছু কীর্তি করে এসেছেন। পূর্বেকার ব্যবস্থা মতো পিজারোর অল্পদিন পরেই আলমাগরো পাদরি লুকে-র কাছে টাকার সাহায্য নিয়ে আর-একটি ছোট ক্যারাভেল-এ পিজারোকে অনুসরণ করেন। অজানা মহাসমুদ্রে দক্ষিণ উপকূলে এক জায়গায় আদিবাসীদের সঙ্গে লড়াইয়ে একটি চোখ তাঁকে বাদ দিতে হয়েছে। বেশ কিছুদূর পর্যন্ত পাড়ি দিয়েও পিজারোর কোনও হদিস না পেয়ে আলমাগরো আবার পানামেতেই ফিরছিলেন। পথে মুক্তা-দ্বীপে নেমে প্রথম পিজারোর খবর তিনি পান। সেই খবর অনুসারেই তিনি চিকামায় এসেছেন।
পানামা যদি নরক হয় তাহলে চিকামা তারও অধম। যেমন সেখানে জলা-জঙ্গলার ভ্যাপসা গুমোট গরম তেমনই মশা মাছি বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব আর সেই সঙ্গে বদ্ধ নোনা জলা অঞ্চলের মারাত্মক সব জ্বর-জ্বালা!
তবু পিজারোর তখন চিকামা ছেড়ে কোথাও যাবার উপায় বা সংগতি নেই। ব্যর্থ অভিযানের দরুন অপমান লাঞ্ছনার সীমা থাকবে না তো বটেই, এই অবস্থায় পানামায় ফিরলে পাওনাদাররাও তাঁকে ছিঁড়ে খাবে। পিজারো, আলমিগরো ও রুইজ তিনজনের পরামর্শে শেষ পর্যন্ত গভর্নর পেড্রারিয়াস-এর কাছে দরবার করবার জন্যে আলমাগরোকেই পাঠানো স্থির হয়েছে। তাঁদের অভিযান যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়নি আশ্চর্য এক সোনায় মোড়া দেশের বিশ্বাসযোগ্য কিছু হদিস পেয়েছেন পেড্রারিয়াসকে তা বোঝাতে পারলে দ্বিতীয় অভিযানের অনুমতি পাওয়া যেতে পারে। সে অনুমতি পেলে পাদরি লুকে-কে ধরাধরি করে অভিযানের খরচ জোগাড় হয়তো অসম্ভব হবে না।
দ্বিতীয় অভিযান শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়েছে, কিন্তু তার আগে বাধা-বিপত্তি যা পার হতে হয়েছে তা এক-এক সময় অলঙ্ঘ্য মনে করে হতাশ হয়ে পড়েছেন উদ্যোগীরা।
গভর্নর পেড্রারিয়াস তো খাপ্পা হয়ে উঠেছেন আলমিগরোর অনুরোধ শুনে। অনুমতি দেওয়ার বদলে আগের অভিযানে যে সব সৈনিক নাবিক মারা গিয়েছে তাদের মৃত্যুর জবাবদিহি চেয়েছেন গভর্নর। আল মাগরো-র উপহার দেওয়া সোনাদানা জিনিস তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অভিযানের আরজি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তিনি নতুন উপনিবেশ নিকারাগুয়ার এক বিদ্রোহী রাজকর্মচারীকে শাস্তি দিতে চলে গেছেন।
চিকামায় পিজারো রুইজ-এর সঙ্গে দুর্ভোগের দিন গুনছেন আর পানামায়। আলমিগরো চরম হতাশায় তখন ড়ুবে আছেন। যে জন্যে একটা চোখ তিনি দিয়েছেন সে স্বপ্নও আর সফল হবার নয়। গভর্নর পেড্রারিয়াস তো বটেই, সাধারণ অন্য পরিচিত বন্ধু বান্ধবও তাঁদের অভিযান বুনোহাঁসের পেছনে ধাওয়া মনে করেছে। যে মোরালেস একদিন উৎসাহভরে তাঁদের অভিযানের পরিকল্পনায় যোগ দিয়েছিলেন তিনিও এবারে আলমাগরো-কে নিরস্ত করতে চেয়েছেন। সত্যিই আশ্চর্য কোনও সোনার দেশ আছে বলে তিনি আর বিশ্বাস করতে পারেননি। অনেকের মতো তাঁর কাছেও সমস্ত ব্যাপারটা একটা আজগুবি কল্পনা মাত্র। অজানা মহাসমুদ্রে এই আজগুবি রূপকথার দেশ খোঁজার জন্যে ধন-প্রাণ জলাঞ্জলি দেওয়া তাই মূর্খতা।
আলমাগরো হতাশ হয়ে হয়তো চিকামাতেই ফিরে যেতেন কিংবা বন্ধুদের কাছেও মুখ দেখাতে না পেরে পানামা যোজকের নতুন কোনও উপনিবেশে নিজেকে নির্বাসিত করতেন। কিন্তু যার কাছে যেতে তিনি সবচেয়ে দ্বিধা করেছেন সেই পাদরি লুকেই একদিন তাঁর খোঁজে মোরালেস-এর বাড়িতে এসে উপস্থিত।
পিজারো আলমাগোর ব্যর্থ অভিযান সম্পর্কে আর যে যাই শুনে থাক লুকে কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু শুনেছেন। সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ তাঁর কাছে আজগুবি কল্পনা নয়! সংকল্প সাহস থাকলে সে দেশ খুঁজে পাওয়া যাবেই এই দৃঢ় বিশ্বাসে শুধু গভর্নর পেড্রারিয়াসকেই অভিযানের অনুমতি দিতে তিনি রাজি করাননি, দ্বিতীয় অভিযানের জন্যে অনেক বেশি খরচের টাকাও সংগ্রহ করে দিয়েছেন!
সর্বসাধারণের ধারণার বিরুদ্ধে সোনায় মোড়া দেশের অস্তিত্ব সম্বন্ধে পাদরি লুকের এরকম দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তি কী? ব্যর্থ অভিযানের বিবরণ সবাই যা শুনেছে, তিনি তার বেশি কী শুনেছেন! কার কাছে, কোথায়? কেউ তা জানে না।
বার্থালমিউ রুইজকে নাবিক-প্রধান করে পিজারো ও আলমাগলরা আগের চেয়ে আরও দুটি বড় জাহাজে অস্ত্রশস্ত্র এমনকী ঘোড়া পর্যন্ত নিয়ে পানামা বন্দর থেকে সত্যি একদিন দ্বিতীয় অভিযানে রওনা হয়েছেন।
