গাঁয়ের লোকেরা প্রথমে ভয়ে পালালেও পরে একটু ইতস্তত করে তখন ফিরে এসেছে। সম্পূর্ণ অজানা অঞ্চল হলেও সৌভাগ্যের কথা এই যে, তাদের ভাষা পানামা অঞ্চলের আদিবাসীদের থেকে খুব আলাদা নয়। তাদের সঙ্গে কিছুটা আলাপ-পরিচয় তাই সম্ভব হল। আলাপের বিষয় অবশ্য একটি। গাঁয়ের আদিবাসীরা ফিরে আসার পর যা দেখে পিজারো আর তার অনুচরদের চোখ ঝলসে গেছে তা হল আদিবাসীদের গায়ের সোনার সব গয়না। গয়নাগুলোতে সূক্ষ্ম কারুকাজ না থাকলেও সেগুলির ওজনই পিজারোর লোকেদের উত্তেজিত করে তুলেছে। সোনার দেশের যে কিংবদন্তি তারা শুনেছে, তাহলে একেবারে ভুয়ো নয়!
সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ সম্বন্ধে যা শুনে এসেছেন, এই আদিবাসীদের সঙ্গে আলাপ করে পিজারো তার সমর্থন পেয়েছেন। আরও প্রায় দশদিনের পথ দক্ষিণে পর্বতমালার ওপারে সত্যি এক বিরাট রাজ্য নাকি আছে। সেখানে সোনা নুড়ি-পাথরের মতো ছড়ানো। পিজারো এবং তার অনুচরেরা আদিবাসীদের কথার এই মানেই করেছে।
ভাগ্য কিছুটা অনুকুল এবার হয়েছে। মন্টেনেগরো রসদ ভরা.জাহাজ নিয়ে ফিরে। এসেছে এতদিনে। পিজারো নতুন উৎসাহে দক্ষিণ দিকে পাড়ি দিয়েছেন। এবার অজানা সমুদ্রের উপকূলে মাঝে মাঝে ছোট বড় মানুষের বসতি দেখা গেছে। অধিবাসীরা কোথাও নিরীহ, এসপানিওলদের লুঠপাটে বাধা দিতে সাহস করেনি, কোথাও বা তারা হিংস্রভাবে পালটা আক্রমণ করেছে। এক জায়গার পিজারোর তো প্রাণসংশয়ই হয়েছিল।
এত চেষ্টা এত দুঃখ-ভভাগের পর লুঠপাটের সোনা কিছু জমে উঠলেও সোনার দেশের যথার্থ হদিস কিন্তু মেলেনি। পিজারোর জাহাজের অবস্থা তখন কাহিল। ভালভাবে মেরামত না করে তা নিয়ে অজানা সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া বাতুলতা। লোকজনও তখন বেশির ভাগ আহত ও অসুস্থ।
অত্যন্ত অনিচ্ছার সঙ্গে পিজারোকে তাই আবার পানামায় ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কিন্তু সেখানে গভর্নরের কাছে মুখ দেখাবেন কী করে? পানামা থেকে কিছু দূরে পশ্চিম চিকামা বলে একটি জায়গায় তিনি দলের কয়েকজনকে নিয়ে নেমে গেছেন আর জাহাজের খাজাঞ্চি নিকোলাস ই রিবোলাকে লুঠ করা সমস্ত সোনা দিয়ে গর্ভনর পেড্রারিয়াসকে সন্তুষ্ট করবার জন্যে দূত হিসেবে পাঠিয়েছেন।
সেই সোনার ভেট পেয়ে আর পিজারোর অভিযানে আংশিক সাফল্যের বিবরণ শুনে যদি গভর্নরের মন গলে তাহলে আর একবার নতুন করে সোনার দেশের সন্ধানে বেরোবার সুযোগ হয়তো পেতে পারেন এই ছিল পিজারোর আশা।
এ আশায় তাঁর ছাই-ই পড়ত যদি না চিকামায় হঠাৎ একদিন একটি বেকার নাবিক পিজারোকে নিজে থেকে না খুঁজে বার করত।
এই বেকার নাবিকের নাম বার্থালমিউ রুইজ। সাধারণ মানুষ তো বটেই, ইতিহাসও এ নাম ভুলে গেছে বললেই হয়।
কিন্তু যেমন আলমিগরো, লুকে কিংবা মোরালেস-এর সঙ্গে, তেমনই এই রুইজ-এর সঙ্গে যোগাযোগ হওয়াটাও সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ আবিষ্কৃত হওয়া সম্ভব করে তুলেছে। ১. অনেক বাধা-বিপত্তি জয় করে অর্থ লোকবল ও রাজানুমতি শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারলেও পিজারো ও আলমাগরোর দ্বিতীয় অভিযান সফল হয়নি। কিন্তু যত ব্যর্থই হোক, বার্থালমিউ রুইজ যদি দ্বিতীয় নৌ অভিযানের পোতাধ্যক্ষ না হতেন এবং কূল ঘেঁষে জাহাজ না চালিয়ে দুঃসাহস ভরে খোলা দরিয়ায় না পাড়ি দিতেন তা হলে নবাবিষ্কৃত পশ্চিম সমুদ্রের প্রথম বিস্ময়, সমুদ্রগামী ভেলা বালসার সাক্ষাৎও মিলত না আর সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের এ অকাট্য প্রমাণ অভিযাত্রীরা পেতেন না।
বেকার নাবিক বার্থালমিউ রুইজ চিকামার মতো জায়গায় হঠাৎ পিজারোকে খুঁজতে এলেন কেন? পিজারোর এ অদ্ভুত অস্থায়ী ঠিকানা তিনি জানলেন কোথা থেকে?
প্রথম আলাপের পর চিকামায় পিজারোই সে প্রশ্ন করেছিলেন। রুইজ যা বলেছিলেন তা প্রায় আজগুবি। রুইজ আন্দালুসিয়ার মোশুইয়ের-এর ধবাসী। সেখানকার মাটি জল হাওয়াতেই যেন নিপুণ নাবিক গড়বার মশলা আছে। কলম্বাসের অভিযানে সেখানকার নাবিকরাই প্রধান অংশ নিয়েছিল বলা যায়।
বিচক্ষণ নিপুণ নাবিক হলেও রুইজ বেকার হয়ে পানামাতে সাধারণ ফেরি পানসিতে তখন কাজ করছিলেন।
সেই ফেরি পানসিতে একদিন এক অদ্ভুত গণৎকারের সঙ্গে রুইজ-এর দেখা হয়। গণৎকার লোকটি কোন দেশের, চেহারা দেখে রুইজ ঠিক করতে পারেননি। পোশাক-আশাক ওখানকার আদিবাসীদের মতো হলেও এক মুখ দাড়ি-গোঁফের আড়ালে তাকে ভিনদেশি বলেই মনে হয়। সে নিজে সেধে রুইজ-এর ভাগ্য গণনা করতে চেয়েছিল। রুইজ-এর অতীত জীবনের দু-একটা খবর নির্ভুলভাবে বলে তার মনে বিশ্বাস জাগিয়ে শেষে যা বলেছিল সেইটেই অদ্ভুত। বলেছিল ফেরি পানসির চেয়ে অনেক বড় জাহাজ অজানা সমুদ্রে রুইজ-এর জন্যে অপেক্ষা করে আছে। পানামা ছেড়ে চিকামায় গিয়ে তিনি যদি পিজারো নামে কাউকে খুঁজে বার করতে পারেন তাহলেই তাঁর বরাত ফিরবে।
রুইজ এই অদ্ভুত গণৎকারের কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে না পারলেও মন থেকে একেবারে মুছে ফেলতে পারেননি। পিজারো নামটা তাঁর একেবারে অপরিচিত নয়। পানামা থেকে পিজারোর দুঃসাহসিক এক অভিযানে যাবার কথা তিনিও শুনেছেন। অভিযানের কোনও খবর পানামায় এসে অবশ্য পৌঁছয়নি। এ সমস্ত অবুঝ, গোঁয়ার্তুমির যে পরিণাম হয় এ অভিযানেরও তাই হয়েছে বলে সবাই ধরে নিয়েছে।
গণৎকারের মুখে পিজারোর নাম শুনে রুইজ বেশ একটু অবাক ও কৌতূহলী হয়েছেন। গণকারকে পরীক্ষা করবার জন্যেই জিজ্ঞাসা করেছেন, পিজারো আবার কে?
