কিন্তু সোনার রাজ্য দূরে থাক, মেঠো গাঁয়ের একটা কুঁড়ের সন্ধানও পাওয়া যায়নি।
জনমানবহীন সেই বাদার মুল্লুক থেকে বাধ্য হয়েই পিজারোকে ফিরে আসতে হয়েছে নোঙর তুলে। জাহাজ আবার দক্ষিণমুখো চালান হয়েছে।
কিন্তু কোথায় সে সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ!
ভাগ্য যেন তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর তামাশা করবার জন্যে দশদিন ধরে ভয়ংকর ঝড়-তুফানে তাদের জাহাজ তলিয়ে দেবার হুমকি দিয়েছে। ভরাড়ুবি থেকে যদি বা বেঁচেছে, খিদেয় তেষ্টায় সত্যিই তখন প্রাণ যাবার উপক্রম। নোনা মাংস সঙ্গে যা এনেছিল, সব তখন শেষ। মাথাপিছু দুটো করে ভুট্টার মাথা তখন প্রতিদিনের খাবার হিসেবে বরাদ্দ।
ভুট্টার মাথা! উদরদেশ যাঁর কুম্ভের মতো স্ফীত, ভোজনবিলাসী সেই রামশরণবাবু বাধা না দিয়ে বুঝি পারলেন না, ওখানে তারা ভুট্টা পেল কোথায়?
ভুট্টা ওই দেশেরই ফসল। এই প্রথম শ্রীঘনশ্যাম দাসকে নিজ থেকে সমর্থন করলেন মর্মরমসৃণ যাঁর মস্তক সেই ঐতিহাসিক শিবপদবাবু——এই আমেরিকা থেকেই আলু তামাক ইত্যাদির মতে ভুট্টাও পুরনো মহাদেশে আমদানি হয়েছে। কলম্বাসের আবিষ্কারের আগে সমস্ত আমেরিকায় ভুট্টাই প্রধান ফসল ছিল।
শিবপদবাবুর এ সমর্থন পাণ্ডিত্য প্রকাশের সঙ্গে মন কষাকষি মিটমাটের জন্যে হাত বাড়ানোরও শামিল। কিন্তু দাসমশাই হাত বাড়ানো নয়, আগেকার বেয়াদবির দরুন লম্বা কুর্নিশই বোধহয় চান। তাই শিবপদবাবুর সমর্থনও তিনি একটু টুকতে ছাড়লেন না।
বললেন, ভুট্টা বা মকাই-এর আদি জন্মভূমি কোথায় তা অত নিশ্চিত করে কিন্তু বলা যায় না। নতুনের বদলে পুরনো মহাদেশের ফসলও হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। তাঁরা এ-শস্য আরবরা প্রথম স্পেনে নিয়ে যায় বলে প্রমাণ দেখান। প্রাচীন একটি চিনা পুঁথিতেও ভুট্টার ছবিসমেত উল্লেখ তাঁরা পেয়েছেন।
শিবপদবাবুর পাণ্ডিত্যের ওপর ঠোকরটুকু ভাল করে টের পেতে দেবার জন্যেই একটু থেমে দাসমশাই নিজেই অবশ্য শিবপদবাবুর পক্ষে শেষ রায় দিলেন, তবে কথা হচ্ছে এই যে, প্রাচীন চিনে পুঁথিটি কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের প্রায় ষাট বছর বাদে লেখা। তা ছাড়া এশিয়ার বা আফ্রিকা ইউরোপের কোথাও ধানের বা গমের যেমন, ভুট্টার তেমন বুনো জাতি আর পাওয়া যায়নি। মধ্য বা আগের যুগের কোনও পর্যটক ভুট্টা জাতীয় কোনও শস্যের দেখা পেয়েছেন বলে লিখে যাননি, আর মিশরের প্রাচীন পিরামিডে নানা রকম শস্যের মধ্যে ভুট্টার একটি দানাও কোথাও নেই। সুতরাং এ ফসল নতুন মহাদেশেরই দান বললে খুব ভুল হয় না।
হস্তীর মতো মেদভারে যিনি বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবুকে এই প্রথম। বুঝি একটু অসন্তুষ্ট হতে দেখা গেল! ঈষৎ ক্ষুণ্ণ স্বরে তিনি বললেন, ভাল এক ভুট্টার কুলজির কথা তুললেন শিবপদবাবু! ওসব থাক। পিজারো-র জাহাজ সূর্য কাঁদলে সোনার দেশে কখন পৌঁছোল তাই শুনি!
তা শুনতে হলে আরও অনেক সবুর করতে হবে, বললেন ঘনশ্যাম দাস, অন্তত ও যাত্রায় তাদের শুধু হয়রানি সার হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পিজারো মন্টেনেগরো নামে একজন সৈনিকের অধীনে তাঁর জাহাজ পানামায় ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন। নিজে তিনি কয়েকজন বাছাই করা সঙ্গী নিয়ে সেই জলা-জঙ্গলের দেশেই থেকে গেলেন, মন্টেনেগরো মুক্তা-দ্বীপ থেকে রসদ নিয়ে ফিরবে এই আশায়। তাঁর সৈনিক ও মাঝিমাল্লারা তখন প্রায় বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। শুধু আধবুড়ো পিজারোর অসীম কষ্টসহিষ্ণুতা আর উৎসাহের দৃষ্টান্ত তাদের সামনে ছিল বলে তারা একেবারে বেসামাল হয়ে যায়নি। সোনার লোভ তাদের সব কষ্ট সহ্য করতে কিছুটা সাহায্য করেছে বটে কিন্তু সে কষ্ট কী দুঃসহ যে হয়ে উঠবে তারাও কল্পনা করতে পারেনি।
দিনের পর দিন, হপ্তার পর হপ্তা কেটে গেছে। মন্টেনেগরো মুক্তা-দ্বীপ থেকে রসদ নিয়ে ফেরেনি। জলা-জঙ্গলের রাজ্যে পিজারো-র লোকদের তখন শামুক গুগলি আর বুনো ঝোপঝাড়ের ফল খেয়ে দিন কাটছে। খিদের জ্বালায় যে-সব ফল তারা খেয়েছে তার কিছু কিছু এমন বিষাক্ত যে তাদের শরীর ফুলে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রণা হয়েছে। কিছুকালের মধ্যে দলের কুড়িজন তো অখাদ্য খেয়ে আর অনাহারে মারাই গেল।
দলের অন্য সবাই বয়সে প্রায় তরুণ। শুধু পিজারোরই পঞ্চাশ পার হয়েছে! কিন্তু তিনি যেন অন্য ধাতুতে তৈরি। সকলের সঙ্গে সব দুঃখ-কষ্ট তিনি সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছেন, কিন্তু কিছুতেই দমে যাননি।
সমুদ্রের দিকে হতাশ হয়ে মন্টেনেগরোর জাহাজের জন্যে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখ যখন প্রায় ক্ষয়ে যাওয়ার উপক্রম তখন একদিন ডাঙার দিক থেকে উত্তেজিত হওয়ার মতো একটি খবর পাওয়া গেল। সেখানে দূরে নাকি একটি আলো দেখা গেছে।
আলো মানেই মানুষ, মানুষের বসতি, গ্রাম, হয়তো শহর, হয়তো সেই সোনার দেশ!
ছোট একটি দল নিয়ে পিজারো সেই আলোর উৎস সন্ধানে তখনই বার হলেন। ঘন-জঙ্গল ভেদ করে যেখানে তারা পৌঁছোলেন সেটি একটি উন্মুক্ত প্রান্তর। সত্যিই সেখানে ছোট একটি বসতি দেখা গেল। বাসিন্দারা কিন্তু নেহাত ভীরু নিরীহ ভাল মানুষ। পিজারোর দলবলকে দূর থেকে দেখেই তারা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। পিজারোর অনুচরেরা প্রথমেই অবশ্য গ্রাম লুঠ করে খাবার-দাবার যা পেল আত্মসাৎ করল। খাবার-দাবার সরেস কিছু নয়, ভুট্টা আর নারকেলই তার মধ্যে প্রধান। কিন্তু পিজারোর উপোসি সৈনিকদের কাছে তা অমৃত।
