সে-ঘটনার প্রায় দেড় বছর বাদে তারই গোপন চেষ্টায় যে উদ্যোগের সূত্রপাত হয় তা বহুদূর অগ্রসর হয়ে সত্যি সত্যি পানামার ছোট বন্দর থেকে একটি মাঝারি জাহাজ নিয়ে সূর্য কাঁদলে সোনা-র রাজ্য খুঁজতে পিজারোর অকূলে পাড়ি দেওয়া সম্ভব করে তোলে।
সময়টা ১৫২৪-এর নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি।
ঘনরাম গোপনে যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, পিজারো আর তাঁর দুই অংশীদার তা-ই অনুসরণ করেছেন।
দুটি জাহাজ এ-অভিযানের জন্যে দে লুকে-র হাত দিয়ে পাওয়া টাকায় কেনা হয়েছে। তার মধ্যে বড়টি হল বালবোয়া নিজের জন্যে যে জাহাজ তৈরি করিয়েও। আর ব্যবহার করতে পারেননি এবং খোলা অবস্থায় পানামার বন্দরে যা পচবার উপক্রম হয়েছিল, সেইটি।
সেটি নতুন করে জুড়ে খাড়া করে তাতে রসদ বোঝাই আর লোকজন অর্থাৎ মাঝি-মাল্লা আর সৈনিক নেবার ব্যবস্থা করেছেন আলমাগরো। লোকলশকর মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় একশো জন।
এই জাহাজ নিয়ে পিজারো প্রথমে রওনা হয়েছেন। ঠিক হয়েছে যে, পিজারোর বন্ধু ও অংশীদার আলমাগরো দ্বিতীয় ছোট জাহাজটির সব ব্যবস্থা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলে পিজারোকে কিছুদিন বাদেই অনুসরণ করবেন।
জাহাজ নিয়ে কিছুদূর অগ্রসর হবার পরই মোরালেস-এর বাড়িতে পরিকল্পনাটা কাগজে-কলমে তোলবার সময়কার সেই অদ্ভুত রহস্যময় সংশোধনটার কথা পিজারোর মনে পড়েছে।
তিনবন্ধু মিলে তখনই নভেম্বরে যাত্রা শুভ বলে ঠিক করেছিলেন, কিন্তু আশ্চর্য হয়েছিলেন পরের দিন সেই নভেম্বর কথাটা কাটা দেখে।
মোরালেস নিজে সে-কাটাকুটি করেছেন বলে মনে করতে পারেননি। তাঁর ওভাবে নিজের লেখা কাটবার কোনও কারণও ছিল না।
নভেম্বর মাস ওভাবে কেটে সংশোধন করবার চেষ্টাটা তাই অমীমাংসিত রহস্যই থেকে গেছে।
রহস্যটার মূল কে তা জানা না গেলেও তার মানেটা এতদিনে যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে পিজারোর কাছে।
নভেম্বরটা এ-অঞ্চলের দারুণ ঝড়-তুফানের সময়। দক্ষিণের দিকে সমুদ্রযাত্রার পক্ষে সময়টা তাই একেবারেই অনুকূল নয়।
ঝড়বৃষ্টির বিরুদ্ধে যুঝতে যুঝতে প্রতি পদে বিপন্ন হয়ে অত্যন্ত মন্থরগতিতে অগ্রসর হতে হতে দৈববাণীর মতো নভেম্বরে যাত্রা নিষেধের সেই নির্দেশ তাঁকে দিন দিন অত্যন্ত বিস্ময়বিহ্বল করেছে।
এ-নির্দেশ কি সত্যিই দৈবিক? তা না হলে তাঁরা নিজেরা এত খোঁজখবর নিয়েও যা জানতে পারেননি, সে-সংবাদ জেনে তাঁদের সাবধান আর কে করতে পারে!
এর আগে একটিমাত্র অভিযানই এদিকে কিছুটা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল। সে বিফল অভিশপ্ত অভিযানের নায়ক ছিলেন আন্দাগোয়া। পুয়ের্তো দে পিনিয়াস নামে একটি অন্তরীপের বেশি শুধু যে তিনি অগ্রসর হতে পারেননি তা নয়, ফিরে যাবার পর মারাই পড়েছিলেন।
পিজারো সেই অন্তরীপ ঘুরে পার হয়ে এরপর যেখানে পৌঁছোলেন পৃথিবীর জানিত সভ্যদেশের কোনও মানুষ ইতিপূর্বে সেখানে আসেনি বলেই তাঁর ধারণা।
বীরু নদীর মোহনায় তখন তাঁর জাহাজ ঢুকতে চলেছে।
এই বীরু নদীর কথা এদেশের আদিম অধিবাসীদের কাছে নানাভাবে শুনে শুনে। পিজারো ও তাঁর বন্ধুদের তখন নিশ্চিত ধারণা হয়েছে, এই নদীই তাঁদের চরম সিদ্ধির কুলে পৌঁছে দেবে।
স্পেন থেকে এ পর্যন্ত এই নতুন মহাদেশে যত অভিযান হয়েছে, সেগুলির একটিও পশ্চিমের সমুদ্রকূলের এই অজানা জগতের কোনও সন্ধান পায়নি।
এখানকার যা কিছু পরিচয় সব আদিবাসীদের অসংলগ্ন ও বেশির ভাগ সময়ে আজগুবি অবাস্তব বিবরণ থেকে নেওয়া।
সে-বিবরণ অনেক সময় পরস্পরবিরোধী হলেও কয়েকটি বিষয়ে সেগুলির মিল উপেক্ষা করবার নয়।
তার একটি হল এই বীরু নদীর নাম। এ নাম নানাজনের বিবরণে নানাভাবে বহুবার শোনা গেছে। সকলের বর্ণনাতেই মনে হয়েছে, একটা রহস্যের আবরণে এনামটা যেন জড়ানো।
নদীটির বিস্তৃত মোহানায় ঘোলা তরঙ্গিত জল কোনও সুদূর গহন গোপন রহস্য-রাজ্য থেকেই বয়ে আসছে বলে পিজারোর মনে হয়েছে।
তাঁদের পরিকল্পনার খসড়ায় বীরু নদীর নামের আগে সেই হয়তো শব্দটা অদ্ভুতভাবে লেখা হবার কথা তখন পিজারো ভুলে গেছেন।
কথাটা বেশ একটু অবাক হয়ে এবং দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করতে হল কয়েকদিন বাদেই।
বীরু নদী বেয়ে মোহানা থেকে ক্রোশ চারেক ভেতরে ঢুকে পিজারো তখন নোঙর ফেলেছেন। জায়গাটা খুব উৎসাহ বাড়াবার মতো কিছু নয়। যত দূর দেখা যায়, শুধু বাদা আর জংলা জলা। মাটি সেখানে আছে কিন্তু তুমুল বর্ষার জলে তা এমন পিছল কাদা হয়ে গেছে যে তার ওপর দিয়ে চলাফেরা প্রায় অসম্ভব। এই বাদার ওপর দিয়ে বহুদূর গেলে কিছুটা উঁচু জমি আর জঙ্গল দেখা যায়। সে-জঙ্গল কিন্তু এমন ঘন, লতাপাতায় কাঁটা-ঝোপে তার তলা এমন দুর্ভেদ্য যে, তার ভেতর দিয়ে পথ করে ওদিকের পাথুরে ডাঙায় পৌঁছোতে পিজারো আর তার সেপাইদের প্রাণান্ত হয়েছে। খিদেয় তেষ্টায় ক্লান্তিতে তারা আধমরা, কাঁটায় ছড়ে আর ধারালো পাথরে কেটে হাত-পা তাদের ওরান।
কিন্তু সোনার চেয়ে বড় নেশা নেই। পিজারো তাঁর সৈনিকদের রেহাই দেননি। তাঁর হুকুমে ভারী বর্ম আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই সেপাইদের কখনও কাঠফাটা রোদে পুড়ে, কখনও অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে ভিজে কাদাজল ভেঙে ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। সেপাইদের নিজেদের মনেও সোনার লালসা না থাকলে শুধু পিজারোর হুকুমে তারা এত কষ্ট বোধহয় সহ্য করত না। সোনায় মোড়া সত্যিকার রূপকথার রাজ্য খুঁজে পাওয়ার যে-প্রলোভন পিজারো তাদের দেখিয়েছেন, তারা তা বিশ্বাস করেছে।
