সারারাত জেগে কাটিয়েছেন মার্শনেস, জেগে আর নিজের ঘরে অস্থিরভাবে পায়চারি করে।
সকাল হতে না হতেই কোচোয়ানকে গাড়ি আনতে হুকুম পাঠিয়েছেন।
সে গাড়ি নিয়ে বন্দর পর্যন্ত গেছেন প্রথমেই। খবর নিয়ে জেনেছেন কিছু গোলমালের দরুন শেষ রাত্রে, মাত্র কিছুক্ষণ আগে সকাল হবার পর সে জাহাজ ছেড়েছে। সে জাহাজে যাদের যাবার ব্যবস্থা তিনি করিয়েছিলেন, তারা কেউই কিন্তু আসেনি।
না, কেউই না। কোচোয়ান ভাল করে তাঁর নির্দেশমতো জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনে এসে খবর দিয়েছে, দু-জন যাত্রীর কেউ ভাড়া দিয়ে রাখা সত্ত্বেও জাহাজে আসেনি।
মার্শনেস তারপর আর-এক নির্জন পথের ধারে গিয়ে বহুক্ষণ অপেক্ষা করেছেন। সেইখানেই ঘনরামের দেখা পেয়েছিলেন আগের দিন সকালে।
সেখানে অপেক্ষা করা বৃথা হয়েছে। এরপর বাজারে গিয়ে ঘুরে আসা নিরর্থক। তবু তাই গেছেন। তারপর অপ্রকৃতিস্থর মতো গাড়ি নিয়ে সমস্ত পানামা শহর অকারণে ঘুরে বেড়িয়ে গাড়ির সহিস কোচোয়ানকেও একটু ভাবিত করে তুলেছেন।
এ ছাড়া মার্শনেস-এর করবারই বা কী আছে। পানামা ছোট শহর, এখনও গোনাগুনতি তার রাস্তা আর বসতি। কিন্তু সেই শহরের দরজায় দরজায় গিয়ে ধাক্কা দিয়ে একজন ক্রীতদাসের খোঁজ তো তিনি করতে পারেন না।
হ্যাঁ, একটা কাজ পারেন বটে!
কথাটা মনে হওয়ামাত্র মার্শনেস সরকারি কোতয়ালি দপ্তরে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।
তাঁকে দেখে স্বয়ং কোতোয়ালও যে ভড়কে গিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য। স্বয়ং গভর্নর পেড্রারিয়াস-এর চেয়ে বেশি সন্ত্রস্ত খাতির পেয়েছেন মার্শনেস।
কিন্তু মার্শনেস তো খাতির পাবার জন্যে আসেননি। তিনি যে কারণে এসেছেন, তীব্র জ্বলন্ত স্বরে তা জানিয়েছেন।
সমস্ত দপ্তর ভীতত্রস্ত হয়ে তাঁকে জানিয়েছে যে, মার্কুইস একজন দেশ-থেকে পালানো গোলামের খবর আর বর্ণনা দিয়ে গেছেন বটে, কিন্তু তিনি যা পরিচয় আর বর্ণনা দিয়েছেন, পানামা শহরে সেরকম কোনও ক্রীতদাসের খোঁজ আপ্রাণ চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
পাওয়া যায়নি আপনাদের গাফিলতি আর অকর্মণ্যতায়।—মেঝের ওপর জুতোর গোড়ালি ঠুকতে গিয়ে মার্শনেস-এর সুঠাম পায়ের গোছ একটু দেখা গেছে— একটা গোলামকে সমস্ত বর্ণনা পেয়েও এই এতটুকু পানামা শহর থেকে আপনারা খুঁজে বার করতে পারেন না, তাকে স্পষ্ট আমরা এই শহরের রাস্তায় দেখেছি বলা সত্ত্বেও? পানামা থেকে আপনাদের পাহারা সজাগ থাকলে পালিয়েই বা সে কোথায় যেতে পারে!
নগর-কোতোয়াল নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন। জানা থাকলে তিনি হয়তো জবাব দিতে পারতেন যে, এই নতুন মহাদেশ অজানা বিরাট বিশাল। এখানে কেউ হারিয়ে যেতে চাইলে সমুদ্রের চড়ার বালিতে একটা চিনির দানার মতো তাকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
মার্শনেস-এর সব বকুনি শাসানি শেষ হবার পর দপ্তরের সবাই নিজেরাই ক্রীতদাসের মতো নিচু হয়ে জানিয়েছে যে, নেহাত পাখি হয়ে উড়ে বা মাছ হয়ে ড়ুব-সাঁতারে যদি না পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে মার্কুইস ও মার্শনেস-এর গোলামকে জ্যান্ত বা মরা তারা দু-দিনের মধ্যে হাজির করবেই।
দু-দিনের একদিন বাদে মার্কুইস শিকার থেকে ফিরে মার্শনেস-এর ওই রূপ দেখেছেন।
প্রথমে স্ত্রীর উন্মত্ত প্রলাপের অর্থ কিছু বুঝতে না পেরে একটু পরিহাসের চেষ্টা করেই বলেছেন, তিনদিনটা বড় বেশি তাড়াতাড়ি কেটে গেল মনে হচ্ছে বুঝি!
থামো! গর্জনে মার্শনেস-এর মধুর কণ্ঠও কর্কশ হয়ে উঠেছে, এ হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার নয়। জানো, তুমি এখানে নেই বলেই সেই শয়তানটা পানামা ছেড়ে পালিয়েছে। তাকে এমন পালাবার সুবিধেই যদি দেবে, তাহলে কী দরকার ছিল দপ্তরে গিয়ে তার কথা জানাবার! কী দরকার ছিল?
প্রথমটা একটু বিমূঢ় হলেও মার্শনেস কার বিষয় নিয়ে ক্ষিপ্ত তা বুঝতে মার্কুইস-এর দেরি হয়নি।
এতক্ষণে ব্যাপারটা মনে মনে উপভোগ করতে শুরু করে মার্কুইস দৃষ্টিতে উপহাসের ঝিলিকটা গোপন না করেই জিজ্ঞাসা করেছেন, সে-শয়তান যে পালিয়েছে তা তুমি জানলে কী করে?
জানলাম, জানলাম, মার্শনেস সামান্য একটু থতমত খেয়ে বলেছেন, জানলাম কোয়ালি দপ্তরে গিয়ে। তারা এখনও সে-শয়তানের কোনও পাত্তাই পায়নি। চেষ্টাই কিছু করেনি বলে আমার ধারণা।
তাহলে চেষ্টা করলেই পাবে, উদাসীনভাবে বলেছেন মার্কুইস।
কথার খোঁচা বোঝবার মতো অবস্থা তখন মার্শনেস-এর নয়। তীব্রস্বরে তিনি বলেছেন, সেই চেষ্টা তাদের দিয়ে করাতেই হবে। তুমি যদি না পারো তো আমি নিজে গভর্নরকে বলব। যেমন করে তোক সে-বদমাশকে ধরে আনা চাই-ই।
আনলে কী করবে কী? একটু বাঁকা হাসির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছেন মার্কুইস।
কী করব! মার্শনেস যেন যন্ত্রণার মতো তীব্র আক্রোশে বলেছেন, জ্যান্ত তার গায়ের ছাল ছাড়িয়ে নেব নিজের হাতে।
ই, মার্কুইস-এর কথাটা মনে ধরেছে, তাহলে যেগুলো এত কষ্টে শিকার করে আনলাম, সেই কুমিরের চামড়া আর জাগুয়ারের ছালগুলো তো বাতিল করে দিতে হয়।
এ-বিদ্রূপটা বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়েছে। জ্বলন্ত দৃষ্টিতে মার্কুইস-এর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে মার্শনেস ছুটে আবার তাঁর নিজের কামরায় গিয়ে ঢুকে সশব্দে খিল দিয়েছেন।
কয়েকদিন বাদে গভর্নর পেড্রারিয়াস তাঁর মাননীয় অতিথিদের সসম্মানে বিদায় দিয়েছেন।
কোতোয়ালি দপ্তর দাস নামের কর্ডোভার মূর-রক্ত-মেশানো ক্রিশ্চান-হওয়া বংশের অভিজাতদের মতো ঈষৎ শ্যামল এক সুপুরুষ ক্রীতদাসের তখনও কোনও খোঁজ পায়নি।
০৬. মোরালেস-এর ক্রীতদাস
১৫২৩-এর মে মাসের একদিন মোরালেস-এর ক্রীতদাস গানাদো নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
