তখনও পর্যন্ত পানামার গভর্নরের মাননীয় অতিথি আসবার গুজব তিনি রাস্তায় বাজারে শুনেছেন মাত্র। বিদেশবিভুয়ে ছোট জায়গায় যেমন হয়, মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস সম্বন্ধে অতিরঞ্জিত কিছু গল্পও তখন পানামায় চাউর হয়েছে। মস্ত নাকি তিনি বীর। ফ্রান্সের রাজার সঙ্গে যুদ্ধে, না কর্টেজ-এর সঙ্গে মেক্সিকো অভিযানে অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়ে সম্রাটকে একেবারে মুগ্ধ করে হঠাৎ এই খেতাব পেয়েছেন।
ফ্রান্সের রাজার সঙ্গে পাভিয়ার যুদ্ধের কথা ঘনরাম কিছু জানেন না, কিন্তু কর্টেজ-এর অভিযানে অতবড় কীর্তি কেউ করলে তাঁর নাম ঘনরামের অজানা থাকবার কথা নয়। গঞ্জালেস দে সোলিস বলে কাউকে তিনি স্মরণ করতে পারেননি।
মার্কুইস কোন কীর্তির জোরে এমন হাউই-এর মতো উঠেছেন ঘনরাম তা নিয়ে অবশ্য মাথা ঘামাননি। মার্কুইসের পত্নীভাগ্যও যে অসাধারণ, তাঁর স্ত্রী মার্শনেস নাকি অপরূপ সুন্দরী, এ-রটনাও উনি শুধু কান দিয়ে শুনেছেন মাত্র।
প্রথম দিন গভর্নরের সাদা জোড়াঘঘাড়ায় টানা গাড়ি রাস্তা দিয়ে চলে যাবার পর তাঁর সেদিকে দৃষ্টি পড়েছিল। যে-কসাই-এর কাছে মোরালেস-এর জন্যে মাংস কিনতে গেছলেন, সে-ই আঙুল তুলে একটু উত্তেজিতভাবে বলেছিল, ওই যে, গভর্নরের খাস গাড়িতে মার্কুইস আর মার্শনেস যাচ্ছেন।
ঘনরাম তখন সামনের দিকেই ফিরে দাঁড়িয়ে কসাইকে দেবার পেসোটা গুণছিলেন। মুখ তুলে যখন তিনি তাকিয়েছিলেন তখন গাড়িটা বেশ দূরেই চলে গেছে। মার্কুইস আর মার্শনেস-এর পিঠের দিকই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। না, মার্শনেস-এর ঠিক পিঠ নয়। কারণ সেই তিনি সবে পেছন দিকে কী যেন দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে নিচ্ছেন।
ওই চকিতে ঘুরিয়ে নেওয়া মুখ দেখে ঘনরাম চিনতে কাউকে অবশ্য পারেননি। চিনেছেন সেইদিনই বিকেলবেলা গাড়িটা আবার বাজার দিয়েই যাবার সময়। গাড়িতে মার্শনেস তখন একা। তিনি যে বেশ উদগ্রীব হয়ে রাস্তার পাশের দোকানগুলি লক্ষ করতে করতে যাচ্ছেন, তা দূর থেকেই ঘনরামের নজরে পড়েছে। এবার চিনতে তাঁর দেরি হয়নি।
গাড়িটা তাঁর পাশ দিয়ে পার হয়ে যাবার সময় ইচ্ছে করেই মুখ নিচু করে তিনি হেঁটেছেন। চোখ নীচের দিকে নামানো থাকা সত্ত্বেও মার্শনেস-এর দৃষ্টিটা তিনি যেন সমস্ত শরীরে অনুভব করেছেন।
সে-দৃষ্টির অর্থটা শুধু ঠিকমতো বুঝতে পারেননি।
বুঝতে পারলে তিনি কি কিছু করতেন?
আরও বেশি সাবধান হতেন কি?
না, আর সাবধান কী হবেন! মার্কুইস মার্শনেসকে চেনার পর থেকেই তিনি যথেষ্ট হুঁশিয়ার হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের গাড়ির সামনে আর তারপর পড়েননি একবারও।
তবু মার্শনেস তাঁকে সত্যিই বিস্মিত করে দিয়ে পথের মাঝখানে অপ্রত্যাশিতভাবে ধরেছেন।
মার্শনেস-এর সেদিনকার দৃষ্টিটার ঠিকমতো অর্থ বুঝলে ব্যাপারটা তাঁর কাছে। অপ্রত্যাশিত থাকত না, এই যা।
মুখে প্রকাশ করুন বা না করুন এই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ আর মার্শনেস-এর নিজের হৃদয় যেন নিরাবরণ করে মেলে ধরা তাঁকে যে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, ঘনরামের প্রায় অভিভূত আচ্ছন্নের মতো বাজার থেকে মোরালেস-এর বাড়িতে ফিরে যাওয়া লক্ষ করলেই তা বোঝা যেত।
বাড়িতে ফিরেই চলে যাবার জন্যে তৈরি হতে তাঁর বেশিক্ষণ লাগেনি। কেনই বা লাগবে? সঙ্গে নেবার মতো কোনও সম্পদ তো ক্রীতদাসের থাকে না। মোরালেস-এর কোনও কিছু নিজের প্রয়োজনে না বলে ঋণ হিসেবেও সঙ্গে নিয়ে যাবেন, ঘনরামের শিরায় সে রক্ত বয় না।
ছেড়ে যেতে মোরালেস-এর জন্যে একটু বিষণ্ণ সহানুভূতি অনুভব করা ছাড়া আর কোনও কষ্টই হয়নি।
১৫২১ খ্রিস্টাব্দে একদিন নিজে থেকে যেচে মোরালেস-এর কাছে দাসত্ব স্বীকার করেছিলেন ঘনরাম। ১৫২৩-এর একটি বিশেষ দিনে তিনি নিজেই আবার একেবারে নিঃশব্দে চলে গেছেন।
তাঁর চলে যাওয়ার দিনটি মনে রাখবার মতো বিশেষ ঠিকই, কিন্তু কার কাছে?
তাঁর নিজের ও মার্শনেস-এর তো বটেই, আর-একজনের কাছেও।
সেই বিশেষ দিনটিতে মার্কুইস কিন্তু পানামায় ছিলেন না। সত্যিই সেদিন দুপুরেই গভর্নর পেড্রারিয়াস-এর সঙ্গে তিনি শহর থেকে দূরের জংলা জলায় শুধু ও-দেশের কুমির, কেম্যান বা অ্যালিগেটর নয়, ও-দেশের গুলবাঘা চিতা, জাগুয়ার শিকারে গেছলেন। ফিরেছিলেন দিনতিনেক বাদে বেশ ক-টা কুমিরের চামড়া আর জাগুয়ারের ছাল নিয়ে।
অতিথিশালায় ঢুকে নিজের কামরায় যাবার পথে সত্যিই বিহ্বল হয়ে তাঁকে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছিল।
সামনে জঙ্গলের জাগুয়ারের চেয়ে অনেক গুণ হিংস্র আরও এক ভয়ংকর বাঘিনী মূর্তিই যেন দেখেছেন।
প্রায় উন্মাদিনীর মতো মার্কুইস-এর কাছে ছুটে এসে তাঁর জামার আস্তিন ধরে প্রায় টেনে ছিঁড়ে ফেলে মার্শনেস তরল আগুনের মতো গলায় বলেছেন, এখন তোমার আসবার সময় হল! তিন দিন তুমি বাইরে কাটিয়ে এলে!
দাঁড়ান! দাঁড়ান! সমস্বরে দাসমশাইকে থামিয়ে বলে উঠলেন শিবপদ আর রামশরণবাবু, তার মানে ঘনরামের সঙ্গে মার্শনেস সেই নিকারাগুয়ার জাহাজে চড়ে পালাননি? তিনি পানামাতেই থেকে গেছেন?
আমি তখনই বলেছিলাম না, ভবতারণবাবু নিজেকে তারিফ করেছেন, যে ওই ছুঁ–থুড়ি, মার্শনেসকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছল তো মেয়েটা?
না, মার্শনেস পিছিয়ে যায়নি। দাসমশাই রহস্যটা উদঘাটন করে বলেছেন, ঘনরামই কথামতো সেদিন সন্ধ্যায় অতিথিশালায় আসেননি। মার্শনেস তখন সাধারণ দরিদ্র এসপানিওল মেয়ের সাজপোশাকে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করেছেন নিজের ঘরে। নিজের পরিচারিকাকে নির্দেশ দেওয়া আছে, কেউ খুঁজতে এলে তাঁদের অনুচরদের মহলে যেন তাকে বসিয়ে রেখে তাঁকে খবর দেওয়া হয়। অন্য অনুচরদের বকশিশ দিয়ে সেদিন সন্ধ্যার মতো ছুটি দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং মার্কুইসই শিকারে চলে গেছেন, সুতরাং এ-বদান্যতা অস্বাভাবিক কিছু মনে হবার কথা নয়। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে প্রহরের পর প্রহর বেড়েছে। গভর্নরের অতিথিশালায় মার্শনেসকে খুঁজতে কেউ আসেনি।
