ঘনরামের চোখের দৃষ্টি কেমন অতল হয়ে উঠেছিল। শান্ত গম্ভীর স্বরে বলেছিলেন, এতবড় সৌভাগ্য আমি পায়ে ঠেলতে পারি!
তাহলে এখনই গিয়ে তৈরি হও। গাঢ় স্বরে বলেছিল মার্শনেস, সারাজীবনের পাওয়ার আশা না থাকলে এতদিন বাদে এইটুকু পেয়ে নিজেই তোমায় ঠেলে সরিয়ে দিতে পারতাম না।
আর কিছু না বলে ঘনরাম বাজারের দিকেই চলে গিয়েছিলেন। মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস কিছুক্ষণ বাদে ঘোড়ায় চেপে এসে স্ত্রীকে এইখানেই পেয়ে কী বলেছিলেন আমরা জানি।
মার্কুইস আর যাই বুঝে ফেলে থাকুন, মার্শনেস যে বাজারে এক কসাই-এর দোকানে চকিতে একবার ঘনরামকে দেখবার পর থেকে তার গতিবিধির অতখানি খবর নিয়ে তার সঙ্গে সত্যি সত্যিই দেখা করতে সাহস করেছে আর দেখা হওয়ার আগেই অত বড় একটা দুঃসাহসিক ফন্দি সফল করবার নিখুঁত ব্যবস্থা করে ফেলেছে, এতখানি কল্পনা করতেও পারেননি।
নিশ্চিন্তভাবেই গভর্নর পেড্রারিয়াস-এর সঙ্গে নতুন মহাদেশের যা কুমির সেই কেম্যান শিকারে বেরিয়ে গেছেন।
তার মানে! ঘনশ্যাম দাস একটু দম নেবার জন্য থামতেই জিজ্ঞাসা করেছেন মেদভারে বিপুল ভবতারণবাবু, ঘনরাম ওই নিকারাগুয়ায় যাবার জাহাজে ওই মার্শনেস-এর সঙ্গেই পালিয়ে যান বলে পানামায় আর তাঁর পাত্তা পাওয়া যায় না?
এইটুকু আর বুঝতে পারেননি! কুম্ভের মতো উদরদেশ যাঁর স্ফীত সেই রামশরণবাবু বিস্ময় প্রকাশ করলেন ভবতারণবাবুর সরলতায়, ঘনরাম নিজেই কী বলেছিলেন, মনে নেই? এত বড় সৌভাগ্য কি আমি পায়ে ঠেলতে পারি।
হ্যাঁ, ঠিক ঠিক! রামশরণবাবুর বিচক্ষণতা স্বীকার করে ভবতারণবাবু বেশ একটু গর্বভরে বলেছেন, আমি কিন্তু ওই ছুঁড়িটাকে বুঝে ফেলেছি!
ভাষা! ভাযা সামলান, ভবতারণবাবু! শিবপদবাবু সাবধান করেছেন—কাকে কী বলছেন! উনি মার্শনেস, সে খেয়াল আছে! মার্শনেস কি মার্কুইস-এর মর্যাদা কত ধাপ ওপরে তা জানেন কিছু? আর্ল আর ডিউকের মাঝামাঝি।
তার মানে পদ্মভূষণ গোছের! সরলভাবে বলেছেন যাঁর উদরদেশ কুম্ভকে লজ্জা দেয় সেই রামশরণবাবু, ওই পদ্মশ্রী আর পদ্মবিভূষণের মাঝখানে।
না, না, ওসব শূন্যলোকের ত্রিশঙ্কু গোছের কিছু নয়। শিবপদবাবু ব্যাখ্যা করে বোঝাবার এ সুযোগ ছাড়েননি—তখনকার দিনে বেশ শাঁসালো না হলে ওই আর্ল, মার্কুইস, ডিউক আর মার্শনেস, ডাচেস কেউ হত না। বনেদি বড় ঘর বড় ঘরোয়ানা, অগাধ বিষয়সম্পত্তি, নিদেনপক্ষে দেশের মানে সম্রাটের জন্যে দারুণ কোনও কীর্তির জন্যেই এ সম্মান সম্রাট অনুগ্রহ করে বিতরণ করতেন। মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস এইরকম একটা মস্ত কেউ না হলে ওই বয়সে ও খেতাব পেতেন না। বয়স তো যা শুনলাম তাতে খুব বেশি মনে হচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, পৈতৃক খেতাব হতে পারে!
দাসমশাই নীরবে ঈষৎ হাস্যকুঞ্চিত মুখে সভাসদদের আলোচনা শুনছিলেন, এবার নিজের টীকা যোগ করে বলেছেন, না, পৈতৃক নয়, স্বােপার্জিত খেতাব! স্বয়ং সম্রাট পঞ্চম চার্লস-এর কাছেই পাওয়া। তাও স্পেনে নয়, ইটালিতে। সম্রাট নিজের দেশ স্পেনের চেয়ে সেখানে থাকাটা বেশি পছন্দ করতেন আর একটু ফাঁক পেলেই হুট করে গিয়ে হাজির হতেন। সম্রাটের মেজাজ-মর্জি তখন একটু বেশি খুশি ছিল। পাভিয়ার যুদ্ধে তাঁর জন্মশত্রু ফ্রান্সের রাজাকে শুধু হারাননি, বন্দি পর্যন্ত করেছেন। সেই সঙ্গে জার্মানির সিংহাসনও তাঁর অধিকারে এসেছে। অনেকেরই ধারণা, সম্রাটকে এই দিলদরিয়া মেজাজে ইটালিতে গিয়ে ধরার কৌশলেই গঞ্জালেস আর্লগিরি ডিঙিয়ে একেবারে মার্কুইস হয়ে ওঠেন। শুধু যে সম্রাট নিজে খোশমেজাজে ছিলেন তা নয়, তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের মধ্যে বিজ্ঞ বিচক্ষণ মন্ত্রী বা সভাসদদের কেউ ছিলেন না। হাতের কাছে উলটে দেখবার মতো দপ্তরের কাগজপত্র নেই, তার ওপর খাইয়েদাইয়ে তোয়াজ করে বশ করা সম্রাটের খোশামুদে মোসায়েবদের সুপারিশে সম্রাট ঝোঁকের মাথায় উদার হয়ে দরাজ হাতে অতবড় খেতাবটা দিয়ে ফেলেছেন। সত্যি কথা বলতে গেলে, নতুন মহাদেশ সম্বন্ধে তখন বিশেষ কিছুই খবর তিনি রাখেন না, রাখার প্রয়োজনও বোধ করেননি।
অত হাঁকডাক সত্ত্বেও নতুন মহাদেশ থেকে যা এ পর্যন্ত পেয়েছেন, আশাটা বড় বেশি ফাঁপানো ছিল বলেই তা আহামরি কিছুনয় বলে মনে হয়েছে। কর্টেজ মেক্সিকো জয় করে যা পাঠাচ্ছেন, তাতে তবু নতুন মহাদেশের একটু যা মান বেঁচেছে। নইলে স্পেন ফ্রান্স জার্মানি আর ইতালির অধিকার নিয়ে ইউরোপই তাঁর কাছে বেশি দামি। খানিকটা খোশ মেজাজে আর কিছুটা হেলায় ছেদ্দায় অনুগ্রহটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কি না তিনি খেয়ালই করেননি। ভাবতেই পারেননি যে, একদিন তাঁর খেয়ালের ফলে কোথাকার জল কোথায় পর্যন্ত গড়াবে, আর তার কেলেঙ্কারি মুছে ফেলতে সরকারি মহাফেজখানার হাড়ে দুর্বো গজাবার অবস্থা হবে কতখানি।
কিন্তু—ওই কী বলে, মনের মতো সম্বোধনটা কোনওরকমে একেবারে জিভের ডগায় রুখে দিয়ে ভবতারণবাবু বলেছেন, ওই মার্শনেস মেয়েটাকে কিছু বোঝা গেল না কিন্তু। যাই হোক, সময়মতো ঘনরামকে ঠেলে বিদেয় করে দিয়েছিল এই ভাগ্যি। নইলে ওই মার্কুইস গঞ্জালেস একবার হাতে পেলে জ্যান্ত ছাল ছাড়িয়ে নিত বলেই তো মনে হয়।
সত্যি জ্যান্ত ছাল ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু মার্কুইস নয়, আর-একজন। বলেছেন শ্রীঘনশ্যাম দাস, আর মার্শনেস সাবধান করে না দিলেও ধরা দেবার জন্য ঘনরাম ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতেন না। কারণ মার্কুইস আর মার্শনেসকে এর আগেই দেখে তিনি চিনে রেখেছেন। মার্শনেস যেদিন বাজার দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে যেতে ঘনরামকে দেখেন, সেদিন অবশ্য নয়।
