গাড়িটা ফিরে এসে কাছে দাঁড়ালে সহিস এসে দরজা খোলার পর ঘোড়া থেকে। লাফ দিয়ে নেমে নিখুঁত আদবকায়দায় স্ত্রীকে হাত ধরে ভেতরে বসিয়ে দিয়ে আবার ঘোড়ায় চেপে গাড়ির পাশাপাশি যেতে যেতে যেন তুচ্ছ অবান্তর একটা কথা জানিয়েছেন মার্কুইস।
বলেছেন, তুমি অত সকাল সকাল বেরিয়ে গেছ দেখে আমিও একটা কাজ সেরে ফেললাম ওই অবসরে।
যে প্রশ্নটা এবার আসা উচিত তার জন্যে সামান্য কয়েক মুহূর্ত সময় দিয়েছেন মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস।
মার্শনেস সে প্রশ্ন করেননি। সামনের দিকে চেয়ে কীসের ভাবনায় যেন তিনি অন্যমনস্ক।
মার্কুইস নিজে থেকেই আবার নির্লিপ্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছেন, দপ্তরে গিয়ে পালিয়ে-আসা গোলামটাকে রাস্তায় যেন দেখেছি মনে হওয়ার কথা জানিয়ে এলাম। পরিচয়, চেহারার বর্ণনা দিয়ে নামটা যেন দাস ছিল তাও বলে এসেছি। গভর্নরের অতিথির মানে রাখতে কোথায় কার কাছে গোলামটা আছে ওরা ঠিক খুঁজে বার করবে। গোলামদের সব খবর লেখা একটা পাকা খাতাই ওদের আছে।
মার্শনেসকে আগের মতোই অন্যমনস্ক মনে হয়েছে। মুখটা একটু ফেরাননি, এমনকী একটা শব্দও তাঁর মুখে শোনা যায়নি।
গাড়িটা শুধু একটা গর্তের মধ্যে পড়েই বোধহয় একটু লাফিয়ে উঠেছে। মার্শনেস কেঁপে উঠেছেন নিশ্চয় তাতেই।
ঘনরাম দাসকে গভর্নরের মাননীয় অতিথি মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর মতো লোকের পানামার পুলিসকে দিয়ে খোঁজাবার এত গরজ কীসের?
গভর্নরের অতিথির সম্মান রাখতে পুলিশ চেষ্টার ত্রুটি অবশ্য করেনি, কিন্তু মার্কুইস-এর বর্ণনার সঙ্গে মেলে এমন কারও সন্ধান পায়নি। তাদের পাকা খাতাতেও নামটা না থাক, ওরকম কোনও ক্রীতদাসের বিবরণ নেই। থাকার কথাও নয়, কারণ ঘনরাম মোরালেস-এর কাছে নিজে থেকে এসে যখন কাজ নিয়েছেন, মোরালেস পলাতক বলেই তার খবর দপ্তরে জানাননি। ঘনরাম নিরুদ্দেশ হবার পরও আগেকার মতোই নীরব থেকেছেন। সুতরাং নেহাত সামনাসামনি কেউ ধরিয়ে না দিলে পুলিসের পক্ষে ঘনরামের পাত্তা পাওয়া অসম্ভব।
হাতে হাতে কেউ ধরিয়ে দেবে এই ভয়েই কি ঘনরামকে একবেলার মধ্যে পানামা থেকে অমন নিরুদ্দেশ হতে হয়?
সামনাসামনি যে তাঁকে চিনে নির্জন একটি রাস্তায় দাঁড় করায় সে অবশ্য পুলিসকে জানাবার ভয়ই দেখিয়েছিল।
বলেছিল, নিয়তিকে এড়িয়ে পালানো যায় না, বুঝেছ? আমার চোখকেও ফাঁকি দিতে পারবে না। বলল এখন কী করব? পুলিশকে এখনই সব জানানো আমার উচিত নয় কি?
পুলিসের কছে ধরা পড়বার ভয় ঘনরামের জবাবে তখন খুব প্রকাশ কিছু পায়নি।
গোলামের পক্ষে অত্যন্ত অশোভনভাবে সোজা মার্শনেস-এর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, উচিত কাজ করতে কবে আপনি পেছপাও হয়েছেন, মার্শনেস!
মার্শনেস! আপনি!—হেসে উঠেছিল মার্শনেস।
মার্শনেস বলেই তো আরও আপনি। তা ছাড়া তুমি বলার ঘনিষ্ঠতা কোনওদিন আপনার সঙ্গে ছিল বলে তো মনে করতে পারছি না।—ঘনরামের মুখের হাসির দরুনই কথাটা তেমন তিক্ত মনে হয়নি।
চার হাজার মাইল দূরে চার মিনিটের দেখায় এসব কথা কাটাকাটির সময় নেই স। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে তীব্র স্বরে বলেছিল মার্শনেস, ভাগ্য যখন তোমায় আবার আমার হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে তখন আর আমি তোমায় ছাড়ব না এটুকু জেনে রাখো। অপরাধের জন্যে মাপ চেয়ে কান্নাকাটি করার মেয়ে আমি নই। আমার জন্যে তোমার যদি অশেষ দুর্গতি হয়ে থাকে তোমার জন্যেও আমি তার চেয়ে কম দুঃখ পাইনি।
একটু থেমে ঘনরামের চোখের দৃষ্টিটা লক্ষ করে আরও যেন জ্বলে উঠে মার্শনেস বলেছিল, এই ঐশ্বর্য এই বিলাস এই নাম এই সম্মান সৌভাগ্য এই যদি আমার সুখ বলে মনে করতাম তাহলে একটা ক্রীতদাসের সঙ্গে গোপনে কথা বলবার জন্যে যা আমার নেই সেই লজ্জার কথা বলছি না—অপরের মানসম্মান, নিজের অহংকার সব বিসর্জন দিয়ে এখানে ভিখিরির মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম না। শোনো, দাস, তোমাকে আমার চাই। তুমি আমার জন্যে যা সয়েছ তার চেয়ে অনেক বেশি আমি সহ্য করতে প্রস্তুত। এ নতুন মহাশে বিরাট, বিশাল, সম্পূর্ণ অজানা। এখানে যদি আমরা স্বেচ্ছায় হারিয়ে যেতে চাই তাহলে সমুদ্রের বালির চড়ায় দুটো চিনির দানার মতো কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না কোনদিনও। আমরা হারিয়েই যাব সেই রকম। আজই সন্ধ্যায় তুমি তৈরি হয়ে আসবে। এখানে নয়।
বন্দরে যাবার নাম করে গাড়িটা সেখানে পাঠিয়ে তোমার জন্যে আমি এখানে নেমে দাঁড়িয়ে আছি। এখান দিয়ে বাজার থেকে তুমি ফেরো লক্ষ করেছি দু-দিন। আজ তোমার বাজারে যাবার আগেই তাই আরও ভোরে এসে অপেক্ষা করেছি এই ক-টা কথা বলব বলে। ভাল করে কথাগুলো শুনে নাও।
বন্দর থেকে নিকারাগুয়ার নতুন উপনিবেশে কাল ভোরে একটা ব্রিগানটাইন যাচ্ছে। গভর্নরের গাড়ির কোচোয়ানকে বকশিশ দিয়ে যেন আমাদের একজন অনুচরকে সস্ত্রীক সে জাহাজে পাঠাবার ব্যবস্থা ভাড়া দিয়ে করিয়ে রেখেছি। নিকারাগুয়া থেকে কোস্টারিকা কি ভেরাগুয়া যেখানে খুশি আমরা গিয়ে বাসা বাঁধতে পারব। কেউ আমাদের বাধা দিতে পারবে না।
আজ দুপুরে মার্কুইস গভর্নরের সঙ্গে শিকারে যাচ্ছে। আমার ওপর এর মধ্যেই। তার সন্দেহ হয়েছে, কিন্তু সন্দেহ যতই হোক, আমার সব কিছু বিসর্জন দিয়ে এ অকূলে ঝাঁপ দেওয়ার কথা তার মতো মানুষ ভাবতেই পারবে না। তাই আজ সটান আমাদের অতিথিশালায় তুমি আসবে সন্ধ্যার পর। তোমার আসার সব ব্যবস্থা আমি করে রাখব। যাও, আর এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে সাহস হয় না। শুধু কথা দিয়ে যাও, সন্ধ্যায় তুমি আসবে!
