অসম্ভব হলেও, তাঁর সেই ভাইপো পেড্রো কোনও সময়ে এসে তাঁকে না পেয়ে কাগজগুলোর ওপর কলমবাজি করেছে, এইটুকু মাত্র ভাবা যেতে পারে।
পেড্রো এসেছিল কিনা জানবার জন্যে তাই তিনি ক্রীতদাসকে ডাক দেন।
একবার দুবার তিনবার ডাকেও তার কিন্তু সাড়া পাওয়া যায় না।
গানাদো বলে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে আর একবার ডেকে মোরালেস উঠে পড়েন।
না, মোরালেস-এর ক্রীতদাস গানাদোর কোনও পাত্তা পাওয়া যায় না। বাড়িতে সে নেই। একদিন খোঁজ-খবরের পর জানা যায়, পানামা থেকেই সে উধাও।
হঠাৎ লোকটা গেল কোথায়? কোন স্পর্ধায় সে যায়!
পিজারো বন্ধুকে ক্রীতদাসের পালানোটা সরকারি দপ্তরে জানিয়ে রাখতে বলেন, ধরতে পারলে যাতে ঠাণ্ডা করে দেয় মার দিয়ে।
মোরালেস হেসে বলেন, কী জানাব দপ্তরে? ও কি আমার সত্যিকার নিজের কেনা ক্রীতদাস! তোমরা হয়তো খেয়াল করোনি, মাত্র বছর দুয়েক লোকটি আমার কাছে কাজ করছে। আমার আগের ক্রীতদাস মারা যাবার পর তোক খুঁজছিলাম। হঠাৎ একদিন নিজে থেকেই এসে জানালে সে ক্রীতদাস। কিউবা থেকে পালিয়ে এসেছে গোরু-ভেড়ার জাহাজে লুকিয়ে। নামও বললে গানাদো। জানালে আমার কাছে গোলাম হয়ে থাকতে চায়। পালিয়ে-আসা ক্রীতদাস নতুন মহাদেশে অগুনতি আছে। নিজে থেকে তার সে কথা স্বীকার করাতেই অবাক হলাম। কেউ তা করে বলে আমার জানা নেই। কিউবায় গোলামদের ওপর অধিকাংশ মনিবের বাড়িতে অকথ্য অত্যাচার হয় আমি জানি। লোকটাকে দেখে পছন্দ হওয়ায় তাই এক কথায় নিয়ে নিলাম। সে জন্যে আফশোশ হয়নি কখনও। একদিনের জন্যে তার এতটুকু গাফিলি কি বেচাল দেখিনি। আজ যদি নিজের খুশিতেই চলে গিয়ে থাকে আমার নালিশ করবার কিছু নেই।
মোরালেস নালিশ করেননি কোথাও। কিন্তু তাঁর অত গুণের ক্রীতদাসের হঠাৎ তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার কোনও কারণও খুঁজে পাননি। তাঁর কাছে কোনও রকম দুর্ব্যবহার সে তো পায়নি। লোকটির নিজস্ব একটা আত্মমর্যাদাবোধই ছিল। তাকে কোনও বিষয়ে সামান্য একটু ভৎসনাও করবার প্রয়োজন কখনও হয়নি। অতিরিক্ত পরিশ্রমও তাকে দিয়ে কখনও করিয়েছেন এমন নয়। নামে ক্রীতদাস হলেও বাড়ির লোকের মতোই তাকে দেখেছেন। তার এভাবে চলে যাওয়া সত্যিই একেবারে দুর্বোধ্য। যা আগে ভাবতে পারেননি সেরকম কোনও রহস্য লোকটির মধ্যে ছিল বলে মোরালেস-এর এতদিনে ক্ষীণ একটা সন্দেহ জাগে।
ঘনরামের হঠাৎ চলে যাওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া সত্যিই একটু কঠিন। মোরালেস-এর বাড়ির বৈঠকে লেখা পরিকল্পনা গোপনে সংশোধন করে তা ধরা পড়বার ভয়েই কি ঘনরামকে পালাতে হয়?
কারণটা খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না এই জন্যে যে তাঁকে মোরালেস বা আর কেউ ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করেননি। ধরা পড়বার অত ভয় থাকলে ওরকম কাজ তিনি করতে যেতেন কি?
নেহাত অহেতুক খেয়াল যদি না হয় তাহলে পানামা শহরে সম্মানিত এক অতিথি দম্পতির আসার সঙ্গে ঘনরামের নিরুদ্দেশ হওয়ার কোনও সম্পর্ক থাকা কি সম্ভব?
পানামায় গভর্নরের অতিথি হয়ে সত্যিই তখন কিছুদিনের জন্যে কেওকেটাদের একজন সস্ত্রীক এসেছেন বটে।
কিন্তু মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস আর তাঁর স্ত্রী যে মহলের লোক মোরালেস কি তাঁর বন্ধুরা সেখানে কল্কেই পান না। মোরালেস-এর ক্রীতদাসে সঙ্গে ওই রাজাগজাদের কী সম্পর্ক থাকতে পারে?
সম্পর্ক কিছু না থাকুক গভর্নরের সাদা ঘোড়ার জুড়িগাড়িতে পানামার বাজারে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একদিন সকালে মার্শনেস-কে হঠাৎ চমকে উঠতে দেখা গেছে।
কী হল? স্ত্রীর অকারণ চমকটা লক্ষ করে জিজ্ঞাসা করেছেন মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস।
কিছু নয় বলে মার্শনেস কথাটা চাপা দিয়েছেন। মুখে আর কিছু না বললেও মার্কুইস কিন্তু স্ত্রীর কৈফিয়তে সন্তুষ্ট হননি। দিন-তিনেক বাদে একদিন সকালে মার্শনেসকে কী খেয়ালে, অনেক আগেই বেড়াতে বেরিয়ে পড়তে দেখা গেছে গাড়ি ডাকিয়ে!
গভর্নরের রাজকীয় অতিথিশালায় স্বামী ও স্ত্রীর ঘর পাশাপাশি। মার্কুইস যথাসমস্যা তৈরি হয়ে স্ত্রীর ঘরে এসে কাউকে দেখতে পাননি। মার্শনেস-এর পরিচারিকার কাছে খোঁজ নিয়ে স্ত্রীর অনেক আগে একা বেরিয়ে যাওয়ার খবর জানতে পেরেছেন।
মার্শনস কি কিছু বলে গেছেন?
হ্যাঁ, পানাম বন্দরের দিকটা দেখতে যাচ্ছেন এ কথা জানাতে বলে গিয়েছেন। মার্কুইস-এর তো এই ছেলেখেলার বন্দর দেখবার কোন আগ্রহ নেই। তাই তাঁকে ডেকে বিরক্ত না করে মার্শনেস একাই গেছেন।
কেউ দেখলে মার্কুইস বিরক্ত না হয়ে খুশিই হয়েছেন মনে করত তাঁর মুখের হাসি দেখে। হাসিটা শুধু সামান্য একটু বাঁকা।
সম্মানিত অতিথিযুগলের জন্যে বরাদ্দ করে রাখা পানামার হর্তাকর্তা ডন পেট্রো আরিয়াস দে আভিলা ওরফে পেড্রারিয়াস-এর দুধের মতো সাদা ঘোড়ার জুড়ি গাড়িটাকে পানামো বন্দরের দিকে যেতে সেদিন সকালে সত্যিই দেখা গেছে। গাড়িতে মার্শনেসই শুধু নেই।
একলা ঘোড়ায় চেপে বেরিয়ে মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস শহর থেকে বন্দরে যাবার নির্জন পথেই মার্শনেসকে সেদিন দেখতে পেয়ে যেন চমকে গেছেন।
সে কী! তুমি এখানে দাঁড়িয়ে! তুমি গাড়ি নিয়ে বন্দর দেখতে গেছ শুনলাম!
হ্যাঁ, তাই যাব ভেবেছিলাম। সুন্দরী মার্শনেস বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে বলেছেন, হঠাৎ এই নির্জন জায়গাটায় নেমে একটু হাঁটতে ইচ্ছে হল।
হ্যাঁ, চমৎকার জায়গা। নামতে ইচ্ছে হবার মতো! মার্কুইস স্বীকার করেছেন, এদিকে জলাটার একটু পচা দুর্গন্ধ আর কাঁচা রাস্তাটা একটু এবড়ো-খেবড়ো, কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে ওরকম একটু-আধটু খুঁত অনায়াসে সহ্য করা যায়। আর নিজে না যাও, গাড়িটাকে পাঠিয়ে খুব ভালো করেছ। ঘোড়াগুলো বন্দর ঘুরে তো আসবে! ওই যে ফিরছে দেখছি।
