ফল হাতে পেয়ে গাছ পোঁতার দাবিদারকে তারা মানবে কেন?
এত ঝক্কি সূত্ত্বেও কল্পনার সোনার আশায় সত্যিকার সোনা প্রায় বিলিয়ে দেবার মতো মহাজন তখন দু-চারজন ছিল। তা না থাকলে নতুন মহাদেশের রহস্য-যবনিকা দিকে দিকে কতদিনে গুটিয়ে তোলা হত কে জানে! অন্তত আবিষ্কৃত হবার মাত্র ত্রিশ বছরের মধ্যে সেই পালতোলা জাহাজের যুগে এই বিরাট অজানা মহাদেশের উত্তরের লাব্রাডর থেকে দক্ষিণের শেষ বিন্দু টেরা ডেল ফুয়েগো পর্যন্ত উদঘাটিত হয়ে ১৫২১-এ স্পেনের পতাকা বয়ে পোর্তুগিজ নাবিক ম্যাঙ্গেলান-এর পক্ষে পশ্চিম সমুদ্রে যাবার সেই পরমবাঞ্ছিত প্রণালী খুঁজে পাওয়া সম্ভব হত না।
তেমনই এক মহাজন একদিন হঠাৎ দে লুকের কাছে নিজে থেকে এসেছেন। কী আলাপ তাঁদের মধ্যে হয়েছে তা বলা যায় না, কিন্তু পিজারো আর আলমাগরো নিবিড় অন্ধকারে হঠাৎ আলোর রেখা দেখতে পেয়েছেন।
দে লুকে তাঁদের অভিযানের বিস্তারিত পরিকল্পনা ছকে দেখাতে বলেছেন।
খরচা কি তাহলে সত্যিই পাওয়া যাবে? দেবেন দে লুকে সে টাকা? ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করেছেন পিজারো আর আলমাগররা।
হ্যাঁ, পরিকল্পনা বিচার করে তারপর টাকার ব্যবস্থাটা হতেও পারে। ভাসা ভাসা ভাবে বলেছেন দে লুকে, স্পষ্ট কোনও আশ্বাস দেননি।
দেবেন কোথা থেকে! আশ্বাস দেবার আসল মালিক তো তিনি নন। তবে পরিকল্পনাটা সত্যিই ভোলা মন নিয়ে তিনি বিচার করে দেখবেন। তাঁর সে বুদ্ধি-বিচক্ষণতা আর সাধুতার সুনাম ইতিমধ্যেই পানামায় অনেকের কাছে পৌঁছেছে।
কিন্তু বিচার করে দেখবেন কার হয়ে? নেপথ্য থেকে সত্যিকার চাবিকাঠি নাড়বার এই মানুষটি কে?
ইচ্ছে করেই যিনি নিজেকে নেপথ্যে আড়াল করে রাখেন তিনি কি নিজে থেকেই এই ব্যাপারে হঠাৎ আকৃষ্ট হয়ে বিস্তারিত সন্ধানের উদ্যোগ করলেন?
তা যদি না হয়, তাহলে তাঁর গোপন পরিচয় খুঁজে বার করে কে তাঁর কৌতূহল এইটুকু পর্যন্ত উসকে দিল? দিলই বা কী ভাবে!
তা জানবার উপায় নেই। তবে মানুষটির নাম ইতিহাসের অগোচরেই থেকে যায়নি। ঐতিহাসিকেরা তাঁকেও স্মরণীয় করে রেখেছেন। নাম তাঁর গ্যাসপার দে এসপিনোসা। শুধু নেপথ্য থেকে অভিযানের খরচাই তিনি জোগাননি, একদিন সূর্য কাঁদলে সোনার দেশে তাঁকে সশরীরে উপস্থিত থাকতেও দেখা গেছে। কিন্তু সে ঘটনা তখন ভবিষ্যতের অন্ধকার গর্ভে বিলীন।
পিজারো আর আলমাগরো তখন তাঁদের পরিকল্পনাটা ছকে ফেলেছেন। কিন্তু দু-জনেই তো সমান পণ্ডিত! মুখে মুখে ছকলেই তো হবে না, তা কাগজে কলমে তোলা চাই।
সেই কাজটা মোরালেস-এর বাড়িতেই হয়েছে। সন্ধে সকাল দুবেলা তিন বন্ধুর বৈঠক বসেছে, সব কিছু ভেবেচিন্তে স্থির করে লিখে ফেলবার জন্যে। আলোচনা করেছেন সবাই আর লেখার কাজটা করেছেন মোরালেস।
নিজে প্রত্যেক দিনের লেখা পরের দিন পড়িয়ে শুনিয়েছেন মোরালেস, দরকার মতো নতুন কিছু সংশোধন করার জন্যে।
নিজের লেখা পড়তে গিয়েই কিন্তু অবাক হয়েছেন এক-একদিন! সম্ভব হলে অভিযান কোন সময় নাগাদ শুরু করবেন আগের দিন আলোচনা করে তা লেখা হয়েছিল বলেই সকলের ধারণা। নভেম্বর মাসই উপযুক্ত সময় বলে তাঁরা ঠিক। করেছিলেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে নভেম্বর মাসটা কাটা দেখে প্রথমটা বেশ একটু ধোঁকাই লেগেছে। লেখাটা কখন কাটলেন মনে করতে পারেননি। তেমন কিছু গুরুত্ব অবশ্য এ ব্যাপারে সেদিন দেননি। নিজেই ভুলে কখন কেটেছেন এখন মনে নেই, এইরকমই ধরে নিয়েছেন।
পরের বার কিন্তু বেশ একটু হতভম্বই হয়েছেন নিজের লেখা পড়তে গিয়ে। এ দেশের আদিম অধিবাসীদের কাছে আবছা যে সব বিবরণ এ পর্যন্ত সংগৃহীত হয়েছে তার অধিকাংশতেই পানামার যোজক ছাড়িয়ে দক্ষিণ-মুখে পুয়ের্তো দে পিনাস-এর পর কিছুটা অগ্রসর হলে বীরু নামে একটি নদী পাবার কথা জানানো আছে।
এই বীরু নদীর নাগাল পেলেই তাঁদের সন্ধান সহজ হয়ে যাবে বলে তিন বন্ধুই মনে করেছেন। মোরালেস কাগজে লিখেছিলেনও তাই।
লিখেছিলেন, বীরু নদী আমাদের লক্ষ্য! তার স্রোত বেয়েই রহস্য-রাজ্যের সন্ধান আমরা পাব।
পড়তে গিয়ে দেখেন, দ্বিতীয় সেনটেন্স-এর আগে হয়তো শব্দটা বসানো। হাতের লেখাটা হুবহু যেন তাঁরই, কিন্তু এ কথা লিখেছেন বলে স্মরণ করতেই পারেন না।
ওই একটা শব্দে সমস্ত বাক্যটার অর্থ একেবারে বদলে গেছে। সেটা দাঁড়িয়েছে, বীরু নদী আমাদের লক্ষ্য। হয়তো তার স্রোত বেয়েই রহস্য-রাজ্যের সন্ধান আমরা পাব।
এ হয়তো শব্দ বসিয়ে তাঁদের বিশ্বাসকে এমন দুর্বল করে দেখানো তো তাঁদের পক্ষে অসম্ভব! ভুলেও মোরালেস তা করতে পারেন না।
তাহলে আর কেউ কি তাঁর এ লেখার ওপর কলম চালাচ্ছে! কিন্তু কে তা চালাতে পারে, আর চালাবেই বা কেন?
মোরালেস বয়সে পিজারো আর আলমাগরোর প্রায় সমান হলেও নানা রোগে। ভুগে বড় বেশি ভেঙে পড়ে অথর্ব হয়ে গেছেন। তা না হলে পিজারোর অভিযানের। শুধু পরিকল্পনা করেই তিনি ক্ষান্ত থাকতেন না।
ভাঙা শরীর নিয়েও মোরালেস কিন্তু স্পেনে ফিরে যাননি। শরীর অক্ষম হলেও অজানা মহাদেশের মোহে তাঁর মন এখনও আচ্ছন্ন। সেই দেশে উত্তেজনার উৎস-মুখেই তিনি জীবনটা কাটিয়ে যেতে চান।
প্রায় একাই তিনি পানামায় একটি বাসা নিয়ে থাকেন। পানামার দপ্তরখানায় তাঁর এক দূরসম্পর্কের ভাইপো কাজ করে। সে মাঝে মাঝে কাকার সঙ্গে দেখা করে যায় মাত্র। তাঁকে দেখাশোনা আর তাঁর ফাইফরমাশ খাটার কাজ এক ক্রীতদাসই করে।
